পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভিভাবক গ্রুপ জাতিসংঘ! আজ সে তার ৮১তম জন্মদিনে পড়েছে। বয়স ৮১ হলে কী হবে? দুনিয়াতে শান্তি বজায় রাখা ও যুদ্ধ থামাতে নিজের সম্মিলিত মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে!
চলুন, আজকের জন্মদিনে এই বিশ্বসংসারের পঞ্চায়েত সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য জেনে আসি।
১. জাতিসংঘের সদর দপ্তরের জমি ছিল এক কসাইখানার
আজ যেটা জাতিসংঘের চকচকে নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তর, ১৯৪৬ সালের আগে সেটা ছিল কসাইখানা ও চামড়ার গুদামের আখড়া! ধনকুবের জন ডি. রকফেলার জুনিয়র ৮.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে সেই জমি কিনে UN-কে দান করেন। কসাইখানা হয়ে পড়ে বিশ্বের কূটনৈতিক কেন্দ্র।
২. নিরাপত্তা পরিষদের দরজা আর 'আতিথেয়তা'
UN-এর সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনের প্রধান কাঠের দরজাটি নরম্যান্ডি বা নরওয়ে থেকে গিফট হিসেবে এসেছিল। কাঠের ওপর কারুকাজ করা সেই দরজার মূল বার্তাটি ছিল, ভেতরে আসুন, কথা বলুন।
কিন্তু ভেতরে বিশ্বের পাঁচ বড় পরাশক্তি বসে আছে, যাদের আছে 'ভেটো পাওয়ার'! ১৯৩ টি দেশ হ্যাঁ বলার পরে যদি এই ৫টি দেশের কেউ না বলে তবে সেটা না-ই হয়!
৩. জাতিসংঘের 'শান্তির ঘণ্টা' তৈরি হয়েছিল মুদ্রা গলিয়ে
জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে আছে একটা বিখ্যাত ‘পিস বেল’ বা শান্তির ঘণ্টা। এটি বানিয়েছিল জাপান। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘণ্টাটি তৈরির জন্য বিশ্বের ৬০টি দেশের শিশুরা তাদের পকেটের কয়েন দান করেছিল! সেই সব ধাতব মুদ্রা গলিয়ে এই পিসবেল তৈরি করা হয়।
৪. বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষণ দিতে দিতে সেন্সলেস, অতঃপর ইনজেকশন
নিরাপত্তা পরিষদে লংগেস্ট ভাষণ দেওয়ার রেকর্ড একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদের! ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন ১৯৫৭ সালে কাশ্মীর ইস্যুতে এক টানা ৮ ঘণ্টা ভাষণ দিয়েছিলেন! ভাষণ দিতে দিতে একপর্যায়ে তিনি ক্লান্তি আর শারীরিক অসুস্থতায় টেবিলের ওপর ঢলে পড়েছিলেন। তখন ডাক্তার ডেকে তাকে ইনজেকশন দিতে হয়েছিল! তিনি আবারও পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে তার বাকি ভাষণ শেষ করেন।
৫. জাতিসংঘের নিজস্ব ডাকটিকিট ও পোস্ট অফিস আছে
UN-এর নিউ ইয়র্ক সদর দফতরে একটা পোস্ট অফিস আছে। সেখানে তাদের নিজস্ব ডাকটিকিটও ছাপা হয়! তবে মজার ব্যাপার হলো, ওই ডাকটিকিট দিয়ে চিঠি পোস্ট করতে হলে আপনাকে UN ভবনের ভেতরের পোস্ট অফিস থেকেই পাঠাতে হবে। অন্য কোথাও থেকে এই ডাকটিকেট লাগালে চিঠি পৌঁছাবে না!
৬. বাংলাও কি জাতিসংঘের ভাষা?
জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা মাত্র ৬টি (ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, চীনা ও আরবি)। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাংলায় প্রতিদিন এত বিশাল পরিমাণ মানুষ কথা বলে যে প্রতিবছরই দাবি ওঠে বাংলাকেও অফিসিয়াল ভাষা করার! বিশ্বমঞ্চে আমাদের 'চা-বুলবুলি' টাইপ কনভারসেশন পৌঁছাতে আর কতদিন কে জানে!
৭. পিকাচুর জাতিসংঘের প্রতিনিধি হওয়া
এটি কিন্তু সত্যি! পরিবেশ সচেতনতা এবং শিশুদের শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে পকেমন চরিত্রের 'পিকাচু' এবং 'হ্যালো কিটি'র মতো কাল্পনিক চরিত্রকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (SDG) বিশেষ দূত বা প্রচারক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল!
৮. সোভিয়েত প্রেসিডেন্টের জুতা পিটানো
১৯৬০ সালের সাধারণ পরিষদের এক মিটিংয়ে ফিলিপাইনের প্রতিনিধি কড়া ভাষায় পরাশক্তিদের সমালোচনা করছিলেন। তা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ কেবল চিৎকারই করেননি, তিনি নিজের পা থেকে জুতো খুলে নিয়ে টেবিলের ওপর ধাঁই-ধাঁই করে পেটাতে শুরু করেছিলেন।
৯. জাতিসংঘের পতাকায় উত্তর মেরু কেন?
জাতিসংঘের পতাকার ঠিক মাঝখানে পৃথিবীর মানচিত্র এবং চারপাশে শান্তির প্রতীক দুটি জলপাই পাতা। তবে এই মানচিত্রটি সাধারণ মানচিত্রের মতো নয়, এটি উত্তর মেরু থেকে দেখা পৃথিবীর দৃশ্য। ডিজাইনাররা ইচ্ছে করেই এটা করেছিলেন যাতে বিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্রে রেখে পক্ষপাতিত্ব না করা হয়। সব মহাদেশ ও দেশ সমান দূরত্ব ও গুরুত্ব পায়।
১০. অস্কারজয়ী জাতিসংঘ
জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি রক্ষা বা কূটনীতির মঞ্চ। কিন্তু জাতিসংঘের ঝুলিতে রয়েছে একটি অস্কার বা একাডেমি পুরস্কার! শকিং না? ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের তথ্য বিভাগ 'First Steps' নামের একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনের ওপর বানানো হয়েছিল সেটা। এই তথ্যচিত্রটি বেস্ট শর্ট ডকুমেন্টারি ক্যাটাগরিতে অস্কার পায়!
১১. জাতিসংঘের লাইব্রেরিতে কমিক বই
জাতিসংঘের দাগ হ্যামারশোল্ড লাইব্রেরিতে শুধু গম্ভীর অর্থনৈতিক রিপোর্ট বা যুদ্ধের ইতিহাস থাকে না। সেখানে বিশ্বের নানা ভাষার শত শত কমিকস, স্যাটায়ার প্যামফ্লেট এবং শিশুদের কাল্পনিক বইয়ের বিশাল কালেকশনও আছে।
১২. বিশ্ববিদ্যালয় আছে, কিন্তু কোনো ছাত্রী বা ছাত্র নেই
জাপানের টোকিওতে জাতিসংঘের নিজস্ব একটা 'ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি' (UNU) আছে! কিন্তু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সেখানে গিয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার কোনো ব্যাচ নেই। এটি প্রধানত বিশ্বজুড়ে শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের গবেষণার জন্য একটি গ্লোবাল থিংক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করে।
১৩. মহাকাশচারীদের জন্যও আইন আছে
জাতিসংঘের একটি শাখা আছে যারা কেবল মহাকাশের আইন কানুন নিয়ে কাজ করে (UNOOSA)। তারা নিয়ম বানিয়েছে, মহাকাশে গিয়ে কেউ কোনো গ্রহ বা চাঁদের জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করতে পারবে না। আর এলিয়েনদের সাথে দেখা হলে কী করতে হবে তারও গাইডলাইন তৈরির চেষ্টা চলছে!
১৪. মহাকাশের এলিয়েনদের জন্য প্রতিনিধি
২০১০ সালে শোনা গেল, জাতিসংঘ নাকি মহাকাশ থেকে আসা এলিয়েনদের সাথে প্রথম কথা বলার জন্য মালয়েশিয়ার এক মহিলা জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাজলান ওথম্যানকে 'এলিয়েন অ্যাম্বাসেডর' বানাতে যাচ্ছে! যদিও UN পরে হাসিমুখে স্পষ্ট করে যে, এমন কোনো অফিসিয়াল পদ এখনও তৈরি হয়নি।
১৫. গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে আস্ত একটা গান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু ভাষণ আর ফাইলের স্তূপ নয়। পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে একবার সেখানে পুরো এক অর্কেস্ট্রা টিমকে নিয়ে আসা হয়েছিল, যারা আইসবার্গ ও বরফ গলে যাওয়ার শব্দ দিয়ে তৈরি সুর বাজিয়েছিল!
ইন্টারেস্টিং না?



পাঠকের মন্তব্য