সৌদির জেলে তিন বছর, ফাঁসির আগে ১৪ দিন, কনস্যুলেট কোথায় ছিল?

৬১ পঠিত ০ ... ২০ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে

 

সৌদি আরবের মক্কায় এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছেলে আর এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী মেয়ে। একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল, আরেকজন টাঙ্গাইলের সুইটি। মসজিদের ভেতরে তারা কিছু একটা করে বসছেন। সৌদি আইনের ভাষায় যেটাকে বলা হচ্ছে ফাহিশা। এখন সেই কাজটা চুমু খাওয়া, হাত ধরা, নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু, সৌদি সরকার সেটা পরিষ্কার করে বলার প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ, ক্ষমতা থাকলে কাউকে কৈফিয়ত দিতে হয় না, রাজতন্ত্রের হিসাবটা অনেকটা এমনই।

সৌদি সরকার তাদের নিজেদের আইনে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিল। বিচারক সাহেব তাজির প্রয়োগ করে এই রায় দিয়েছেন। ইসলামি আইনে তাজির মানে এমন একধরনের শাস্তি, যেখানে বিচারকের হাতে শাস্তি নির্ধারণের অনেকটা স্বাধীনতা থাকে। মানে, অপরাধের ধরন আর পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক শাস্তি ঠিক করেন। কিন্তু সমস্যা হইল, এই ক্ষমতার সীমা আর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বেশ কঠিন। এখানে দুইজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, অথচ ঠিক কী করছিলেন, সেই তথ্যটুকুও পরিষ্কার করে জানানো হলো না।

এরপর শুরু হইল আসল নাটক। ঘটনাটা ঘটেছিল ২০২৩ সালে। প্রায় তিন বছর ধরে নজরুল আর সুইটি সৌদি জেলে ছিলেন। আর জেদ্দায় বসে থাকা বাংলাদেশ মিশন? তারা কী করছিল, সেই প্রশ্ন এখন উঠতেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আড়াই হাজার বন্দির একটা তালিকা পাঠায় কনস্যুলেটে। সেই তালিকায় নজরুল আর সুইটির নামও ছিল। কিন্তু সাজার কলাম নাকি ফাঁকা ছিল। আর সেই ফাঁকা কলাম দেখেই আমাদের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা ধরে নিলেন, ব্যাপারটা তেমন গুরুতর কিছু না। ব্যভিচার আর সাইবার অপরাধের মামলা, বড়জোর কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরের জেল হবে!

মানে, তালিকায় নাম আছে, মানুষ জেলে আছে, অথচ সাজার ঘর ফাঁকা দেখে সবাই নিশ্চিন্ত। চা খাও, ঘুমাও, সব ঠিক আছে!

তাদের যুক্তি ছিল, সৌদিতে আগে এমন অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড হয়নি। তাই এবারও হবে না। বাহ, কী চমৎকার যুক্তি! আগে কোনো ঘটনা ঘটেনি মানে ভবিষ্যতেও ঘটবে না, এমন গ্যারান্টি কে দিল? ইতিহাসে প্রথমবার অনেক কিছুই ঘটে। কিন্তু কূটনৈতিক দায়িত্বে থেকে অতীতের নজির দেখেই যদি সব হিসাব করা হয়, তাহলে বিপদ তো হবেই।

ফলাফল কী হইল? সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তালিকা আসার পর ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেল। আর বাংলাদেশ মিশন তখনও হয়তো তালিকাটা ঠিকমতো বোঝার চেষ্টা করতেছিল। মানুষের জীবন চলে গেল, কিন্তু দায়িত্বশীলদের টনক নড়ল না।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে ঢাকার ঘুম ভাঙল। তড়িঘড়ি করে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানো হলো, কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে উদ্বেগ জানানো হলো। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার ডেকে বলা হচ্ছে, চলেন দেখি রোগটা কী ছিল!

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে, তালিকাটা ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়নি। আহা, কী সুন্দর স্বীকারোক্তি! যেন দুইটা মানুষের জীবন চলে যায়নি, অফিসের কোনো ফাইল হারিয়ে গেছে!

একদিকে সৌদি সরকারের আইনের অস্বচ্ছতা আর তথ্য গোপন করার প্রবণতা, অন্যদিকে বাংলাদেশ মিশনের গাফিলতি। মাঝখানে প্রাণ গেল দুইজন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। মক্কার ধুলাবালির মধ্যে হারিয়ে গেল নজরুল আর সুইটির নাম।

২

সৌদি আরব থেকে আড়াই হাজার বন্দির একটা তালিকা এল জেদ্দা কনস্যুলেটে। একবার ভাবেন তো, আড়াই হাজার মানুষ! যারা প্রবাসে কাজ করতে গেছেন, ঘাম ঝরিয়ে টাকা উপার্জন করতেছেন, তাদের মধ্যে এতগুলো মানুষ জেলে আছেন। সেই তালিকায় নজরুল আর সুইটির নামও ছিল। কিন্তু আমাদের মিশনের কর্মকর্তারা নাকি বুঝতেই পারেননি যে এই দুইজনের সামনে এত বড় বিপদ অপেক্ষা করতেছে। কারণ, সাজার কলাম ফাঁকা ছিল!

কী চমৎকার অজুহাত! সাজার ঘর ফাঁকা মানেই কি মানুষ দুইজন জেলে বসে আরাম করতেছেন? একটা নামের পাশে যখন সাইবার অপরাধ বা ব্যভিচারের মতো অভিযোগ লেখা থাকে, আর দেশটা হয় সৌদি আরবের মতো কঠোর আইনব্যবস্থার রাষ্ট্র, তখন কি একটু বেশি সতর্ক হওয়ার কথা না? নাকি আমাদের কূটনীতিকদের মাথায় শুধু অফিসের ফাইল আর দুপুরের খাবারের চিন্তাই ঘুরে?

মিশনের কর্মকর্তাদের যুক্তি, সৌদিতে আগে এমন অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির ফাঁসি হয়নি। তাই তারা নাকি ভাবতেই পারেননি এবার এমন কিছু হবে। বাহ! আগে হয়নি বলেই এবারও হবে না, এই নিশ্চয়তা কোথায় পেলেন? টাইটানিক ডোবার আগে তো সবাই ভাবছিল জাহাজটা ডুববে না। তাই বলে কি জাহাজে ছিদ্র আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করার দরকার ছিল না?

তারপর আবার বলা হচ্ছে, সৌদিরা নাকি এমন জটিলভাবে তালিকা পাঠায় যে সেটা বোঝা কঠিন। তা বটে! তালিকা বুঝতে সমস্যা হইছে, তাই আর বুঝার চেষ্টাই করা হলো না? ব্যাপারটা অনেকটা পরীক্ষায় ফেল করে স্যারকে বলা, প্রশ্নটাই কঠিন ছিল, তাই পড়াশোনা করিনি!

তালিকা আসার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় ছিল। এই সময়ের মধ্যে একটা ফোন করা যেত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত জানতে চাওয়া যেত, প্রয়োজনে বারবার যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু সেসব কিছু হলো কি না, সেই প্রশ্নই এখন উঠতেছে।

যেখানে দুইজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, সেখানে আমাদের অফিসের ফাইল নড়তে কত সময় লাগে, সেটা বুঝতেই পারছেন। সৌদি সরকারের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কিন্তু নিজেদের গাফিলতির দায়ও তো এড়ানো যায় না।

আর একটা বিষয় খেয়াল করেন, নজরুল আর সুইটি কোনো মন্ত্রী-এমপি ছিলেন না। বড় কোনো ব্যবসায়ীও ছিলেন না। তারা ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মক্কার রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতেন, কাজ করে টাকা উপার্জন করতেন। হয়তো তাদের পরিবার দেশে বসে সেই টাকার অপেক্ষা করত। অথচ তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট তৎপরতা দেখানো হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো জরুরি।

তালিকায় নাম ছিল, মানুষ জেলে ছিল, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে বাংলাদেশ মিশন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারল না। এমন গাফিলতি কীভাবে সম্ভব, সেটার জবাব তো চাইতেই হবে।

৩

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা বিষয় বুঝতে হবে। সেখানে তাজির নামে বিচারকের হাতে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা আছে। শরিয়াহ আইনে সাধারণভাবে কিসাস, হুদুদ আর তাজিরের মতো কয়েক ধরনের শাস্তির ধারণা আছে। তাজিরের ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক শাস্তি নির্ধারণ করেন।

কিন্তু সমস্যা হইল, এই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, শাস্তি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, আর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের পক্ষে কতটা কার্যকরভাবে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হওয়া দরকার। বিশেষ করে যখন শাস্তিটা মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত কিছু হয়।

নজরুল আর সুইটির ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা মসজিদের ভেতরে ফাহিশা বা অশালীন কাজ করেছিলেন। কিন্তু সেই কাজটা ঠিক কী ছিল, সেটা পরিষ্কার করে জানানো হয়নি। হাত ধরা, চুমু খাওয়া, নাকি অন্য কিছু, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। কোন মসজিদে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেই তথ্যও পরিষ্কার নয়।

অথচ দুইজন মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেল। তাদের দেশের মিশনও সময়মতো বিষয়টা জানতে পারল না বা জানলেও কার্যকরভাবে এগোতে পারল না। একটা মানুষের জীবন চলে যাওয়ার পরও যদি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত পরিষ্কার না হয়, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

সৌদি সরকার নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, সেটা ঠিক। কিন্তু সার্বভৌমত্বের অর্থ কি এই যে একজন বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরও তার দেশের সরকারকে পরিষ্কার তথ্য দিতে হবে না? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কনস্যুলার যোগাযোগ আর নাগরিকের অধিকার নিয়ে নিয়মকানুন আছে। সেই জায়গায় তথ্যের এমন ঘাটতি উদ্বেগজনক।

আরেকটা বিষয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ যদি তথ্য গোপন করে বা অস্পষ্টভাবে তথ্য দেয়, তাহলে বাংলাদেশের মিশনের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন তো আরও বেশি খোঁজখবর নেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে উল্টোটা দেখা যাচ্ছে। সাজার কলাম ফাঁকা ছিল, তাই কর্মকর্তারা হয়তো ধরে নিয়েছিলেন তেমন কিছু হবে না।

এক পক্ষের সমস্যা তথ্যের অস্বচ্ছতা, আরেক পক্ষের সমস্যা সেই অস্বচ্ছতার মধ্যেও প্রয়োজনীয় সতর্কতা না দেখানো। দুই দিকের এই ব্যর্থতার মাঝখানে প্রাণ গেল দুইজন মানুষের।

৪

ঘটনাটা যখন ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উঠল, তখন শুরু হলো প্রশ্নবাণ। মিশনে গাফিলতি ছিল কি না, তালিকাটা ঠিকমতো পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, দায়িত্বে অবহেলা থাকলে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী করা হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হলো।

আমাদের দেশে অবশ্য এমন ঘটনা নতুন কিছু না। আগে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তারপর সবাই নড়েচড়ে বসে। সংসদীয় কমিটি প্রশ্ন করে, মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দেয়, তদন্ত কমিটি হয়। এরপর কিছুদিন আলোচনা চলে। তারপর নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলে পুরোনো ঘটনাটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

কিন্তু এখানে প্রশ্নটা শুধু একটা তালিকা ঠিকমতো পড়া হয়নি, এতটুকুতে শেষ হয় না। প্রশ্ন হলো, দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কেন সময়মতো বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন না? আড়াই হাজার বন্দির তালিকায় দুইজন বাংলাদেশির নাম ছিল। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল। তারপরও মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে হলো না কেন?

নজরুল আর সুইটি কোনো ভিআইপি ছিলেন না। তারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। প্রবাসে কাজ করে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাতেন। তাদের মতো মানুষের বিপদে রাষ্ট্র কতটা পাশে দাঁড়ায়, এই ঘটনা সেই প্রশ্নটাই সামনে নিয়ে এসেছে।

সৌদি সরকার তাদের বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। আর বাংলাদেশের মিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা যথাসময়ে তালিকাটা ঠিকমতো পরীক্ষা করেনি। দুই দেশের দুই ধরনের ব্যর্থতার মাঝখানে হারিয়ে গেল দুইটা জীবন।

আজ সংসদীয় কমিটি কৈফিয়ত চাইছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দিচ্ছে। হয়তো তদন্তও হবে। কিন্তু কয়েক দিন পর আলোচনা কমে যাবে, নতুন কোনো খবর সামনে আসবে। তখন নজরুল আর সুইটির পরিবারকে নিয়েই পড়ে থাকতে হবে এই শূন্যতা।

যে মানুষগুলো প্রবাসে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, তাদের বিপদের সময় রাষ্ট্র যদি সময়মতো পাশে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শুধু রেমিট্যান্সের প্রশংসা করে কী লাভ?

শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকবে দুইটা পরিবারের কান্না, কিছু স্মৃতি আর আমাদের আমলাতন্ত্রের চিরচেনা অজুহাত। সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর বলা হবে, আমরা তো বুঝতেই পারিনি, ভেবেছিলাম বড়জোর ছয় মাসের জেল হবে!

৬১ পঠিত ০ ... ২০ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​