১৮৯০-এর দশকের নিউইয়র্ক।
ঝকঝকে তকতকে এক শহর। কিন্তু শহরের বাতাসে ভাসছে এক নোংরা লড়াইয়ের গন্ধ! আজকের যুগের ক্লিকবেইট বা ফেইক নিউজের আদি রূপ, ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র জন্ম হয়েছিল ঠিক তখনই।
সে সময় নিউইয়র্কের সাংবাদিকতার একচ্ছত্র রাজা ছিলেন জোসেফ পুলিৎজার। তাঁর পত্রিকার নাম ছিল The New York World।
একদিন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্কে এলেন এক ধনী যুবক, উইলিয়াম র্যান্ডল্ফ হার্স্ট। পুলিৎজারকে তিনি মানতেন তাঁর আইডল। পুলিৎজারের স্টাইল ফলো করেই তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় সফল হয়েছিলেন।
কিন্তু ১৮৯৫ সালে হার্স্ট নিউইয়র্কে এসে কিনে নিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা The New York Journal। আর সরাসরি ঘোষণা করলেন যুদ্ধ! তাও যাঁকে আইডল মানতেন, তাঁর বিরুদ্ধেই।
কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়াই কেবল কাটতি বাড়ানোর জন্য রং চড়িয়ে খবর প্রকাশের শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই। আজ যে বিখ্যাত ‘পুলিৎজার প্রাইজ’ সাংবাদিকদের দেওয়া হয়, সেই পুরস্কারের প্রবর্তকের হাত ধরেই এই অন্ধকার জগতের শুরু!
যাই হোক, টাকার জোর ছিল হার্স্টের। তিনি পুলিৎজারের সেরা সাংবাদিক, সম্পাদক ও জনপ্রিয় কার্টুনিস্টদের দ্বিগুণ বেতনে নিজের দিকে টেনে নিলেন।
পুলিৎজারের পত্রিকায় তখন ‘দ্য ইয়েলো কিড’ নামের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রঙিন কার্টুন চরিত্র ছাপা হতো। হার্স্ট সেই কার্টুনিস্টকেও নিজের পত্রিকায় নিয়ে গেলেন!
দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না পুলিৎজারও। তিনি অন্য একজন কার্টুনিস্টকে দিয়ে নিজের পত্রিকায় আবার ‘ইয়েলো কিড’ আঁকানো শুরু করলেন।
তাতেও কিছু হলো না। আক্রমণ এল অন্যদিক দিয়ে। পুলিৎজারের পত্রিকার দাম ছিল ২ সেন্ট। সাধারণ মানুষকে নিজের দিকে টানতে হার্স্ট পত্রিকার দাম কমিয়ে মাত্র ১ সেন্ট করে দিলেন! বাধ্য হয়ে পুলিৎজারকেও লোকসান গুনে পত্রিকার দাম ১ সেন্টে নামাতে হলো।
কাটতি বাড়াতে গিয়ে দুজনেই খবরের সত্যতা যাচাই করা ছেড়ে দিলেন। কে কত বেশি রসালো, খুনোখুনি, কেলেঙ্কারি আর কাল্পনিক খবর ছাপতে পারে, তা নিয়ে শুরু হলো উন্মাদ প্রতিযোগিতা।
একজন সত্যিকারের সাংবাদিক হয়ে পড়লেন একজন বিবেকহীন ব্যবসায়ী।
আর এই নোংরা লড়াইয়ের ফলেই জন্ম হলো ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র! ‘ইয়েলো কিড’ কার্টুনের নাম থেকেই এল ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ শব্দটি। আর স্থায়ী হয়ে গেল সস্তা ও ভিত্তিহীন সাংবাদিকতার নাম হিসেবে।
ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই রেষারেষি শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ডেকে এনেছিল এক আন্তর্জাতিক বিপর্যয়।
১৮৯৮ সালে কিউবার কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ USS Maine ডুবে যায়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই দুই পত্রিকা স্পেনের ওপর এর দোষ চাপিয়ে উসকানিমূলক খবর প্রকাশ করতে শুরু করে।
ইতিহাসবিদদের মতে, পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর লোভে তারা আমেরিকার সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি খেপিয়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত শুরু হয়ে যায় স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ!
শেষ পর্যন্ত নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন জোসেফ পুলিৎজার। তিনি এই নোংরা সাংবাদিকতা থেকে পুরোপুরি সরে আসেন। আর সাংবাদিকতার মান ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে পরবর্তীকালে চালু করেন সেই বিখ্যাত ‘পুলিৎজার প্রাইজ’!
তবুও বুঝেশুনে এই সিরিয়াস ব্যাপার থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি। আজকের দিনে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন জোসেফ পুলিৎজার।




পাঠকের মন্তব্য