শরীফ হাসানের দুই পর্বের গল্প, দাঁত (প্রথম পর্ব)

৪ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে

মহাদেবপুর বাজারে দুপুরবেলা রাকিবুলের সামনের পাটির দাঁত ভাঙার শব্দটা আশ্চর্য পরিষ্কার শোনা গিয়েছিল। চারপাশে তখন রিকশার বেল, ঘণ্টি বাজছে, মাছের আড়তে ডাকাডাকি চলছে, টিনের চালে রোদ পোড়ার শব্দ হচ্ছে।

এত কিছুর ভেতরেও ওই শুকনো কট করে ভাঙার আওয়াজটা আলাদাভাবে শোনা গেল। মনে হলো একটা শুকনো ডাল ভাঙল। তারপর ওর মুখের ভেতরটা ভরে গেল নোনা রক্তে।

বাবলু, আড়তদারের ছেলে, ওর থেকে তিন বছরের বড়, ওর কলার ধরে ছিল। ঝগড়া লেগেছিল আড়তের সামনে রাকিবুলের রাখা সাইকেলটা সরানো নিয়ে।

(পাঠক, জীবনের সবচেয়ে বড় অপমানগুলো সবসময় সবচেয়ে ছোট কারণে হয়। কারণটা সবাই ভুলে যায়, অপমানটা থেকে যায়, বাজারের বাসি-পচা মাছের গন্ধের মতো লেগে থাকে।)

রাকিবুল তখন তেইশ বছর বয়স। নিজের গায়ের জোর সম্পর্কে তার ধারণা ছিল বাস্তবের চেয়ে তিন গুণ বেশি। সে-ই প্রথমে ধাক্কা দিয়েছিল।

বাবলু প্রথমে নাকে, তারপর গালে, তারপর একেবারে দাঁতে ঘুষি মারল। মুহূর্তের মধ্যে যেন গোটা বাজারটা দর্শক হয়ে গেল। কেউ ফস করে বিড়ি ধরাল, কেউ হাতের ঠোঙা নামিয়ে রাখল।

মহাদেবপুরে এমন ফ্রি শো-তামাশা রোজ রোজ আসে না। কেউ বলল, বড় বড় কথা কয়। আরেকজন বলল, ছোট ভাইটারে ধরিচ্ছে। সবাই হাসল। খুব আন্তরিক হাসি।

বাবলু ওর জামা ছেড়ে দিয়ে বলল, বেশি মরদ হইস না। বাজারে মরদ অনেক আছে।

বাড়ি ফিরলে বাবা দরজা খুলে দিলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী হইছে?

রাকিবুল বলল, পড়ে গেছিলাম।

বাবা বললেন, কার হাতে পড়ছিলি?

রাকিবুল মাথা নিচু করল। বাবা বললেন, যা, মুখ ধুয়ে আয়। গ্রামের বাবারা সান্ত্বনা দিতে জানেন না, সান্ত্বনা না দেওয়াটাই তাদের সান্ত্বনা।

আয়নায় ভাঙা দাঁতটা ছুঁয়ে রাকিবুল ঠিক করল, তার একটা এমন পরিচয় লাগবে, যেটা কেউ কলার ধরে ছিঁড়তে পারবে না।

রাতে ছাদে উঠলে বর্ডারের ওপারে ভারতের আকাশে কমলা আলো দেখা যেত। ছয় মাস পর সে ওই বর্ডারেরই পাহারাদার হয়ে গেল। রাকিবুল তখন বাংলাদেশ রাইফেলস তথা বিডিআরের একজন সিপাহি।

ইউনিফর্ম পরে প্রথম দিন আয়নার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন তাকে দেখে কেউ হাসেনি। জীবনে প্রথমবারের মতো।

২. পিলখানা

সৈনিক জীবন মন্দ চলছিল না, যত দিন না ওই দুটো দিন এলো।

পাঠক, কিছু ঘটনা এত বড় আর এত রক্তমাখা হয়ে যায় যে এক বাক্যে তার ব্যাখ্যা হয় না। শুধু এটুকু বলা যায়, ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারির সেই দুই দিনে পিলখানায় যা ঘটেছিল, তাতে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল, আর তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের জীবন ভেঙে গিয়েছিল।

রাকিবুল পিলখানার ভেতরে ছিল। অস্ত্রাগারের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা সামান্য এক সিপাহি। গুলি চালায়নি, কিন্তু ওর বন্দুকে গুলি ছিল। পরে সরকারি কাগজে এই ‘ছিল’ শব্দটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল।

তারপর ও গ্রেপ্তার হলো। হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে বিচার শুরু হলো, যেখানে নাম ডাকা হতো নম্বর ধরে। রাকিবুল পেল একটা নম্বর, একটা কাঠের বেঞ্চ, আর এমন এক উকিল, যে প্রথম দেখাতেই জিজ্ঞেস করল, তুমি বিদ্রোহের সময় কি বাথরুমে ছিলে? হ্যাঁ বললে ভালো হতো, অন্তত একটা অজুহাত থাকত।

জেলের ভেতরের কথা লিখতে গেলে কালিও লজ্জা পাবে। ওদের কেউ কেউ হাজতেই মরে গেল। কারও নামও কেউ জানল না।

এক রাতে পাশের সেলের এক সহকর্মী সারারাত কাঁদল, ভোরে আর কোনো শব্দ এলো না। সকালে জেলরক্ষী এসে খাতায় লিখল, ‘প্রাকৃতিক কারণে’ মৃত্যু হয়েছে। এই দেশে সবকিছুরই একটা প্রাকৃতিক কারণ থাকে, মানুষের মৃত্যু ছাড়া।

বাবার সাড়ে তিন বিঘা জমি বিক্রি হয়ে গেল উকিল আর জামিনের টাকায়। পরের বছর বাবা মারা গেলেন। রাকিবুল তখনো জেলের ভেতরে।

পুলিশ হাতকড়া পরা অবস্থায় এক ঘণ্টার জন্য লাশের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। মা ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর বাপ তোর কথা জিগায় নাই। খালি কইছিল, ওর দাঁতটা কি ঠিক হইছে?

সাত বছর পর সে জেল থেকে বের হলো। বয়স তখন পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, বিয়ে করে নাই, ওজন কমে গেছে, চাকরি নাই, জমি নাই, আর কপালে একটা অদৃশ্য সিল, বিডিআর বিদ্রোহী।

গ্রামের লোক ওকে দেখলে রাস্তা বদলায়। যে চাচারা একদিন ভাঙা দাঁত দেখে হেসেছিল, তারা এখন ফিসফিস করে বলে, জেল খাটা ছেলে।

৩. প্যাকেজ

আজহার ভাই ছিল মহাদেবপুরের সবচেয়ে সম্মানিত দালাল। গলায় সোনার চেন, মুখে সবসময় হাসি, পকেটে ল্যামিনেট করা কার্ড। তাতে লেখা, ইউরোপ পৌঁছে দেওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা।

কোথায়, কার কাছে, সেটা লেখা নেই। দালালদের কাজে ছোট অক্ষরের শর্ত থাকে না।

সে বলল, সাইপ্রাস। তুরস্ক হয়ে একটু খানি সমুদ্র। ওখানে কাজ আছে, সম্মান আছে। তোমার তো আর্মির ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, ওরা এটা খুব পছন্দ করে।

রাকিবুল বলল, জেলের ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে।

আজহার ভাই বলল, ওইটা ওরা জিগাবে না। ওরা খালি টাকার রং দেখে।

মায়ের গয়না আর আত্মীয়দের থেকে ধার নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় হলো। মা তিন দিন ভাত খেলেন না। চতুর্থ দিন বললেন, ‘যা, মর গিয়ে।’ গ্রামের মায়েরা আশীর্বাদ এই ভাষাতেই করে, আর আশ্চর্য, অনেক সময় ফলেও যায়।

৪. সাগর

ঢাকা, দুবাই, ইস্তাম্বুল। তারপর এক মাস একটা বেসমেন্টে, এগারোজন মানুষ আর একটা বাথরুম। ওখানেই অর্জুনের সাথে ওর প্রথম দেখা।

নেপালি ছেলে, গুর্খা রেজিমেন্টের, সিনিয়রদের সাথে ঝামেলায় চাকরি হারিয়েছিল। রোগা, কথা কম বলে, খালি বারবার নিজের জুতার ফিতা বাঁধে। বলত, জুতা ঠিক থাকলে মানুষ ঠিক থাকে। পরে এই কথাটার মানে পুরো বদলে গিয়েছিল।

এক রাতে ওরা ট্রাকে উঠল, তারপর একটা সৈকতে পৌঁছাল, তারপর আটজনের নৌকায় একুশজন মিলে সাগরে ভেসে গেল।

মাঝির বয়স ষোলো কি সতেরো, সে নিজেই ভয়ে কাঁপছে। দালাল এটাকে বলেছিল ক্রুজ। মাঝরাতে ওটার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। একুশজন মানুষ একুশ রকম আল্লাহ, খোদা আর ভগবানের নাম নিল।

ঢেউ এলো, নৌকা কাত হলো। এক মায়ের কোল থেকে বাচ্চা ছিটকে যাচ্ছিল, রাকিবুল ধরে ফেলল। মা ওর হাত চেপে কাঁদলেন। কয়েক ঘণ্টা পর ওই মা আর বাচ্চা, কাউকেই আর দেখা গেল না।

সাগর মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি চেনায়। প্রথম এক ঘণ্টা সবাই ভাই ভাই থাকে। খাওয়ার পানি কমে গেলে সবাই বোতলের মালিক হয়ে যায়।

একজন আরেকজনকে টানতে গিয়ে নিজেই পড়ে যাচ্ছিল, অন্যরা চিৎকার করছিল, ওকে ছেড়ে দাও, নৌকা ডুবে যাবে। কথাটা নির্ভুল ছিল। ওটাই ছিল ভয়ের।

ভোরের আগে একজন মারা গেল। পকেটে ভাঁজ করা কাগজ, কী ভাষা কেউ পড়তে পারল না। কিছুক্ষণ পর তাকে পানিতে নামিয়ে দেওয়া হলো, যেন সে একটা পুরনো পার্সেল।

সেদিন রাকিবুল বুঝেছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যু না, নাম ছাড়া মৃত্যু। জেলে সে নম্বর হয়ে বেঁচে ছিল, সাগরে এসে দেখল নম্বর ছাড়াই মানুষ মরে যাচ্ছে।

৫. মার্সেইয়ের বেঞ্চ

সাইপ্রাসে ওর দেড় বছর কাটল। নির্মাণ সাইটে, রান্নাঘরে, গুদামে। মালিক টাকা আটকালে কিছু বলার উপায় নেই, কারণ প্রতিবাদের জন্য কাগজ লাগে, আর কাগজ তার ছিল না।

একবার তিন রাত ঘুমাল এক অসমাপ্ত বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির নিচে। জায়গাটা খারাপ ছিল না, বৃষ্টি পড়ত না, খালি ইঁদুররা ভাড়া চাইতে আসত।

তারপর গ্রিস, ইতালি, দুইবার পুলিশের হাতে ধরা পড়ল, একবার ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেল। ইউরোপের দরজায় সবাই আলাদা দাম নেয়, সে শিখে গিয়েছিল।

শেষে পাহাড়ি পথে হেঁটে ফ্রান্স। অর্জুনও নাকি একই পথে এসেছিল। সে গ্রিসে থাকতে শুনেছিল ওর কথা।

একদিন পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে রাকিবুল। কাগজ নেই, ভাষা নেই, কাজ নেই, ওজন তখন ছাপ্পান্ন কেজিতে এসে দাঁড়িয়েছে, বয়স সাঁইত্রিশ পেরিয়েছে।

শহরটা তাকে আপন করে নেয়নি, আপাতত ফেলে রেখেছে। পার্কের কবুতরগুলোও পাত্তা দিচ্ছিল না।

পাশে এক বুড়ো সেনেগালিজ রুটি ছিঁড়ে কবুতরকে খাওয়াচ্ছিল। রাকিবুলকে দেখে বললেন, তুমি কি আগে সৈনিক ছিলে?

রাকিবুল বলল, কীভাবে বুঝলে?

বুড়ো বললেন, আমিও ছিলাম তো। ২০ বছর চাকরি করেছি। সোলজারের তাকানোর ভঙ্গি দেখলেই বুঝতে পারি। তা, এখন কী করছ?

রাকিবুল হেসে বলে, কিছু না। কোনো কাজ পাচ্ছি না। কাগজপত্র ঠিক নাই। ট্রেনিং আছে, অস্ত্র নাই।

বুড়ো বললেন, দুনিয়ায় একটাই আর্মি আছে, যারা তোমার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে না।

মানে?

ফরেন লিজিয়ন। ফ্রেঞ্চ আর্মির একটা ইউনিট। ওরা তোমার অতীত নিয়ে মাথা ঘামায় না। ওরা জানতে চায়, তুমি দৌড়াতে পারো কি না, আর মরতে ভয় পাও কি না। তোমার বয়স কত?

আটত্রিশের কাছাকাছি।

তাহলে তাড়াতাড়ি করো। সাড়ে ঊনচল্লিশের পর ওখানের দরজা বন্ধ। তখন তুমি শুধু বুড়া।

সেদিন রাতে সস্তা একটা ঘরে শুয়ে রাকিবুল ইউটিউবে ফরেন লিজিয়ন কারা, ওদের সৈনিকদের দৌড় দেখল। ফরাসি বোঝে না, কিন্তু ছবি বোঝে।

ভিডিওতে সবাই চকচকে দেখায়। যারা ভিডিও বানায়, তারাও ছোট অক্ষরের শর্ত দেখায় না।

ওর কাছে অর্জুনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ছিল। ও ফ্রান্সে এসেছে জানানোর পরে সে-ও তাকে ফরেন লিজিয়নে ট্রাই করার পরামর্শ দিল।

অবাক হওয়ার বিষয়, সে আগেই ওখানে ঢুকে গেছে। লিখেছে, তুইও চেষ্টা কর। এখানে অন্তত জানবি, তোকে কী হতে হবে।

রাকিবুল অনেকক্ষণ ভাবল। বিডিআরেও সে জানত তাকে কী হতে হবে, তারপর হঠাৎ করেই জানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

জেলে জানত না কাল বাঁচবে কি না। সাগরে জানত না পরের ঘণ্টাটা পাবে কি না। তার আসলে একটা সিস্টেমে থাকা দরকার, ভোরে ওঠার একটা কারণ, একটা আদেশ, আর পাশে কিছু মানুষ।

আর একটা গোপন ইচ্ছেও ছিল, এমন একটা জীবন চাইত, যেখানে কেউ তাকে মাটিতে ফেলে হাসবে না।

৬. বাছাই

রিক্রুটমেন্ট সিনেমার মতো হয় না, অনেক বেশি একঘেয়ে হয়। দৌড়, পুশআপ, দড়ি বেয়ে ওঠা, মেডিকেল, তারপর সদর দপ্তরে মাথার পরীক্ষা আর নিরাপত্তার ইন্টারভিউ।

কিন্তু রাকিবুলের জন্য সব তুলনামূলক সহজ ছিল। অস্ত্র খোলা-জোড়া দেওয়া, ভোরে ওঠা, শৃঙ্খলা, সব শরীরে লেগে ছিল। সাত বছর জেল খাটার পরও শরীর ভোলেনি।

পাশের ছেলেটা রাইফেল খুলতে পাঁচ মিনিট ঘাম ঝরাল, রাকিবুল দুই মিনিটে জোড়া লাগিয়ে দিল। অফিসারের ভুরু কুঁচকে উঠল। ওটাই ছিল বড় সার্টিফিকেট।

অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, আর্মিতে কত দিন ছিলে?

আর্মি না, বিডিআরে, বর্ডার গার্ড।

কেন ছাড়লে?

ছাড়িনি, ছাড়ানো হয়েছে।

কেন?

একটা বিদ্রোহে ছিলাম।

গুলি চালিয়েছিলে?

না।

প্রমাণ?

সাত বছর ধরে সবাই আমার কাছে প্রমাণই চেয়েছে।

অফিসার কিছু লিখলেন, তারপর বললেন, আমরা অতীত দেখি না, আমরা ফিটনেস দেখি। আর বললেন, বয়স আটত্রিশ, ঠিক আছে, সময় আছে, তবে বুড়ো মানুষের ঘাম একটু বেশি ঝরে।

ওখানে একটা নিয়ম তাকে অবাক করল। চাইলে নতুন নাম নেওয়া যায়, ওরা বলে ঘোষিত পরিচয়। রাকিবুল ইসলাম মরে গেল, জন্ম নিল মার্ক রহমান।

একটা ফর্মে সই করে একজন মানুষকে মেরে ফেলা যায়, ইউরোপের আমলাতন্ত্রে এটাই সবচেয়ে সহজ খুন, কারণ ফর্মটা তিন কপি হয় আর কেউ পুলিশ ডাকে না।

একবার তাকে নম্বর দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছিল, এবার সে নিজেই নিজেকে মুছল। আগেরবারের চেয়ে অন্তত এবার নিজের সইটা ছিল।

মা ফোনে শুনে বললেন, নাম পালটাইছিস, মুখটা তো পালটাসনি?

তার আগে একটু বলে নেওয়া দরকার, ফ্রেঞ্চ ফরেন লিজিয়ন কী জিনিস?

৭. ফ্রেঞ্চ ফরেন লিজিয়ন: রাকিবুল যেখানে গিয়েছিল, সেই সার্ভিসটা আসলে কী?

এটা কোনো ভাড়াটে বাহিনী না, এটা ফ্রান্সের রেগুলার আর্মিরই একটা ইউনিট। কিন্তু এর নিয়ম আলাদা। ১৮৩১ সালে এটা তৈরি হয়। পৃথিবীর ১৫০টা দেশের মানুষ এখানে আসে।

তোমার অতীত কী, পাসপোর্ট কী, ধর্ম কী, কেউ জিজ্ঞেস করবে না। ঢুকলেই তোমার পুরনো নাম শেষ। তোমাকে একটা ম্যাট্রিকুলেশন নম্বর দেবে। তোমার নতুন পরিচয়।

এটাই রাকিবুলের মতো মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় টান। পিলখানার সিপাহি, জেলখাটা, পলাতক, এই পরিচয়গুলো এখানে কেউ জানতে চায় না। এখানে সবার একটাই পরিচয়, লিজিয়নার।

চুক্তি হয় ৫ বছরের জন্য। পালানোর সুযোগ নেই। সই করলে ৫ বছর তুমি ফ্রান্সের।

লিজিয়নে ঢোকাটাই সবচেয়ে কঠিন অংশ। প্যারিসের ফোর্ট দে নোজঁ বা ওবান শহরে গিয়ে দরজায় নক করতে হয়। ওই দরজা বছরের ৩৬৫ দিনই খোলা থাকে। ১০০ জন যায়, ১০ জন টেকে। এটা ওদের অফিসিয়াল হিসাব, মাত্র ১০ শতাংশ ক্যান্ডিডেট সিলেক্ট হয়।

সিলেকশন চলে ২-৩ সপ্তাহ জুড়ে। দিনরাত মেডিকেল, সাইকো টেস্ট, আইকিউ, দৌড়, পুল-আপ, লুক লেগার বিপ টেস্ট। ঘুম নেই, ফোন নেই। তুমি চাইলে যে কোনো সময় বলতে পারো, আমি বাড়ি যাব। তোমাকে ছেড়ে দেবে।

টিকলে পাঠাবে কাস্তেলনোদারিতে, ৪ মাসের বেসিক ট্রেনিংয়ে। এটাকে ওরা বলে ফার্ম। এখানকার ট্রেনিং বর্বর পর্যায়ের নিষ্ঠুর হিসেবে পরিচিত। ফ্রেঞ্চ ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বলা নিষিদ্ধ।

ভোর ৪টায় উঠতে হয়, ৩০ কেজি ব্যাগ নিয়ে ১২০ কিলোমিটার মার্চ করতে হয়, কাদা, বৃষ্টি, পাহাড় পেরিয়ে। শরীর ভেঙে গেলে বলবে, Marche ou crève, হাঁটো, না হলে মরো। এটাই লিজিয়নের নিয়ম। শারীরিকভাবে সবচেয়ে কঠিন ট্রেনিংগুলোর একটা হয় কঠিন আবহাওয়ায়।

সারা দুনিয়ায় এর সুনাম আছে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ফাইটিং ফোর্স হিসেবে। ওরা কখনো সারেন্ডার করে না। ক্যামেরোনের যুদ্ধে ৬৫ জন ২০০০ জনের বিরুদ্ধে লড়েছিল, এই গল্প দিয়েই ওরা চলে।

আরেকটা সুনাম হলো ভ্রাতৃত্ব। Legio Patria Nostra, লিজিয়নই আমাদের দেশ। তোমার দেশ নাই, পরিবার নাই, কিন্তু পাশের লিজিয়নার তোমার ভাই। আর ৫ বছর সার্ভিসের পর, বা রক্ত ঝরালে, তুমি ফ্রেঞ্চ নাগরিকত্ব পাবে।

Français par le sang versé, ঝরানো রক্ত দিয়ে ফরাসি। রাকিবুলের মতো যার নিজের দেশে জায়গা নেই, তার জন্য এটা একটা নতুন জন্মসনদ।

ওদের দুর্নামও কম না।

প্রথম দুর্নাম, ওরা ভাড়াটে খুনি। ফ্রান্স নিজের ছেলেদের যেখানে পাঠাতে চায় না, সেখানেই লিজিয়নকে পাঠায়। আফ্রিকার মালি, নাইজার, চাদ, জিবুতি, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশন যেগুলো, সবচেয়ে কঠিন জায়গা ওদের জন্য বরাদ্দ।

মরলে ফ্রেঞ্চ মায়েদের কান্না যেন কম হয়, এই হিসাবেই ওদের তৈরি করা হয়েছিল। এটা নিয়ে ফ্রান্সের ভেতরেই বিতর্ক আছে।

দ্বিতীয় দুর্নাম, বাহিনীর ভেতরের নিষ্ঠুরতা। লিজিয়নের ভেতরে ব্রুটালিটির একটা পুরনো বদনাম আছে। সিনিয়রদের মার, অপমান, আত্মহত্যা, এগুলো নিয়ে অনেক রিপোর্ট আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ভাই ভাই, ভেতরে অনেক সময় জেলখানার মতো।

তৃতীয়, জীবন বলে কিছু থাকে না। বিয়ে করতে পারবে না প্রথম ৫ বছর অনুমতি ছাড়া, ফোন নেই, পরিবার নেই, ছুটি কম। অনেকেই ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে আর ঢুকতে পারে না।

রাকিবুল এই কারণেই টিকে গিয়েছিল। যে ছেলে পিলখানার রাত, প্রমত্ত সাগর পাড়ি, বাবলুর ঘুষি সব একসঙ্গে মাথায় নিয়ে ঘোরে, তার জন্য ওবানের ওই ফার্মটা খুব অচেনা ছিল না।

কঠিন জায়গা নিশ্চয়ই, কিন্তু অন্তত ওখানে কেউ মিথ্যা হাততালি দেয় না। ওখানে মার খেলে সেটা হয় ‘ট্রেনিং’, আর মার দিলে সেটা ‘ডিউটি’। হিসাব পরিষ্কার।

৭. সাদা কেপি

চার মাসের ট্রেনিংয়ে ওর শরীর প্রায় ভেঙে পড়ল, বয়সের জন্য। ব্যারাকে অন্য সবাই বিশ-বাইশ বছরের, ওকে ডাকত দাদু।

পায়ের চামড়া উঠে গেল, ঘুম নেই, ভাষা বোঝে না, ভুল করলেই শাস্তি। ত্রিশ কেজির ব্যাগ নিয়ে মার্চ করতে হয়, যেটা বিশ কিলোমিটার বলে শুরু হয়ে চল্লিশ হয়ে যায়।

ওদের এক সার্জেন্ট ছিলেন পোলিশ। প্রথম দিন বুটের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই জুতা কার? যার, সে কি মারা গেছে?

ওখানে ব্যারাকে ছত্রিশটা দেশের মানুষ ছিল। রাশিয়ান, ব্রাজিলিয়ান, ইউক্রেনিয়ান, আর এক সাবেক ব্যাংকার, যে জীবনেও ঘাম ঝরায়নি। প্রথম সপ্তাহেই বুঝে গিয়েছিল, মানুষের টাকা চুরি করাটা অনেক আরামের ছিল।

রাকিবুল ফরাসিতে শিখল প্রথমে গালাগাল, তারপর অর্ডার, আর শেষে, ‘আমি মাকে একটা ফোন করতে চাই’, যেটা আগে কেউ শোনেনি।

প্রথম রাতে এক ইউক্রেনিয়ান ছেলে ঘুমের ঘোরে কাঁদছিল, সকালে কেউ কিছু বলল না। দুঃখ আছে, কিন্তু তা নিয়ে কথা হয় না। এই নিয়মটা রাকিবুল জেল থেকেই জানত।

চার মাস পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, সেই অনুষ্ঠান। অন্ধকারে মশাল, রাইফেল, আর মাথায় সাদা কেপি (ফরাসিতে képi blanc), যা ফরেন লিজিয়নের সিগনেচার টুপি।

রাকিবুলের চোখে কিছু একটা পড়ল, মনে হলো। ধুলা-ই হবে, সে নিজেকে বলল। নওগাঁর ছেলেরা তো ধুলায় কাঁদে না।

ওই রাতে অর্জুনের মেসেজে একটা লিংক এলো, নিচে লেখা, আমরা-ই প্রথম না, দাদু।

লিংক খুলে দেখল, ফ্রান্সের এক সংবাদমাধ্যমে পুরনো এক প্রতিবেদন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চন্দননগর ছিল ফরাসি উপনিবেশ।

সেখান থেকে ছাব্বিশজন বাঙালি স্বেচ্ছায় ফ্রান্সের হয়ে লড়তে নাম লিখিয়েছিল। তাদের পাঠানো হয়েছিল ৭৫ মিলিমিটার কামানের একটা ব্যাটারিতে। ১৯১৭ সালের জুলাইয়ে তারা পৌঁছেছিল ভার্দুনের ফ্রন্টে।

ফ্রেঞ্চ ইন্ডিয়ার গভর্নর তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ফ্রান্স তাদের নিজের সন্তানের মতো দেখবে। যুদ্ধ শেষে তারা পেয়েছিল স্মারক পদক, একজন পেয়েছিলেন বিখ্যাত ক্রো

৪ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​