জুলুমের একই সুতায় বাঁধা যখন ওপারের গো-রক্ষক আর এপারের গোমাংস লাভার

১১০ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

5 (22)

 

গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে ওপার বাংলা আর এপার বাংলার রাজনীতি আপাতদৃষ্টিতে দুই বিপরীত মেরুর গল্প। ওপারে গরুর মাংস খাওয়ার কারণে মানুষকে হেনস্তা করা হয়, কখনো পিটিয়ে হত্যা করা হয়, খাদ্যাভ্যাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় বিধান। আর এপারে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার পর, প্রশাসন ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিলে একদল শিক্ষার্থী গরুর মাংসের উৎসব আয়োজন ও বিক্ষোভের কর্মসূচি হাতে নেয়। একদিকে গরুর মাংস খেতে না দেওয়ার রাজনীতি, অন্যদিকে গরুর মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের রাজনীতি। অথচ এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের গভীরে তাকালে কখনো কখনো একই ক্ষমতার মানসিকতা চোখে পড়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে অন্যের বিশ্বাস, অনুভূতি কিংবা অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করার মানসিকতা।


তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। গরুর মাংস খাওয়া অপরাধ নয়। একজন মানুষ কী খাবেন, তা তার ব্যক্তিগত পছন্দ, সংস্কৃতি ও খাদ্যস্বাধীনতার অংশ। একইভাবে, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থল ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোও অন্যের স্বাধীনতার বিরোধী কিছু নয়। সমস্যাটা গরুর মাংসে নয়, সমস্যাটা তৈরি হয় যখন খাবার আর নিছক খাবার থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার। যখন নিজের পছন্দের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করা হয়, কিংবা নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষার নামে অন্যের খাবারের থালায় নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন দুইপক্ষের অবস্থান ভিন্ন হলেও তাদের রাজনীতির ভাষায় অদ্ভুত এক মিল তৈরি হয়।


ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গোরক্ষার নামে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, হয়রানি এবং প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে গরু কেবল একটি প্রাণী নয়, রাজনৈতিক পরিচয় ও ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। কে কী খাবে, কোন খাবার রান্না করবে, কার কাছে গরুর মাংস পাওয়া যাবে, এসব ব্যক্তিগত ও সামাজিক সিদ্ধান্তের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গরুর প্রতি ধর্মীয় শ্রদ্ধাকে এমন এক সামাজিক কর্তৃত্বে রূপ দেওয়া হয়েছে, যার সামনে অন্যের জীবন, নিরাপত্তা ও খাদ্যস্বাধীনতা তুচ্ছ হয়ে পড়ে।
এই রাজনীতির মূল সমস্যা গরুর প্রতি শ্রদ্ধা নয়। কেউ গরুকে পবিত্র মনে করতেই পারেন, গরুর মাংস না-ও খেতে পারেন। কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস যখন অন্যের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর কেবল বিশ্বাসের চর্চা থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতার চর্চা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটিও সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই, প্রশ্ন তোলা যায় আয়োজনের স্থান, মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগ এবং পরবর্তী প্রতিবাদের ধরন নিয়ে। অভিযোগগুলোর সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি কোনো আয়োজনের পেছনে এমন মনোভাব কাজ করে যে, অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করেই নিজের স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে, তাহলে সেই স্বাধীনতার দাবি আত্মসমালোচনার মুখে পড়ে।


কারণ, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের অধিকারকে অপমান করা স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ চর্চা নয়। আর সেই অপমান যদি সংখ্যাগুরু পরিচয়ের আত্মবিশ্বাস থেকে আসে, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত আচরণ না থেকে আধিপত্যের ভাষাও হয়ে উঠতে পারে।


ওপারের গোরক্ষক বলেন, তুমি গরুর মাংস খেতে পারবে না, কারণ আমার ধর্মীয় বিশ্বাস তোমার খাদ্যাভ্যাসের ওপরও কর্তৃত্ব করবে। আর এপারের কোনো গোমাংসপ্রেমী যদি বলেন, তোমার মন্দিরের সামনে, তোমার ধর্মীয় অনুভূতিকে চ্যালেঞ্জ করেই আমি গরুর মাংস খাব, তাহলে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও খতিয়ে দেখা দরকার।


এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য অবশ্যই আছে। ভারতে গোরক্ষার নামে সংঘটিত বহু হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে সরাসরি সমতুল্য করা যাবে না। দুটির সামাজিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার কাঠামো এবং ক্ষতির মাত্রা এক নয়। কাউকে খাবার খেতে বাধা দেওয়া এবং কাউকে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা একই ধরনের কাজও নয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই যদি অন্যের ওপর নিজের ইচ্ছা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মানসিকতা কাজ করে, তবে সেই মানসিকতার তুলনামূলক সমালোচনা করা যায়।


সংখ্যাগুরুর ক্ষমতা সব সময় নিষেধাজ্ঞা জারি করার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় কাউকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোণঠাসা করার মধ্য দিয়ে, কখনো তার অনুভূতিকে তুচ্ছ করে দেখানোর মধ্য দিয়ে। কখনো বলা হয়, তুমি আমার পছন্দমতো চলবে, কখনো বলা হয়, তোমার বিশ্বাসকে পাত্তা না দিয়েই আমি আমার ক্ষমতা দেখাব। প্রথমটি নিয়ন্ত্রণের ভাষা, দ্বিতীয়টি হতে পারে অবজ্ঞার ভাষা। প্রকাশভঙ্গি আলাদা হলেও দুটিরই কেন্দ্রে যদি থাকে অন্যের সমান মর্যাদা অস্বীকার করা, তাহলে সেই মানসিকতার বিরুদ্ধেই প্রশ্ন তোলা জরুরি।
তবে এই সমালোচনা যেন গরুর মাংস খাওয়া প্রত্যেক মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে না ফেলে। কেউ নিজের খাবারের স্বাধীনতা উপভোগ করার জন্য গরুর মাংস খান, কেউ পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক অভ্যাসের কারণে খান, কেউ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ হিসেবেও কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন। তাঁদের সবাইকে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে ধরে নেওয়া অন্যায় হবে। উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে বক্তব্য, আচরণ ও প্রমাণ দেখতে হবে।


একইভাবে, মন্দিরের সামনে রান্না হয়েছে বলেই যে প্রত্যেক আয়োজকের উদ্দেশ্য ধর্মীয় অবমাননা ছিল, তা-ও প্রমাণ ছাড়া বলা যায় না। এই পার্থক্যগুলো বজায় রেখেই তুলনাটি করা উচিত। নইলে আধিপত্যের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরাই আরেক ধরনের অন্যায় করে বসব।

 

 

১১০ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​