পৃথিবীতে মানুষের রূপ নির্ধারণের জন্য একটা অদৃশ্য সেন্সরশিপ বোর্ড আছে, যার চেয়ারপার্সন সম্ভবত রূপটান প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। এই বোর্ডের অদৃশ্য ফতোয়াই ঠিক করে দেয় যে, আপনি সুন্দর মানে ঠিক কোন কোন ছাঁচে আপনাকে ঢালাই হতে হবে।
যেমন ধরুন, আপনার গায়ের রং যদি দুধের মতো ফর্সা না হয়ে একটু রোদে পোড়া কয়লা বা মাটির কাছাকাছি হয়, কিংবা আপনার শরীরে যদি বিজ্ঞাপনের মডেলদের মতো হাড়ের খাঁচাবন্দি কঙ্কালসার দশা না থাকে, তাহলে সমাজ আপনাকে একটা বিশেষ ক্যাটাগরিতে ফেলে দেয়। সেই ক্যাটাগরির নাম হলো: আহা রে, বেচারির তো কোনো দোষ নেই!
অথচ সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো আমাদের মাথার ভেতরে ঢুকে থাকা ওই কৃত্রিম মাপকাঠির ফিতেটায়। ২০০৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক প্রসাধনী ব্র্যান্ড বিশ্বজুড়ে সমীক্ষা চালিয়ে দাবি করল, মাত্র দুই শতাংশ নারী নিজেদের সুন্দর মনে করেন। বাকি আটানব্বই শতাংশই নিজেদের চেহারায় কোনো না কোনো খুঁত খুঁজে পান।
শুনলে মনে হতে পারে, বাপরে বাপ! এ তো বিরাট আত্মবিশ্বাসের আকাল! কিন্তু একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এই আটানব্বই শতাংশের মধ্যে আসলে এক দারুণ আত্মোপলব্ধি লুকিয়ে আছে। তারা বুঝতে পেরেছেন যে, বিলবোর্ডের ওই বারো ইঞ্চি কোমর বা এয়ারব্রাশ করা চকচকে মুখগুলোর সঙ্গে বাস্তবের বাস্তু-ভিটার কোনো মিল নেই। আয়নায় দাঁড়ালে ব্রণের দাগ বা ক্লান্ত চোখটাই সত্যি, বাকি সবটাই আসলে ওই ফর্সা ত্বক আর অ্যান্টি-এজিং ক্রিমের কেমিক্যাল কারসাজি।
কিন্তু মুশকিল হলো, সমাজ চায় না মানুষ নিজের আয়নাকে বিশ্বাস করুক। সমাজ চায় আপনি সারা জীবন নিজের নাকটা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগুন, আর সেই নিদারুণ হীনমন্যতা কাটানোর চাবিকাঠি যেন বাজারে গিয়ে কোনো ক্রিম বা লোশন কিনে উদ্ধার করতে পারেন। একেই বলে বিজ্ঞাপনের নিখুঁত পরিকাঠামো। আগে আপনার মনে একটা কৃত্রিম অসুখ তৈরি করো, তারপর সেই অসুখের মহৌষধ বলে নিজের পারফিউম বা সাবানটা চড়া দামে সেঁধিয়ে দাও!
২
বিজ্ঞাপনওয়ালারা যখন বুঝল যে মানুষের ক্ষোভ আর হীনমন্যতা ভাঙিয়ে ব্যবসা করার পুরোনো কৌশলটা আর আগের মতো কাজ করছে না, তখন তারা বের করল নতুন এক প্যাঁচ। এ যেন সেই, চোরকে বলল চুরি করো, আর গৃহস্থকে বলল সাবধান থেকো।
২০০৪ সাল থেকে একটি আন্তর্জাতিক প্রসাধনী ব্র্যান্ড শুরু করল এক বিচিত্র প্রচারণা, যার ভদ্রবেশী নাম দেওয়া হলো ‘রিয়েল বিউটি’ বা বাস্তব সৌন্দর্য।
ঘটনা এক: রাস্তার মোড়ে বিশাল বিলবোর্ড ঝোলানো হলো। সেখানে কোনো প্রসাধন কোম্পানির পলিশ করা মডেল নেই, আছেন রক্তমাংসের সাধারণ নারীরা। কারও বয়স বেশি, কারও শরীরে মেদ, কারও বা চামড়ায় ভাঁজ। তাদের পাশে দুটো ভোট দেওয়ার বাক্সে প্রশ্ন লেখা: মোটা নাকি অসাধারণ? বলিরেখাযুক্ত নাকি চমৎকার?
মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আমজনতা যখন খুদে বার্তা পাঠিয়ে ভোট দিচ্ছে, তখন ভেতরে ভেতরে আসল কাজটা কিন্তু হয়ে গেল। সাধারণ মানুষের হঠাৎ মনে হতে শুরু করল, আহা! এরা তো আমাদের ঘরের কথাই বলছে! প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনেও এবার বুঝি বিপ্লব এসে গেল!
ঘটনা দুই: এলো ২০০৬ সাল। ইউটিউব তখন সবে হাঁটতে শিখছে। ব্র্যান্ডটি প্রকাশ করল ৭৫ সেকেন্ডের এক ভিডিও, নাম ‘এভোলিউশন’। স্ক্রিনে দেখা গেল এক অতি সাধারণ নারীকে। তারপর শুরু হলো রূপটানশিল্পীদের তাণ্ডব। মেকআপ, চুলের কায়দা, আলোর রোশনাই, আর শেষ পেরেক হিসেবে কম্পিউটার স্ক্রিনে ফটোশপের জাদুকরি টানাটানি। পলক ফেলার আগেই সেই সাধারণ নারীটি পরিণত হলেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যময়ী বিলবোর্ড মডেলে!
শেষ লাইনে একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলো, সৌন্দর্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা যে বিকৃত, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে!
জনগণ কেঁদে আকুল! আহা, এত দিন আমরা যা দেখেছি, তা মিথ্যা! ভিডিওটি ইন্টারনেটে ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ল। বিজ্ঞাপনের এমন মানবতাবাদী রূপ দেখে সুশীল সমাজ হাততালি দিয়ে উঠল।
ঘটনা তিন: ২০১৩ সালে তারা আনল তাদের সেরা ঘুঁটি, ‘রিয়েল বিউটি স্কেচেস’। একজন এফবিআই-প্রশিক্ষিত স্কেচ আর্টিস্টকে বসানো হলো, যিনি নারীদের না দেখে শুধু তাদের নিজেদের দেওয়া চেহারার বিবরণ শুনে খসড়া ছবি আঁকছেন। এরপর একই নারীর বিবরণ অন্য এক অপরিচিত মানুষের মুখ থেকে শুনে আঁকলেন আরেকটি ছবি। দেখা গেল, নিজের দেওয়া বর্ণনার ছবি অপেক্ষা অপরিচিতের দেওয়া বর্ণনার ছবি অনেক বেশি সুন্দর!
বার্তাটা কী দাঁড়াল? বার্তা দাঁড়াল, নারীরা নিজেদের যতটা খুঁতযুক্ত ভাবেন, পৃথিবী তাদের ততটা খারাপভাবে দেখে না। ব্যস! আবেগ একেবারে গলে জল! সারা বিশ্ব মিলিয়ে ১৬৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সেই ভিডিও দেখল। ব্র্যান্ডটির ভাবমূর্তি ততক্ষণে এক সাবান প্রস্তুতকারক থেকে হঠাৎ করে বিশ্বমানবতার ত্রাতা-রক্ষকে পরিণত হয়েছে!
৩
ঘটনা এত দূর গড়ালে যে কোনো সচেতন বুদ্ধিমান মানুষের মনে একটা অত্যন্ত কুৎসিত ও বেমানান প্রশ্ন জাগা উচিত। এত প্রেম, এত নারী-ক্ষমতায়ন আর এত চোখের জলের আসল মহাজনটি কে?
মহাজন হলো সেই বিশাল বহুজাতিক করপোরেট গোষ্ঠী, যার এক প্রান্তে একটি ব্র্যান্ড ভালোবাসার বাণী ছড়াচ্ছে, আর অন্য প্রান্তে আরেকটি ব্র্যান্ড ফর্সা হওয়ার স্বপ্ন বেচছে। গায়ের রং ফর্সা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে নারীদের বোঝানো হয়েছে, তাদের স্বাভাবিক গায়ের রংটাই যেন একটা সমস্যা। পরে অবশ্য সেই পণ্যের নাম বদলেছে, বিজ্ঞাপনের ভাষাও বদলেছে। কিন্তু নাম বদলালেই কি মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যের ধারণা বদলে যায়?
অর্থাৎ, এক কাউন্টারে হীনমন্যতা বিক্রি আর পাশের কাউন্টারে সেই হীনমন্যতা কাটানোর আত্মবিশ্বাস বিক্রি। দুটোই একই পুঁজিপতির চমৎকার ক্যাশ কাউন্টার!
ঘটনা চার: ২০২১ সালে তারা নিয়ে এলো ‘রিভার্স সেলফি’। এক কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর ফিল্টার দিয়ে নিজেকে কেমন অচেনা চকোলেট পুতুল বানিয়ে ফেলে এবং পরে সেই ফিল্টার সরিয়ে নিজের আসল মুখে ফিরে আসে। তারপর ২০২৪ সালে, বিশ বছর পূর্তিতে তাদের মহৎ অঙ্গীকার, তারা নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো মেকি নারীর ছবি বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করবে না!
এ যেন ডাকাতের হাতেই অহিংসার মশাল তুলে দেওয়া!
কিন্তু খেলার আসল রেজাল্ট কার্ডটা দেখা গেল ক্যাশ বাক্সে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে ওই ব্র্যান্ডের বিক্রি ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০০৭ সালে বেড়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ব্র্যান্ডটির বার্ষিক আয় ৬ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবিও সামনে এসেছে। প্রচারণার মাধ্যমে পাওয়া বিনা মূল্যের প্রচারও তাদের বিপণন কৌশলের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সুতরাং, গল্পটার আসল শিক্ষাটা বেশ সোজা ও পরিষ্কার। বিশ্বজুড়ে নারীদের তোমরা যেমন, তেমনই সুন্দর বোঝাতে গিয়ে প্রসাধনী ব্র্যান্ডগুলো আসলে বুঝিয়ে দিয়েছে, আবেগ এমন এক মহার্ঘ পণ্য, যা সঠিক বিজ্ঞাপনে মুড়ে পরিবেশন করতে পারলে কেবল সাবানের টুকরো বেচেও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়।
সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলাক বা না বদলাক, সাবানওয়ালার ব্যাংক ব্যালান্স কিন্তু ঠিকই বদলে যায়!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সুন্দর ভাবুন বা না ভাবুন, বিলটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনাকেই মেটাতে হলো।


পাঠকের মন্তব্য