হঠাৎ করেই সবার মুখে এক নাম, আবু বকর!
এই যুগে এসে কেউ যদি বলে, এমন পুরুষও আছে যার রাগ নাই, টেনশন নাই, বউয়ের আগের বয়ফ্রেন্ডের চ্যাটিং হিস্ট্রি দেখেও ব্লাড প্রেশার বাড়ে না, তাইলে তো সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। লোকটা মানুষ, নাকি কোনো এআই ল্যাবে বানানো বিশেষ মডেল!
তা এই আবু বকরের কাহিনি কী? একটু দেখা যাক।
নাটক-সিনেমায় পরকীয়া, শাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়া, নায়কের পকেটে রিভলবার, এসব তো কতই দেখলাম। কিন্তু ‘দার-এ-নিজাত’ সিরিয়ালে এসে নির্মাতারা একেবারে অন্য দুনিয়া বানাইছেন। সেই দুনিয়ার সবচেয়ে শান্ত মানুষটার নাম আবু বকর। অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকীকে দেখলে মনে হয়, জীবনে কোনো দিন ট্রাফিক জ্যামে পড়েন নাই, মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়েও মাথায় হাত দেন নাই। দুনিয়ার কোনো ঝামেলাই যেন লোকটার গায়ে লাগে না।
কিন্তু এই আবু বকররে নিয়ে এত মাতামাতি কেন?
ঘটনা হইলো, তার বউয়ের আগের প্রেমিক তাকে ধোঁকা দিয়ে চলে গেছে। সেই কষ্ট নিয়েই মেয়েটা আবু বকরের সংসারে আসছে। এরপর রাগ দেখায়, ঝগড়া করে, কখনো প্লেট ভাঙে, কখনো তেড়েফুঁড়ে কথা বলে। আর আবু বকর সাহেব কী করেন? একগাল হেসে পাশে বসেন, ডার্ক চকোলেট কিংবা প্রিংগলস এগিয়ে দেন!
ভাই, সংসারে ঝড় উঠছে, আর আপনি নাস্তা অফার করতেছেন! এই লোক স্বামী, নাকি কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ার এক্সিকিউটিভ?
এত কিছুর পরও লোকটার মুখে বিরক্তি নাই, পুরোনো প্রেমিকরে নিয়া খোঁটা দেওয়া নাই, প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা নাই। দর্শকও তাই অবাক। বাস্তব জীবনে এমন ধৈর্যশীল স্বামী খুঁজতে গেলে মেট্রোপলিটন পুলিশের নিখোঁজ ডায়েরিও কাজে আসবে কি না সন্দেহ!
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন আবু বকররে নিয়া রিলসের অভাব নাই। জেন-জি থেকে শুরু করে আন্টি-খালারা পর্যন্ত সবাই তার ভক্ত। কারণটা অবশ্য সহজ। চারপাশে সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস, গিল্টি ট্রিপ আর কে কাকে কতভাবে কষ্ট দেওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতা দেখতে দেখতে মানুষ একটু শান্তি চায়।
সেইখানে আবু বকর এসে বলতেছেন, আমাদের সম্পর্কটা দোয়ার, বদদুয়ার নয়। ব্যস, দর্শকদের মন গলে পানি! মেয়েরা ভাবতেছে, আহা, এমন একটা মানুষ যদি পাওয়া যাইত! আর ছেলেরা ভাবতেছে, শালা, এই লোক বাজারে নামার পর তো সাধারণ স্বামীদের মানসম্মান শেষ!
তবে আবু বকর সাহেবেরও কিছু সমস্যা আছে। এতক্ষণে যারে দেখে মনে হইতেছে মানুষটা একেবারে নিখুঁত, একটু গভীরে গেলেই দেখা যায়, সবকিছু অত সহজ না।
প্রথম সমস্যা, মায়ের প্রতি তার অন্ধ ভক্তি। মা যা বলবেন, সেটাই শেষ কথা! ভাই, মা-বাবাকে ভালোবাসা এক জিনিস, আর নিজের বউয়ের কষ্ট দেখেও চুপ থাকা আরেক জিনিস। বউয়ের চোখে পানি আসতেছে, আর আপনি মায়ের কথার বাইরে যাইতে পারতেছেন না, তাইলে এত চকোলেট খাওয়ায়ে লাভ কী? সংসার তো আর শুধু হাসিমুখ আর প্রিংগলস দিয়া চলে না!
দ্বিতীয়ত, হামনা নামের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে যে রহস্য তৈরি হইছে, তাতে মনে হইতেছে সাধু বাবার জীবনেও কিছু রোমাঞ্চ আছে। এত দিন যারে দেখে মনে হইতেছিল লোকটার জীবনে কোনো ঝামেলাই নাই, এখন দেখা যাইতেছে কাহিনিতে আরও প্যাঁচ আছে।
সব মিলায়ে আবু বকর এখন আর শুধু সিরিয়ালের একটা চরিত্র না, সে অনেকের কাছে আদর্শ স্বামীর নমুনা। তার ভিডিও দেখলে ভালো লাগে, কথা শুনলে ভালো লাগে, লাভ রিয়্যাক্ট দিতেও সমস্যা নাই। কিন্তু বাস্তবে এমন কাউরে খুঁজতে গেলে হিসাব আলাদা।
কারণ বাস্তবের সংসারে শুধু চকোলেট আর প্রিংগলস দিয়া সব ঝামেলা মেটে না। সেখানে রাগ হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়, মতের অমিল হয়। কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়, কখনো বউয়ের পাশে দাঁড়াইতে হয়, আবার কখনো মায়ের সঙ্গেও ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে হয়।
তারপরও আবু বকররে মানুষের এত পছন্দ হওয়ার একটা কারণ আছে। মানুষ হয়তো নিখুঁত স্বামী খুঁজতেছে না। মানুষ এমন একজনরে চায়, যার কাছে নিজের অতীত লুকাইতে হবে না, ভুল করলে অপমানিত হইতে হবে না, কষ্ট পাইলেও উল্টা নিজেরেই দোষী মনে করতে হবে না।
তেলের দাম বাড়ুক আর কমুক, আপাতত বাজারে আবু বকর মার্কা স্বামীর চাহিদা তুঙ্গে। সমস্যা একটাই, পর্দায় এমন মানুষ পাওয়া গেলেও বাস্তবে তার খোঁজ পাওয়া যাবে কি না, সেইটা এখনো নিশ্চিত না!



পাঠকের মন্তব্য