ইলা মিত্র থেকে যেভাবে নাচোলের মানুষের 'রানী মা'

২৯ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

চাইলেই তিনি আর দশজনের মতো আরাম-আয়েশে জীবন কাটাইতে পারতেন। কলকাতার সচ্ছল পরিবারে জন্ম, পড়াশোনা, বিয়ে, সব মিলিয়ে তার জীবনটা অন্যরকম হইতে পারত। কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেন নাই। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে দাঁড়াইছিলেন বাংলার গরিব কৃষক আর সাঁওতালদের পাশে। কৃষকদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে গিয়ে তাঁকে সহ্য করতে হইছিল ভয়াবহ নির্যাতন। মানুষটা হইলেন ইলা মিত্র।

সময়টা ১৯৪০-এর দশক। তখন বাংলার অনেক কৃষক অন্যের জমিতে চাষ করতেন। সারা বছর জমিতে খাটাখাটনি করে ফসল ফলানোর পরও অর্ধেক ফসল জমির মালিককে দিতে হইত। অথচ চাষাবাদের বেশির ভাগ পরিশ্রম আর খরচ বহন করতেন কৃষকরাই। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকদের দাবি ছিল, ফসলের অর্ধেক না, তিন ভাগের দুই ভাগ তাঁদের দিতে হইব। এই দাবির নামই তেভাগা আন্দোলন।

ইলা মিত্র শুধু দূর থেকে এই আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেন নাই। তিনি নিজেই কৃষকদের সঙ্গে মিশছেন, তাদের সংগঠিত করছেন, তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অংশ নিছেন। বিয়ের পর স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে নাচোল অঞ্চলে গিয়ে তিনি দরিদ্র কৃষক ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। কৃষকদের জীবনসংগ্রামকে নিজের জীবনের অংশ বানাইয়া ফেলেন।

একবার ভাবেন, সেই সময়ের একজন সচ্ছল পরিবারের নারী নিজের আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে এমন একটা সংগ্রামে জড়াইতেছেন, যেখানে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও ছিল। কেন? কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, যারা ফসল ফলান, সেই ফসলের ন্যায্য ভাগ পাওয়ার অধিকারও তাদের আছে।

নাচোল অঞ্চলে ইলা মিত্র বিশেষ করে সাঁওতাল কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষকদের পাশাপাশি নারীদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ভরসার একজন মানুষ। অনেকে তাকে শ্রদ্ধা করে ‘রানি মা’ বলে ডাকতেন।

কিন্তু কৃষকদের এই আন্দোলন তৎকালীন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের নাচোল অঞ্চলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে সেখানে কৃষকদের সঙ্গে প্রশাসনের সংঘাত বাড়তে থাকে। আন্দোলন দমন করতে পুলিশি অভিযান চালানো হয়, গ্রেপ্তার করা হয় অনেককে।

১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার হন ইলা মিত্রও। এরপর তার জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। কারাগারে তার ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে তিনি সেই নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরেন। কৃষকদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে গিয়ে একজন নারীকে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হইছিল, সেই ইতিহাস আজও শিউরে ওঠার মতো।

নির্যাতনের কারণে তার শরীরের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। পরে মুক্তি পেয়ে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানেও রাজনীতি ও জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নাচোলের কৃষকদের অধিকার আদায়ের জন্য তার যে লড়াই, তা বাংলার ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেয়।

তেভাগা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কৃষকদের সব দাবি আদায় করতে পারে নাই। কিন্তু এই আন্দোলন দেখাইয়া দিছিল, সাধারণ কৃষকরাও সংগঠিত হলে শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। আর ইলা মিত্র দেখাইছিলেন, মানুষের অধিকারের প্রশ্নে শুধু সহানুভূতি দেখানোই যথেষ্ট না, প্রয়োজনে সেই মানুষের পাশে দাঁড়াইয়াও লড়তে হয়।

ইলা মিত্রের গল্পটা তাই শুধু একজন কমিউনিস্ট নেত্রীর গল্প না। এটা এমন একজন নারীর গল্প, যিনি নিজের শ্রেণিগত স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে গিয়ে শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়াইছিলেন। যাদের কথা শোনার মানুষ ছিল কম, তাঁদের কথাই সামনে আনতে চেয়েছিলেন। সেই লড়াইয়ের জন্য তাকে ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করতে হইছে, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস মুছে যায় নাই।

আমরা ইতিহাসে অনেক ক্ষমতাবান মানুষের নাম মনে রাখি। কিন্তু ইলা মিত্রের মতো মানুষদের গল্প মনে করায়, ইতিহাস শুধু ক্ষমতাবানদের হাতে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি করেন সেই মানুষরাও, যারা অন্যায়কে অন্যায় বলতে ভয় পান না, আর অন্যের অধিকারের জন্য নিজের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পিছপা হন না।

২৯ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​