জীবনানন্দের লুকিয়ে রাখা লেখাগুলোই কি এখন বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ?

৯ পঠিত ০ ... ১৩ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে

13 (37)

নিজের লেখাই লুকিয়ে রাখতেন জীবনানন্দ, সেই লেখাগুলোই আজ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ!

জীবনানন্দ দাশের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। নিজের লেখা কাউকে দেখাইতে চাইতেন না। নতুন কিছু লিখলেই লুকায়ে রাখতেন। হঠাৎ কেউ ঘরে ঢুকে পড়লে তাড়াতাড়ি লেখাগুলা সরায়ে ফেলতেন। এমনকি নিজের স্ত্রী লাবণ্য দেবীও সহজে তার লেখা দেখার সুযোগ পাইতেন না।

এই গোপনীয়তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী ছিল একটা কালো ট্রাঙ্ক।

জীবনানন্দ বেচে থাকতে এই ট্রাঙ্কের ভেতরে কী কী জমায়ে রাখছিলেন, সেটা অনেকেরই জানা ছিল না। ১৯৫৪ সালে তার মৃত্যুর পর ট্রাঙ্কটা খোলা হইলে যা পাওয়া গেল, তা রীতিমতো অবাক করার মতো। প্রায় আড়াই হাজার কবিতার পাণ্ডুলিপি, ২১টা উপন্যাস, ১০৮টার মতো ছোটগল্প, সঙ্গে অসংখ্য প্রবন্ধ আর ডায়েরি!

একবার ভাবেন, একজন মানুষ এত এত লেখা লিখে গেছেন, অথচ সেগুলার বড় একটা অংশ কাউরে পড়তেই দেন নাই! তার উপন্যাস আর ছোটগল্পের একটাও জীবদ্দশায় বই বা পত্রিকায় প্রকাশ করেন নাই। চুপচাপ নিজের মতো লিখে গেছেন, আর সব জমায়ে রাখছেন ওই কালো ট্রাঙ্কে।

এই ট্রাঙ্কের সঙ্গেই জড়ায়ে আছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’র গল্প।

১৯৩৪ সালের দিকে জীবনানন্দ একগুচ্ছ সনেট লিখছিলেন। নিজের দেওয়া নাম ছিল ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। কিন্তু অন্য লেখাগুলার মতো এই বইটাও ট্রাঙ্কের ভেতরেই পড়ে থাকল। জীবদ্দশায় আর প্রকাশ করা হলো না।

কবির মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৯৫৭ সালে সিগনেট প্রেস থেকে বইটা প্রকাশিত হয়। প্রকাশক দিলীপকুমার গুপ্ত বইয়ের নাম বদলায়ে রাখেন ‘রূপসী বাংলা’। সেই নামেই বইটা বাংলা সাহিত্যে আলাদা জায়গা করে নেয়। তবে জীবনানন্দের দেওয়া আসল নামটাও হারায়ে যায় নাই। ২০২১ সালে ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’ নামেই পাণ্ডুলিপির মূল রূপ আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হইলো, জীবনানন্দ নিজের এত এত লেখা লুকায়ে রাখতেন কেন?

এর সঠিক উত্তর আমরা জানি না। তবে তার গল্প-উপন্যাস লেখার ধরন ছিল একটু আলাদা। প্রচলিত গল্পের মতো শুরু হইল, মাঝখানে নানা ঘটনা ঘটল, তারপর সুন্দর একটা শেষ হইল, এমন ছকে সব লেখা ফেলতে চাইতেন না তিনি। নিজের লেখাগুলা নিয়া তাঁর চিন্তাভাবনাও ছিল আলাদা। তাই হয়তো সেগুলা প্রকাশ করার জন্য খুব একটা ব্যস্ত ছিলেন না।

আবার তার ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল নানা টানাপোড়েন। দাম্পত্য জীবনের জটিলতা, চাকরি হারানোর হতাশা, জীবনের নানা অপ্রাপ্তি, সব মিলায়ে লেখালেখিই হয়তো ছিল তার নিজের মতো করে বাঁচার একটা জায়গা। মনের ভেতরে জমে থাকা কথাগুলা লিখতেন, কিন্তু সেগুলা আর কাউরে দেখানোর প্রয়োজন মনে করতেন না।

অবশ্য এই ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তবে একটা বিষয় ভাবলে অবাক হইতে হয়, যে মানুষটা নিজের লেখা কাউরে দেখাইতে চাইতেন না, মৃত্যুর পর তার সেই লুকায়ে রাখা লেখাগুলাই বাংলা সাহিত্যের বিশাল এক সম্পদ হইয়া উঠল।

জীবনানন্দ হয়তো ভাবেনও নাই, তার মৃত্যুর এত বছর পর মানুষ তার অপ্রকাশিত লেখাগুলা খুঁজে বের করবে, পড়বে, আর নতুন করে তাঁকে আবিষ্কার করবে।

যে মানুষটা বেঁচে থাকতে নিজের লেখা কাউকে দেখাইতে চান নাই, মৃত্যুর পর তার সেই লেখাগুলাই হয়ে উঠল বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। নিজের ভেতরে একটা আস্ত সাহিত্যজগৎ নিয়া ঘুরে বেড়াইছেন জীবনানন্দ, অথচ সেই জগতের অনেকখানিই আমরা চিনতে পারছি তাঁর চলে যাওয়ার পর।

২২ অক্টোবর, জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুদিন। আজ তাকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয়, একজন লেখককে চিনতে সব সময় তার জীবদ্দশায় পাশে থাকার দরকার হয় না। কখনো কখনো তাঁর রেখে যাওয়া শব্দগুলার কাছেই ফিরতে হয়, বারবার।

জীবনানন্দ নাই, কিন্তু তার লেখা আছে। আছে সেই বাংলার মাঠ, ঘাস, পাখি, নদী আর কুয়াশায় মাখা এক আশ্চর্য জগৎ, যেই জগৎ তিনি নিজের মতো করে তৈরি করে গেছেন। যে মানুষটা নিজের লেখাগুলা কালো ট্রাঙ্কে লুকায়ে রাখছিলেন, সময় সেই লেখাগুলাকেই পৌঁছে দিছে অসংখ্য পাঠকের কাছে।

মৃত্যু তার জীবন থামায়ে দিছে, কিন্তু তার লেখা থামাইতে পারে নাই। বরং মৃত্যুর পরই আমরা আবিষ্কার করছি, নীরবে বেঁচে থাকা এই মানুষটার ভেতরে কত বিশাল একটা পৃথিবী ছিল।

মৃত্যুদিনে কবি জীবনানন্দ দাশের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

৯ পঠিত ০ ... ১৩ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​