সৌদি আরব থেকে ২০২ জন নারীর লাশ বাংলাদেশে এসেছিল। ৬ বছরের এমন একটি জরিপে (২০১৬-২০২২) সংখ্যাটা উঠে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোসহ সংখ্যাটা ছিল মোট ৭১৪ জন হতভাগ্য নারীর লাশ। মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা ইত্যাদি। কিন্তু মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর সংখ্যাটিই ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ব্যাপারে পরে আসছি...
৭০-৮০-এর দশকে সৌদি আরব থেকে প্রায় ১০,০০০ ছাত্র স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিল। নিজ দেশের বাইরে স্বাধীনতা পেয়ে এদের মাথা ঠিক ছিল না। এরা মদ, জুয়া, নারীসঙ্গ, লিভ-ইন রিলেশন থেকে শুরু করে এমন কোনো ধর্মবিরোধী কাজ নেই, যেটা করেনি। বিয়ে ছাড়াই শারীরিক সম্পর্ক করা এসব নারীর অনেকে গর্ভবতী হয়ে যায়। সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু এসব কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে নিজ দেশে পালিয়ে যাওয়া ছাত্রদের কেউই অবৈধ সন্তানদের পিতৃপরিচয় দেয়নি। এমনভাবে ভুলে গেছে, যেন কিছুই হয়নি।
'Saudi Children Left Behind' নামে ওয়েবসাইট আছে। ডকুমেন্টারিও আছে। দেখে নিতে পারেন।
একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে সৌদিদের আনুমানিক ৮,০০০-এর বেশি সন্তান রয়েছে, যারা কখনো বাবার চেহারা পর্যন্ত দেখেনি। সৌদি সরকার কখনো এদের স্বীকৃতি দেয়নি। আইনের আওতায় আনেনি। ৪০-৫০ বছর পর এসব শিশু আজ মধ্যবয়স্ক। কেউ কেউ পিতৃপরিচয়ের সন্ধানে মরিয়া। কেউ কেউ দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নিয়েছে। আর নতুন যারা জন্ম নিয়েছে, তারা তো এখনো শিশুই।
সৌদির পলিসি ছিল অনেকটা এমন, আমাদের নাগরিক দেশের বাইরে যত খুশি আকাম-কুকাম করুক! এর দায় আমাদের না।
আপনারা হয়তো বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক সৌদি রাষ্ট্রদূতের প্রেম কিংবা নারীঘটিত কর্মকাণ্ডের কথা পত্রপত্রিকায় শুনেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কিছুই না।
তো, শুরুতে বলেছিলাম ২০২ জন নারীর কথা। এই যে অসহায় নারীগুলোকে গৃহকর্মীর কাজে নিয়ে যাওয়ার পর বেদম প্রহার, না খাইয়ে রাখা, যৌন নির্যাতনসহ এমন কোনো ন্যক্কারজনক কাজ নেই, যা তাদের সঙ্গে করা হয়নি। এসব নারীর মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। একেকটি হত্যাকাণ্ড।
সৌদির একটা বড় অংশের জীবন এতটাই অন্ধকার যে, নারী গৃহকর্মীদের বাপ-ছেলে মিলেও ধর্ষণ করার মতো ভয়ংকর অভিযোগ রয়েছে। এখন এসব ব্যাপারে সৌদি সরকার আজ পর্যন্ত কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল? নেয়নি। কারণ, জুলুম তো ভিনদেশের মেয়ের ওপর হয়েছে। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য প্রয়োজন সাক্ষী। ওই মেয়ের পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে?
গরিব, অসহায় এসব নারীর অভিযোগ কখনো বন্দিশালার বাইরে পৌঁছায়নি। দাসীর মতো ভোগ করেছে। মেরেছে। হত্যা করেছে।
এই তো কিছুদিন আগেও দেখলাম, এক নারীশ্রমিক সৌদি আরব থেকে একটি শিশুকে নিয়ে দেশে ফিরেছে। কিন্তু ওই সন্তানের কোনো পিতৃপরিচয় ছিল না। ধর্ষক সৌদি নাগরিকের তো সাজা হওয়া উচিত ছিল। হয়নি কেন, বলুন তো?
বাংলাদেশি নারী হত্যার দায়ে আজ পর্যন্ত কোনো সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে? আমি গুগলে সার্চ করেছিলাম। হ্যাঁ, মাত্র একটি ঘটনা পেয়েছি। তাও ধর্ষণের ঘটনা নয়। এক বাংলাদেশি নারীর নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনায় গৃহকর্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
হ্যাঁ, মাত্র একটি! ধর্ষণের ঘটনায় কেন নয়? কারণ, ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন। কে দেবে? আপনাদের জানা থাকলে, কোনো সৌদি নাগরিক বাংলাদেশি নারীকে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছে কি না, আমাকে জানাবেন। সেটাও পোস্টে উল্লেখ করে দেব।
হাজার হাজার ধর্ষিতা, যৌন নির্যাতনের শিকার এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বাংলাদেশি অসহায় নারীর কান্না, তাঁদের লাশের খবর কখনো বাংলাদেশ সরকারের হৃদয়ে আঘাত করেনি। কেনইবা করবে? ওরা তো আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। ৩০ লাখ থেকে শখানেক কমলে কী-ইবা আসে যায়! সে স্থান একদিনেই পূরণ হয়ে যাবে।
এবার সৌদি নারীদের ব্যাপারে আসি।
সৌদি আরবে থাকেন, এমন প্রবাসী ভাই-ব্রাদারদের মুখে একটা কথা খুব প্রচলিত রয়েছে। তাঁদের দাবি, সৌদি নারীরা পশ্চিমা নারীদের চেয়েও বেশি অ্যাডভান্সড। এরা শুধু ওপরেই পর্দা করে। বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। নিজেদের যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য বিদেশি কর্মীদের টার্গেট করে। নানান ধরনের প্রলোভন দেখায়। এই ফাঁদে যে পা দিয়েছে, ধরা খেয়ে তার জীবন শেষ। আবার যে পা দেয়নি, সে নারীর ইগো হার্ট হয়েছে। এমন নারীর মিথ্যা অভিযোগে জেল খেটেছে, এমন বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয় বলে অনেকে দাবি করেন।
আমাদের জিমের ট্রেইনার সেদিন বলল, তার এক বন্ধু সৌদি আরবে প্রায় পাঁচ বছর ধরে জেল খাটছে। ১০ বছরের জেল। জিজ্ঞেস করলাম, কী করেছিল? জানাল, এক সৌদি নারী তার দোকানে এসে আকার-ইঙ্গিতে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। সে ভয়ে সাড়া দেয়নি। ওই নারীর ইগো হার্ট হওয়ায় অভিযোগ করেছে, সে নাকি তার গায়ে হাত দিয়েছে। এই ঘটনার সত্যতা প্রমাণের কোনো তোয়াক্কা করেনি। সোজা জেল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই।
ঠিক এই ভয়ে সৌদি পুরুষদের চেয়ে নারীদের বেশি ভয় পায় প্রবাসীরা। তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। সব নারী এমন নয়। তবে এমন নারীর সংখ্যাটাও কম নয় বলে অনেকে মনে করেন।
প্রায় এক কোটিরও বেশি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শ্রমিক সৌদি আরবে বাস করে। বিশাল সংখ্যা। এদের সিংহভাগ স্ত্রী ছাড়া সেখানে থাকে। বছরের পর বছর পড়ে থাকে...
আচ্ছা! এই পুরুষ শ্রমিকরা কীভাবে নিজেদের যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে? চাহিদা মেটায়?
এদের বড় একটা অংশ পতিতালয়ে গিয়ে চাহিদা মেটায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে অসংখ্য ওপেন সিক্রেট পতিতালয় রয়েছে বলে শোনা যায়। রিয়াদের মানফুয়া এলাকাও বেশ জনপ্রিয়। এসব স্থানে প্রবাসী শ্রমিকরা নিজেদের যৌন চাহিদা মেটায়। শুনেছি, অনেক বাংলাদেশিও এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নারী সরবরাহ করে। গোপনে মদও সহজলভ্য। বহু নেপালি মদ ছাড়া থাকতে পারে না। এদের অনেকে রুমের মধ্যে মদ বানিয়ে খায়। নেশার এমন কী আছে, যা সৌদি আরবে পাওয়া যায় না?
সৌদি আরবে প্রবাসীদের নিয়ে একটি পেজ রয়েছে। সেখানে প্রায়ই দেখি, বাংলাদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশিরাই অপহরণ করছে মুক্তিপণের জন্য। একবার ভাবুন তো! সৌদি আরবের মতো শরিয়া আইনভিত্তিক দেশে বাঙালিরা এসব অপরাধ করছে। অথচ কেউ ভয় কেন পায় না? বলছি...
আপনি যদি প্রবাসে বাঙালি চোর-বাটপারের সংখ্যা হিসাব করেন, তাহলে সবচেয়ে বেশি বাঙালি বাটপার পাবেন সৌদি আরবে। এরপর ইতালি ও পর্তুগালে। সৌদির কফিলদেরও বাটপারি শিখিয়েছে আমাদের দেশের বাঙালিরা। প্রতিটি কফিলের একজন করে বাঙালি চ্যালা বা দালাল রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। সরাসরি সৌদিরা এসব প্রতারণা করে না। বাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে মিলেমিশে করে।
রাজপরিবারের সদস্যদের বাইরে কোনো সৌদি যদি অন্য কোনো সৌদিকে হত্যা, ধর্ষণ, ব্যভিচার বা অন্য কোনো অপরাধ করে, সেক্ষেত্রে সৌদি নাগরিকরা সর্বোচ্চ শাস্তি পায়। এটা সত্যি। তবে বাইরের দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থায় ভয়ংকর ফাঁকফোকর রয়েছে। আর সেটাই এই লেখার মূল বিষয়বস্তু।
সৌদি আরবে যে কী কী ঘটে, তা শুধুমাত্র ওই দেশে যেসব প্রবাসী ভাই রয়েছেন, তাঁরাই বলতে পারবেন। অতীতের সৌদি আরব আর বর্তমানের সৌদি আরবের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
আপনি-আমি যারা সৌদি আরবের বাইরে থেকে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালা ও রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখি, তারা কখনো সৌদির আসল রূপ কল্পনাও করতে পারব না।
সৌদির ফরেন পলিসি অনেকটা এমন: আমার দেশে তোমরা বহিরাগতরা যত খুশি আকাম-কুকাম করো। গোপনে করো। তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। তবে এমন কিছু করো না, যাতে আমার দেশের নাগরিকদের সমস্যা বা ক্ষতি হয়। সেটা করলে বিন্দুমাত্র মাফ পাবে না। তাদের প্রধান প্রায়োরিটিই হচ্ছে নিজেদের দেশের নাগরিক ও তাদের নিরাপত্তা।
ইয়েস। এই নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে ঘটা বিভিন্ন যুদ্ধ কিংবা গণহত্যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদদাতা বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের হাতেও নিরীহ মুসলিম নাগরিকদের রক্ত রয়েছে বলে সমালোচনা আছে। এই সৌদিরাই চার লাখের মতো ইয়েমেনির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেসব নিয়ে আজ কথা বলতে চাচ্ছি না।
আমাদের দেশেরও প্রায়োরিটি হওয়া উচিত ছিল নিজেদের দেশের নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু সৌদির দাসত্বের কাছে আমরা বন্দি। বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স পাই। দর-কষাকষি হওয়া উচিত সমানে-সমানে, আসমান-জমিন পার্থক্যে নয়।
এই যে সৌদি আরব দুজন বাংলাদেশি নাগরিককে গোপনে মৃত্যুদণ্ড দিল। অপরাধ? মসজিদের ভেতরে দুজন নারী-পুরুষ একে অপরকে নাকি চুমু খেয়েছিল বা জড়িয়ে ধরেছিল। অবশ্যই জঘন্য কাজ করেছে। অনেক জঘন্য। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ কি এটা?
১০, ২০ বা ৩০ বছরের জেল দিতে পারত। জেলখানায় পচাতে পারত। কিন্তু তা করেনি। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ায় নিজেদের ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য দুজন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বলে শুনলাম।
সেটাও তো অন্তত একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে পারত। করেনি।
না এই ব্যাপারে বাংলাদেশের দূতাবাসকে জানাল, না অভিযুক্তদের পরিবারকে জানাল, না আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দিল।
শরিয়া আইন অনুযায়ীও এই সাজা অবৈধ বলে অনেকে দাবি করছেন। গতকাল থেকে অনেক ইসলামি লেখকের লেখা পড়লাম। তাঁদের মতে, এই রায় কার্যকর করা ভুল ছিল। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো অপরাধ ছিল না।
আমার দেশের নাগরিক যদি ওদের দেশের কাউকে মেরে ফেলত বা ধর্ষণ করত, তাহলে এই শাস্তি মাথা পেতে নিতাম। কিন্তু অন্য দেশ থেকে যাওয়া দুজন নাগরিক স্বেচ্ছায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল। কোনো শারীরিক সম্পর্ক করেনি। তাদের এভাবে মেরে ফেলল? আর আমরা এটা হজম করে ফেললাম। ন্যায়বিচার ভেবে আনন্দে আলহামদুলিল্লাহ পড়লাম!
যদি এই শাস্তি ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী শতভাগ সঠিক হতো, তাহলে যে পাকিস্তানি ছেলেটা ভিডিও ধারণ করেছে, তাকে পুরস্কৃত না করে ২০ বছরের সাজা কেন দিয়েছে? কীসের ভিত্তিতে?
সৌদি আরব নিজেদের প্রথম শ্রেণির মুসলিম মনে করে। পবিত্র মক্কা-মদিনা তাদের দেশে হওয়ায় তারাই নিজেদের ইসলামের ধারক ও বাহক মনে করে। এই ধারণা আমাদের দেশের অনেকের মধ্যেও রয়েছে।
সৌদিরা মনে করে, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকরা যেহেতু তাদের দেশে কামলা দিতে যায়, তাই তাদের চোখে আমরা তৃতীয় শ্রেণির মুসলিম। ফলে এই দেশের নাগরিকদের সঙ্গে যা খুশি তাই করা যাবে। যত খুশি জুলুম করা যাবে।
১৯৪০ সালের আগে, অর্থাৎ তেল আবিষ্কারের আগে, এই সৌদি আরব ছিল হতদরিদ্র দেশ। সেই দেশ আজ পৃথিবীর অন্যতম ধনী, কারণ তাদের রয়েছে তেলের খনি, স্বর্ণের খনি এবং হজ-ওমরার মতো বাণিজ্য। তেল ও স্বর্ণের খনি একসময় শেষ হয়ে গেলেও চাকচিক্যে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে, কিন্তু তাদের কখনো অভাব-অনটন হবে না। হজ-ওমরা করতে পবিত্র ভূমিতে আমাদের যেতেই হবে।
সেজন্যই বলি, হে বাঙালি জাতি, আমাদের কোনো তেলের খনি নেই, নেই স্বর্ণের খনি। সৌদি আরবের মতো শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা একটি দরিদ্র জাতি আজ সম্পদের জোরে আমাদের শাসন করছে। মানুষ হিসেবেও আমাদের সম্মান করছে না। কারণ, আমরা তাদের থেকে পিছিয়ে রয়েছি।
কিন্তু তারা ঠিকই আমেরিকা-ইসরায়েলের মতো দেশকে মান্য করে। পশ্চিমা দেশগুলোকে সম্মান করে। তাদের যে সম্মান দেয়, যে ভয় পায়, সেটা কখনো আমাদের করবে না। কারণ, আমরা তাদের সেবাদাস। বহু পিছিয়ে রয়েছি।
এত বিশাল জনসংখ্যা থাকলেও সেটাকে সম্পদে পরিণত করতে পারিনি আমরা।
পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ আমাদের আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের অভাব। ঐক্যের অভাব। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের অভাব। আমরা শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশকে কীভাবে নানা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে অস্থিতিশীল করে রাখা যায়, কীভাবে দুর্নীতি করে লুটপাট করা যায়, সেই প্রচেষ্টায় আমরা সবসময় মগ্ন থাকি।
ওদিকে পুরো বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের পেছনে ফেলে। আর আমরা শুধু চেতনা বিক্রি করে যাচ্ছি।
আমরা ধর্মের নামে কাউকে আপন করে ফেলি। ধর্মের নামে কাউকে পর করি। বলি, ওই দেশের মুসলিম আমার ভাই। কিন্তু ভাই তো আমাদের গোনায়ই ধরে না রে! আমাদের সবচেয়ে আপন এই দেশের মানুষ, হোক সে ভিন্ন ধর্মের। এই মানচিত্রের বাইরের কেউই আমাদের দেশের মানুষের চেয়ে বড় আপন নয়। কেউ না।
ভারতের মুসলিমদের জন্য আমরা কান্না করি। অথচ সেদিন ওই দেশের মুসলিম ভাইয়েরাই জুমার নামাজ না পড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দেশীয় অস্ত্র, লাঠি-সোঁটা নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই দেশের মুসলিমরা নির্যাতিত হতে পারে। কিন্তু তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব নেই। তারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলিমদের ভারতীয়দের চেয়ে বেশি আপন মনে করে না। করবেই-বা কেন? এটাই তো দেশপ্রেম।
অন্যদিকে, তুমি পাকিস্তানের মুসলিমদের জন্য কান্না করো? আপন ভাবো? ওই দেশের মুসলিমরা ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। মুসলিম হিসেবে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখায়নি। পাকিস্তানে বর্তমানে ৩০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে বলে দাবি করা হয়, যাদের পূর্বপুরুষেরা নিজ দেশের সঙ্গে বেইমানি করে সেখানে জীবনের স্বপ্ন বেঁধেছিল। কিন্তু তাদের মুসলিম ভাই ভেবে পাকিস্তান সরকার পুরস্কৃত করে নাগরিকত্ব দেয়নি। বরং তারা বলেছে, ওরা তো বাংলাদেশি, বহিরাগত। আমাদের দেশের নয়।
নোংরা পরিবেশে করাচির কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস। পৃথিবীর কোন বাবা-মা সন্তানকে এমন নোংরা পরিবেশে বড় করতে চাইবে?
সিএনআইসি বা জাতীয় পরিচয়পত্রহীন এই মানুষগুলো কাটাচ্ছে খুবই মানবেতর জীবন। তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে না, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে না, চাকরিও করতে পারে না। সামনে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ। বিভিন্ন এনজিও তাদের সন্তানদের নামমাত্র শিক্ষা দিয়ে থাকে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মুখ দেখতে পায় না তারা। শ্রমিকের কাজ বা ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবনযাপন করে।
এত বিশাল জনগোষ্ঠী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া অভিশাপের শেকলে বন্দি হয়ে, পরজীবীর মতো পাকিস্তানে জীবন পার করে দিচ্ছে।
এই যে করোনার সময় এত বড় মানবিক বিপর্যয় হলো, তখন পাকিস্তানিরা ভ্যাকসিন পেয়েছিল। অথচ এই ৩০ লাখ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া নিয়ে গড়িমসি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ, তাদের নাগরিক হিসেবেই মানা হয় না। তাদের কীসের সেবা দেবে?
বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ট্রাভেলার পাকিস্তানে যায়। ওরা সম্মান দেখায়, ভালোবাসা প্রদর্শন করে। খাওয়ার সময় বিল নেয় না। কারণ, তারা মেহমান। হ্যাঁ, মেহমানকে এক-দুদিন ভালোবাসা যায়। কিন্তু মেহমান যখন স্থায়ীভাবে থাকার নিয়তে আসে, তখন তুমি যত বড় পাকিস্তানপ্রেমী বা মুসলিমই হও না কেন, তুমি বহিরাগতই। তুমি তাদের দেশের মানুষ নও। আর তোমার পরিণতি হবে এসব শরণার্থীর মতোই।
কিছুদিন আগে এক বাংলাদেশি ট্রাভেলার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। তাঁর চ্যানেলে একজনের সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম। সে বলেছিল, আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে ফাঁসি দিক। আমি হাসিমুখে মেনে নেব। তবু আমি আর এখানে, পাকিস্তানে, থাকতে চাই না।
নিজ জন্মভূমির মাটির জোর এমনই। এখানে তুমি সিংহ। যত হতদরিদ্র, জরাজীর্ণ দেশেই কষ্টে থাকো না কেন, কেউ তোমাকে দেশ থেকে বের করে দিতে পারবে না। নাগরিক নও বলে তোমাকে বা তোমার পরবর্তী প্রজন্মকে সব ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। নিজ দেশে তুমি এতটুকু সান্ত্বনা নিয়ে বাঁচতে পারবে, আমি বাংলাদেশি। এই দেশ আমার। এই দেশের মানুষ আমার।
ইউটিউবে পাকিস্তানি মানবাধিকারকর্মীদের বানানো তাদের মানবেতর জীবন নিয়ে অসংখ্য ডকুমেন্টারি পেয়ে যাবেন।
তো, যা বলছিলাম, আমাদের নিজের দেশের মানুষই আমাদের সম্পদ। আমরাই আমাদের আপনজন। ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা সীমান্তের ভিত্তিতে কেউই আমাদের দেশের মানুষের চেয়ে বড় আপনজন নয়। আমাদের এই নগ্ন বাস্তবতাটা বুঝতে হবে।
যতদিন না বুঝতে পারব, যতদিন না নিজেদের সভ্য বানাব, দুর্নীতি, নিজেদের মধ্যে হানাহানি-মারামারি এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিদ্বেষকে চিরতরে কবর দেব, যতদিন না নিজেদের দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে একত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ব, ততদিন বিশ্বের অন্যান্য দেশের চোখে চোখ রেখে মাথা উঁচু করে কথা বলার মতো শক্তি অর্জন করতে পারব না। নিজেদের অধিকার, সম্মান, মর্যাদা এবং অন্যায়ের জবাবদিহি ও বিচার আদায় করার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারব না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, 'এই দুজনের মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য শিক্ষা।'
ওকে, শিক্ষা মেনে নিলাম। প্রশ্ন একটাই... আমরা ঠিক কবে কফিনে ফিরে আসা বোনদের জন্য, নির্যাতিতাদের জন্য সৌদিকে চরম শিক্ষা দিতে পারব?



পাঠকের মন্তব্য