আমাদের নদী ভাঙ্গনের গ্রামের মেয়েটি যখন ঢাকায় প্রথম প্রজন্মের কোনো এলিটের বাসায় কাজ করতে আসে; সেই বাড়ির বেগম সাহেবা যখন গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে দেয়; বেগম সাহেবা রাগী কোন হাবিলদার বা ক্লার্কের মেয়ে হবার গর্বে কাজের মেয়েটির চুলের ঝুঁটি ধরে দেয়ালে ঠুকে দেয়; বেগম সাহেবা শপিং-এ গেলে একটু কোবতে তোবতে করা সাহেবটা যখন কাজের মেয়েটিকে ঠেঁসে ধরে; এরকম অসংখ্য ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে নদী ভাঙ্গনের আগের সম্পন্ন কৃষকের আদরের মেয়ের জীবনে। নদী ভাঙ্গনে দরিদ্র হয়ে পড়া পিতার পক্ষে তার অনেক ভালোবাসার কন্যার নরক যন্ত্রণার কোন সমাধান আনা সম্ভব হয় না।
কিংবা ধরুন গার্মেন্টসের সেই মেয়েটি যে ছুটি না পেয়ে সেলাইটেবিলে কাজ করতে করতে ঝুঁকে মারা গেলো; ঐ গার্মেন্টসের মালিক; যে সদরঘাটের পকেটমার থেকে শিল্পপতি হয়েছে; তাকে আইনের মুখোমুখি করবে এ কার সাধ্য।
সৌদি আরবে মরুভূমির বেদুইন, দস্যু ও ডাকাতেরা ঐ ঠিক প্রথম প্রজন্মের রুলিং এলিট, ধনিক সমাজ। মাটির নীচে তেলের খনি পেয়ে আর তা দখল করে; প্রচুর তেল-চর্বি হয়েছে তাদের। তাদের চোখে বাংলাদেশের নদী ভাঙ্গনের গ্রামের ছেলে-মেয়েরা নেহাত মিসকিন। (লক্ষ্য করবেন আমাদের সমাজের ফড়িয়ারা আজকাল লোকজনকে মিসকিন বলে ডাকা শিখেছে)। এখন সেই তেলচকচকে সৌদি আরবে বাংলাদেশ শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্স এনেই খুশি। আর বেছে বেছে এত আন্ডার কনফিডেন্ট ও ইংরেজিতে অদক্ষ লোককে (অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) আমরা দূত হিসেবে পাঠাই; যাদের ডাকাত সৌদি ফরেন অফিসে গিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে একটা কথা বলার সাহস নেই। আবার দূতও জানে বাংলাদেশ কখনও কর্মসংস্থানের নতুন নতুন পথ তৈরি করতে পারবে না। সে অধিকার বঞ্চিত নাগরিককে দাস হিসেবে সৌদি আরবে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে; আর সেই বৈদেশিক মুদ্রায় মোটাতাজা হবে পালা করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেপো বেবিরা। আর আমলাদের তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। বাদামওয়ালার ছেলে আমলা হলে প্রথম আলো কেঁদে একাকার হয়। কিন্তু সেই আমলা সোশাল ক্লাইম্বিং করে কোনো সাবেক আমলার মেয়েকে বিয়ে করে; তাকে বেগম পাড়ায় ভিলা কিনে দেয়। ছেলেমেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে শুধু ফ্ল্যাশ মব করে।
১৯৯১ সাল থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষা শিখিয়ে একটু সভ্য দেশে কাজে পাঠাতে দেখলাম না। এরকম বিজ্ঞাপন দেখলাম; কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই মৃত্যুগুহা সৌদি আরবে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানো; অথবা ইউরোপে অবৈধ পথে যেতে গিয়ে নৌকাডুবিতে তরুণদের সলিল সমাধি।
এবার আমি সত্যিই প্রত্যাশা করেছিলাম জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নির্বাচিত সরকার বিএনপি কিছু সক্রিয় উদ্যোগ নেবে। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর ইংরেজি দক্ষতা দেখে বুঝে গেছি; ইচ্ছা আছে কিন্তু ভাষা নাই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে প্যারালাল ইউনিভার্সে বসবাস করেন, সেটা পরিবেশকর্মী গ্রোয়েটে থুনবার্গের জগত। সফেদ শার্ট পরে স্কুল ও হাসপাতালে উনি যখন পরিচ্ছন্নতার চারু পাঠ দেন, বৃক্ষ রোপণ করে সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন জারি রাখেন, শিশুদের কালচারাল কম্পিটিশনের মাধ্যমে বিকাশের উদ্যোগ নেন; আশির দশকের সেই প্রাণবন্ত শিশু একাডেমির কথা মনে পড়ে।
কিন্তু ঠিকই আওয়ামী লীগের নেপো বেবি, ভাগ্নে-ভাগ্নি, নাতি-নাতনি যেভাবে প্রকল্প বাগিয়ে দেশ খেয়েছিলো; বিএনপির নেপো বেবি, ভাগ্নে-ভাগ্নি, নাতি-নাতনি সেই একই কাজ শুরু করেছে। যুব লীগের সহ সভাপতিরা যেরকম চাঁদার রাজ্যে কোন বানেগা ক্রোড়পতির ইঁদুর দৌড়ে নেমেছিলো, যুবদলের সহ সভাপতিরা ঠিক তাই করছে।
আওয়ামী লীগের মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা যেভাবে সরকারি দলের সমালোচনা না করে বিরোধী দলের সমালোচনার কালচার চালু করেছিলো; বিএনপির মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা সেই একই কাজে লেগে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ যেমন কিছু বাম ভাড়া করে পনেরো বছর কালচারাল ওয়ার লাগিয়ে রেখেছিলো; বিএনপি একই কায়দায় কিছু বাম ভাড়া করে কালচারাল ওয়ারে লাগিয়ে রেখেছে।
ফ্রান্সের বাম হয়তো আগামী প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জিতবে, জার্মানির বাম বার্লিন জিতেছে, ইন্ডিয়ার বাম ফ্যাসিবাদমুক্তির লক্ষ্যে লড়ছে। আর বাংলাদেশের বামাংশের একমাত্র কাজ কালচারাল ওয়ার। ফার্স্ট জেনারেশন কালচার শিখলে; কালচারের যে এতো কামড় হয়; না দেখলে বিশ্বাস হতো না।
চলমান ফেসবুক এক্টিভিজমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ক্যামেরার সামনে একটা ভুল আচরণ বা ভুল স্টেটমেন্টের জন্য গুরুশাস্তির আবেদন জানানো হচ্ছে। কিন্তু যেসব মন্ত্রী ক্যামেরার আড়ালে নিজের ছেলে-মেয়ে, ভাগ্নে-ভাগ্নি, নাতি-নাতনিকে দিয়ে দেশ খাওয়ানো চালু করে দিয়েছে; তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও রোমান মবের সেদিকে কোন নজর নেই।
ঐ যে মুহূর্তের পুলক, লঘু পাপ নিয়ে খিল্লি খেলা; ঐ সস্তা বিনোদনের চক্করে পড়ে বাংলাদেশ কোনোদিকে যাচ্ছে না।
আগামী দশটা বছর যদি দুর্নীতি ও দেশখাওয়া কমানো যায়; তাহলে ক্ষুদ্র-ব্যবসা, কুটির শিল্প-কৃষিজাত শিল্প বিকাশ এমনভাবে হবে; আর কাউকে সৌদি ডাকাতের ঘরে দাসী বাঁদি হতে হবে না। তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাপান-মালয়েশিয়ার মতো দেশে পাঠানো গেলে; সৌদি আরবের মতো নিঃগৃহীত জীবন মেনে নিতে হবে না আজ ও আগামীর তরুণদের।



পাঠকের মন্তব্য