আব্বাসউদ্দীন আহমদ, এমন এক নাম, যাকে আজ চেনে না এমন বাঙালি নেই! শহুরে পলিশ করা কালচারে যিনি সুরের জাদুতে তুলে এনেছিলেন মাটির সোঁদা গন্ধ! ভাওয়াইয়া সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন শিকড়ের টানে সুর মেলাতে মেলাতে! মানুষটাও তিনি ছিলেন ঠিক তেমনই। মাটির মানুষ!
এই সুর ও ছন্দের দুনিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর সোলমেট! আমাদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন! দু জায়গার মানুষ দুজন, কাজও ভিন্ন ক্ষেত্রে! কিন্তু একজন আরেকজনকে দেখেই ইনি চিনে নিলেন ওনার কলম, আর ওনার কানে বাজল এনার সুর! দুটোর গোড়া যে একই, নিজের মাটির টান!
গ্রামের ধুলোবালি, মেঠো পথ আর নদীর ঢেউ যেন তাঁদের এক সুতোয় বেঁধেছিল। শহরের বাবুরা যখন মাটির গানকে নিচু নজরে দেখত, তখন এই দুই বন্ধু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। দুজনে একসঙ্গে গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে লোকগান কুড়িয়ে আনতেন। আড্ডায়, হাসিতে আর গানে তাঁরা মাতিয়ে রাখতেন পুরো বাংলা।
চলুন, আজ দেখে আসি এক শিল্পীর সঙ্গে এক কবির ম্যাজিকাল বন্ধুত্ব।
১.
জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা কিছুদিন হলো ভার্সিটির সিলেবাসে জায়গা পেয়েছে। বেশ সাড়াও ফেলেছে। আব্বাসউদ্দীন গিয়েছিলেন এই তরুণ কবিকে একবার দেখতে। কিন্তু আব্বাসউদ্দীনকে দেখেই জসীমউদ্দীন কোনো সালাম-আদাব না করেই সোজা ধরে বসলেন, আগে আপনার কোচবিহারের একটা খাঁটি ভাওয়াইয়া শোনান, তারপর কথা!” আব্বাসউদ্দীনও হাসিমুখে সেখানে বসেই খালি গলায় সুর ধরলেন। গান শেষে জসীমউদ্দীন চিৎকার করে উঠেছিলেন, “পেয়েছি, আমার মনের মতো সুরের মানুষকে পেয়েছি!
২.
১৯৩০–৪০-এর দশকে কলকাতা বেতারে দুজনেই কাজ করতেন। আব্বাসউদ্দীন গাইতেন, আর জসীমউদ্দীন কথিকা বা গীতিআলেখ্য লিখতেন। রেডিও স্টেশনের ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে জসীমউদ্দীন কোনো নতুন ছড়া বা দুই লাইন সুর বানিয়ে আব্বাসউদ্দীনকে শোনাতেন। আব্বাসউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে টেবিল চাপড়ে সুর তুলে গাইতেন। তাঁদের এই কেমিস্ট্রি দেখে রেডিওর অন্য কলাকুশলীরা রসিকতা করে বলতেন, “ডিরেক্টরকে আর কষ্ট করে লোক, শিল্পী খুঁজতে হবে না, ওই ক্যান্টিনের কোণায় বসে থাকা দুই উন্মাদই পুরো বাংলা চালাচ্ছে!”
৩.
১৯৩০-এর দশকে দুই বন্ধু মিলে গ্রামোফোনের রেকর্ড ও লোকসাহিত্যের খোঁজে বাংলার গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন। তেমনি একবার গ্রাম থেকে গান ও পালা সংগ্রহ করতে গিয়েছেন দুজন। কিন্তু যেখানে গেছেন, সেখানে তীব্র বসন্ত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের লোকজন ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। কিন্তু এই দুই বোহেমিয়ান বন্ধুর যেন কোনো বিকার নেই। তাঁরা স্থানীয় এক চায়ের দোকানে বসে লোকশিল্পীদের গান শুনে নোট নিচ্ছিলেন।
পরে আব্বাসউদ্দীন তাঁর আত্মজীবনীতে রসিকতা করে লিখেছিলেন, তাদের সেই পাগলামি দেখে গ্রামের এক প্রবীণ মাঝি বলেছিল, বাবুরা, গান শোনার জন্য এমন মরণব্যাধির মধ্যেও যে জান হাতে নিয়ে ঘুরছেন, আপনাদের গান তো সোনা হওয়া উচিত!
৪.
কলকাতা বেতারে তখন সরাসরি নাটক ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো। তো, একবার জসীমউদ্দীনের লেখা একটি পল্লিনাটকে এক অন্ধ ভিক্ষুকের কান্নার সুর ও সংলাপ দরকার ছিল। কিন্তু কোনো অভিনেতা সেটি ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে পারছিলেন না। তখন জসীমউদ্দীন পর্দার আড়াল থেকে ইশারা করলেন। অমনি আব্বাসউদ্দীন মেঝের ওপর এমন এক করুণ আর্তনাদ ও ভিখারির সুরে গান শুরু করলেন যে স্টুডিওর বাইরে বসা লোকজন সত্যি সত্যি ভেবে বসলেন, বাইরে কেউ হয়তো ভিক্ষা চাইতে ঢুকে পড়েছে! পরে নাটক শেষে দুজনেই এই অভিনয়ে লুটিয়ে লুটিয়ে হেসেছিলেন।
৫.
গ্রামে যাওয়ার সময় তাঁরা প্রায়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার জন্য ট্রেনের থার্ড ক্লাসে যাতায়াত করতেন। ট্রেনের যাত্রীরা প্রথমে তাঁদের চিনতে পারতেন না। কিন্তু জসীমউদ্দীন খুব রসকষ মিশিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় গল্প শুরু করতেন, আর আব্বাসউদ্দীন হয়তো হঠাৎ গুনগুন করে সুর ধরতেন। দেখতে দেখতে পুরো কামরার যাত্রীরা গোল হয়ে ঘিরে ধরতেন। একবার তো গান গাইতে গাইতে এতটাই ভিড় জমে গিয়েছিল যে ট্রেনের টিটি এসে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, এ কী মশকরা শুরু করেছেন! ট্রেন চালাব, নাকি আপনাদের জলসা শুনব? পরে পরিচয় জেনেই সেই টিটি সাহেব লজ্জা পেয়ে প্রণাম করেছিলেন।
তাদের এই বন্ধুত্ব ছিল যেন দুই জাদুকরের এক আশ্চর্য যুগলবন্দী! যেন এক মানিকজোড়! তাই না?
(তথ্যসূত্র: আমার শিল্পী জীবনের কথা — আব্বাসউদ্দীন আহমদ; যাঁদের দেখেছি — জসীমউদ্দীন; মুস্তফা জামান আব্বাসীর স্মৃতিকথা।)



পাঠকের মন্তব্য