৮. মালির বালি
তৃতীয় বছরে রাকিবুলকে পাঠানো হলো আফ্রিকার সাহেলে। ওখানে দিনে পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপমাত্রা, রাতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। অভিযানের নামটা খুব সুন্দর, শান্তি, স্থিতিশীলতা, সুরক্ষা, এইসব।
মিশনের নাম সবসময় সুন্দর হয়। নাম যত সুন্দর, কাজ তত নোংরা।
ওখানে কে শত্রু বোঝা যায় না। সকালে যে লোকটা রাস্তার ধারে বসে ছিল, বিকেলে তার হাতে অস্ত্র থাকতে পারে। রাস্তার প্রতিটা কাঠি, প্রতিটা প্লাস্টিকের ব্যাগে হয়তো 'মৃত্যু' লেখা আছে।
একদিন শুকনো নদীর খাত পার হচ্ছিল ওদের গাড়ি। বিস্ফোরণটা এত জোরে হলো যে কিছুক্ষণ কিছু শুনতেই পেল না। চোখ খুলে দেখল, পাশের গাড়িটা থেমে আছে। ছুটে গিয়ে দেখল, অর্জুন পড়ে আছে। বেঁচে আছে, কিন্তু একটা পা নেই।
অর্জুন তাকিয়ে বলল, মার্ক, আমার বুটটা এনে দাও তো!
রাকিবুল বুটটা খুঁজে এনে ওর হাতে দিল। ওর ভেতরে তখনো অবশিষ্ট কিছু ছিল, সে বলল না। অর্জুন হাসল। ওর জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর হাসি।
পাঠক, যুদ্ধের এই দিকটা সিনেমায় থাকে না। কোনো বীরত্ব নেই, গান নেই, শুধু একটা বুট আর একজন মানুষ, যে বুঝতে পারছে না সে আসলে কতটা হারিয়েছে।
বুট ঠিক থাকলে মানুষ ঠিক থাকে, অর্জুন বলত। কথাটা কি মিথ্যা ছিল!
সেদিন রাতে রাকিবুল খেতে পারল না। তবে তার পরদিন খেল। তৃতীয় দিনও। চতুর্থ দিনও। এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা, মানুষ সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়।
চাদের এক রাতের হামলায় ওর আরেক সহযোদ্ধা আহত হলো। অন্ধকারে তাকে টেনে আনতে গিয়ে হাত রক্তে ভিজে গেল।
লোকটা বারবার বলছিল, আমাকে ছেড়ে যেও না। পেছনে গুলি চলছে সমানে, সামনে অন্ধকার। হঠাৎ লোকটার শরীরের ওজন বদলে গেল।
রাকিবুল বলল, শুনতে পাচ্ছ?
কোনো উত্তর নেই। তবু সে আরও কয়েক সেকেন্ড টেনে নিয়ে গেল। কেন, সে জানে না। ভোরে হাত ধুতে গিয়ে দেখল, পানি প্রথমে লাল হলো। তারপর থেকে পানির নিচে হাত রাখলেই ওই রাতটা ফিরে আসত।
সৈনিকদের সুবিধা এই যে তাদের হাত ধোয়ার জন্য যথেষ্ট পানি দেওয়া হয় না।
৯. মেয়েটার চোখ
মধ্য আফ্রিকায় একটা গ্রামে ওরা ঢুকেছিল। কয়েকটা ঘর পুড়ে গেছে। একটা ঘরের সামনে ছোট ছোট জুতা পড়ে আছে। আরেক দরজায় রক্তের দাগ। ভেতরে কেউ নেই।
বাইরে সাত-আট বছরের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। রাকিবুল ওর দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিল।
মেয়েটা নিল না। সে তাকিয়ে ছিল শুধু রাকিবুলের রাইফেলের দিকে।
তখন রাকিবুল প্রথমবার বুঝল, একটা শিশুর চোখে সৈনিক আর খুনির মধ্যে কোনো তফাত নেই।
ইউনিফর্ম থাকা আর না থাকার মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো, একটার পেছনে সরকার থাকে। শিশুটি এই সূক্ষ্ম আইনি পার্থক্য বোঝে না।
সেদিন রাতে সে ঘুমাল না। পরের রাতেও না। কয়েক মাস পর মেয়েটার মুখ মনে থাকল না, শুধু চোখ দুটো থেকে গেল। ভেবেছিল, বছর গেলে চোখ দুটো ঝাপসা হবে। ভুল ভেবেছিল। ওগুলো আরও স্পষ্ট হলো।
লিজিয়নে পাঁচ বছর কাটল ছয়টা দেশে, দুজন বন্ধু হারিয়ে, একটা নতুন দাঁত লাগিয়ে। ঘুম ভাঙত অল্প শব্দেই। আতশবাজির শব্দে শরীর শক্ত হয়ে যেত।
মার্সেইয়ের মানুষ নিউ ইয়ারে ফোটানো আনন্দের বাজি আর রাকিবুলের শরীরের পুরোনো শব্দের তফাত জানত না।
১০. কাগজ
এভাবেই একটা সময় পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। রাকিবুলের বয়স তখন তেতাল্লিশ। আবেদন, ফাইল, ইন্টারভিউ, আবার ফাইল। ফরাসি আমলাতন্ত্র যে বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়েও ধীর, সে আগে জানত না।
অফিসার প্রথমে জানতে চাইলেন, তার বাবার জন্মসনদ কোথায়। রাকিবুল বলল, মহাদেবপুর ইউনিয়ন পরিষদে, সম্ভবত ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। অফিসার এমনভাবে তাকালেন, যেন ইঁদুরও একটা বড় ধরনের অপরাধ করেছে।
ছয় মাস পর একটা খাম এল। ভেতরে ফরাসি নাগরিকত্বের কার্ড। পাঁচ বছরের রক্ত, এক বন্ধুর একটা পা, আর একটা শিশুর চোখের চাহনির বিনিময়ে ছাপা ছোট একটা কার্ড।
অথচ ছবিটা ভালোই এসেছে। ওর বাংলাদেশের এনআইডি কার্ডের মতো ভয়াবহ হয় নাই।
রাকিবুল ভাবল, চন্দননগরের ছাব্বিশজনকে ফ্রান্স বলেছিল নিজের সন্তানের মতো দেখবে। সন্তান হতে তার লাগল পাঁচ বছর আর এক বন্ধুর পা। একশো বছরে সম্ভবত বাঙালির দাম কিছুটা বেড়েছে।
মাকে ফোন করল।
মা, আমি পাসপোর্ট পাইছি।
কোন দেশের?
ফ্রান্সের।
তো? আমাদের দেশেরটা কী দোষ করছিল?
রাকিবুল হেসে ফেলল। মা চুপ করে থেকে বললেন, তুই কি এখন সাহেব হইছিস?
না মা, আমি তোমার রাকিব।
সেইটাই যথেষ্ট, মা বললেন, গলাটা ভারী। তারপর যোগ করলেন, পাশের বাড়ির জলিলের ছেলের জন্য একটা ভিসা করাইতে পারবি?
১১. লায়লা
মার্সেইয়ের এক আলজেরীয় বেকারিতে রাকিবুল রোজ সকালে রুটি কিনত। দোকানের মেয়েটার নাম লায়লা। বাবা-মা আলজেরিয়া থেকে এসেছিল পঁয়ত্রিশ বছর আগে, নিজের জন্ম এখানেই।
প্রথম মাসে রাকিবুল কিছু বলেনি। দ্বিতীয় মাসে লায়লা জিজ্ঞেস করল, তুমি রোজ একই রুটি কেনো কেন?
রাকিবুল বলল, ফরাসিতে এই একটা শব্দই আমি নিখুঁতভাবে বলতে পারি।
এই মেয়েটা ধীরে ধীরে ওকে আরেকটা জীবন দেখাল। যেখানে ভোরে ওঠার কারণ কোনো সিনিয়রের আদেশ লাগে না, রাতে দরজা বন্ধ করার মানে নিরাপত্তাহীনতা না, বাজারে যাওয়ার মানে শুধুই খাবার কেনা, যুদ্ধের প্রস্তুতি না।
লায়লার বাবা প্রথমে তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। ফরাসি আর্মির প্রতি ওই পরিবারের স্মৃতি তেতো ছিল, আর এখন তার ঘরে সেই আর্মির পোশাকে এক বাঙালি এসে বসেছে।
কিন্তু রাকিবুল দুই বছর ধরে প্রতি শুক্রবার কুসকুস খেতে গেল, আর বুড়ো দেখলেন, ছেলেটা অন্তত খাওয়ায় কৃপণ না। এক সন্ধ্যায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার দেশে বিয়ে কীভাবে হয়?
রাকিবুল বলল, গায়ে হলুদ হয়, গান-বাজনা হয়, আর বিয়ের আসরে দাওয়াত খেতে আসা লোকে এত বেশি খেয়ে ফেলে যে পরদিন সবার পেট খারাপ হয়ে যায়।
বুড়ো হাসলেন। বললেন, তাহলে দুই দেশের বিয়ে একই রকম। সবাই দেদারসে খায়, আর তারপর কেউ কিছু মনে রাখে না।
১২. হিসাব
বিয়ের পর লায়লাকে নিয়ে রাকিবুল দেশে ফিরল কয়েক দিনের জন্য। মহাদেবপুরে খবর ছড়াতে একদিনও লাগল না।
যে মানুষগুলো একসময় আড়ালে তাকে 'জেলখাটা' বলে ফিসফিস করত, তারাই এখন বিমানবন্দর থেকেই ভিড় করে এল।
'রাকিব ভাই', 'মার্ক সাহেব' ডাকাডাকি। এক দূরসম্পর্কের চাচা এসে বললেন, 'তুই তো আমাদের গর্ব রে বাবা।' অথচ এই চাচাই সেদিন ওর দাঁত ভাঙার দিন সবচেয়ে জোরে হেসেছিলেন।
মানুষের স্মৃতি বড় সুবিধাবাদী। সফল মানুষের অতীত সবাই ভুলে যায়, শুধু নিজের হাসিটা মনে রাখে। 'বিদ্রোহী' থেকে 'সাহেব' হতে বিদেশি একটা পাসপোর্ট ছাড়া আর কিছুই লাগে না।
বাবার কবরের সামনে রাকিবুল অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। মা পাশে এসে বললেন, 'তোর বাপ বলতো, তুই একদিন ঠিকই ফিরবি।'
রাকিবুল জানে, বাবা এমন কিছুই বলতেন না। কিন্তু মায়েদের সান্ত্বনা অনেক সময় সত্যের চেয়েও বেশি দরকারি।
এর কয়েক দিন পর বাজারে বাবলুর সাথে ওর দেখা হলো।
বাবলু এখন অনেকটা নরম হয়ে গেছে। ভুঁড়ি বেড়েছে, মাথায় চুল কমেছে। কিন্তু মুখটা একই আছে। প্রথমে চিনতে পারেনি, তারপর চিনে হেসে বলল, 'কিরে! তুই তো দেখি পুরা ফ্রেঞ্চ হয়ে গেছিস।'
রাকিবুল বলল, 'তা তো হইছি।'
'ওই মারামারিটার কথা মনে আছে? তোরে সেদিন সেইরকম পিডাইছিলাম।'
'মনে আছে।'
বাবলু হাসতে হাসতে বলল, 'তুই নাকি আর্মিতে ছিলি? তো মারামারি কিছু শিখবার পারছিস?'
রাকিবুল আর কিছু বলল না। আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে গেল।
প্রথম ঘুষিটা মারল বাবলুর মুখে, সে পেছনে ছিটকে পড়ল। দ্বিতীয়টায় ওর ঠোঁট ফেটে গেল। তৃতীয়টা ও মুখ ঢাকার আগেই একটা দাঁত ভেঙে বাবলু মাটিতে পড়ে গেল।
পাঁচ বছরের লিজিয়নের ট্রেনিং, তিনটা ঘুষিতেই শেষ।
বাজারের লোকজন আবার দর্শক হয়ে গেল। কেউ বিড়ি ধরাল, কেউ হাতের ঠোঙা নামিয়ে রাখল। কেউ বলল, 'ফ্রেঞ্চ আর্মি!' ফরেন লিজিয়ন কী, ওরা জানে না! কেউ হাততালি দিয়ে উঠল।
রাকিবুল শুনল। এই হাততালি আর সেদিনের হাসির আওয়াজ একই মানুষের গলা থেকে আসছে, একই বাজারে। শুধু দিকটা পাল্টে গেছে।
বাবলু মাটিতে বসে রক্তমাখানো থুতু ফেলছে। রাকিবুল খেয়াল করল, তার হাত একটুও কাঁপছে না। কাঁপছে না কেন?
সে নিচু হয়ে বলল, 'সেদিন আমারে মাইরা তুই খুব মজা পাইছিলি। আমিও বহু বছর ধরে ভাবছি এর দাম নেব।' একটু থেমে বলল, 'আজ দামটা নিয়ে বুঝলাম, এই হিসাবটা আসলে আমার ছিলই না।'
একটু দূরে লায়লা দাঁড়িয়ে ছিল। সে কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, 'চলো।'
'কোথায়?'
'বাড়ি।'
রাকিবুল হালকা হাসল, 'কোন বাড়ি?'
লায়লা উত্তর দিল না। দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। পেছনের বাজার তখনও হাততালি দিচ্ছিল।
১৩. সকাল
সেদিন রাতে রাকিবুলের ঘুম এল না। বাইরে মহাদেবপুরের নিস্তব্ধ রাত, দূরে কুকুর ডাকছে। কোথাও গুলি নেই, কোনো অর্ডার নেই। তবুও তার মাথায় একটা শব্দ বাজতেই থাকল। দাঁত ভাঙার শব্দ।
সেই শব্দের সাথে এক হয়ে যাচ্ছিল পিলখানার সেই রাতের গুলির শব্দ, আফ্রিকার রাতের বিস্ফোরণ, আর সমুদ্রের ভোরে ভাঁজ করা একটা কাগজ পানিতে ফেলে দেওয়ার শব্দ।
সবগুলো আলাদা আলাদা শব্দ, কিন্তু মাথার ভেতর মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
ভোরের আগে লায়লা জেগে দেখল, সে জানালার পাশে বসে আছে। হাতে একটা পুরোনো ছবি। পেছনে ধানখেত, সামনে বাবা, মা আর ছোট্ট রাকিবুল।
'কী দেখো?'
'ভাবছি, এই ছেলেটা যদি জানত সামনে ওর জীবনে কী কী হবে, তাহলে কি সেদিন বাবলুর সাথে মারামারি করত?'
'জানি না।'
'আমিও জানি না।'
ছবিটা নামিয়ে রাখল সে। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, এত বছর পরও সে বুঝতে পারছে না, বাবলুকে সে কি সত্যিই শাস্তি দিতে চেয়েছিল, নাকি নিজের ভেতরের সেই ছোট, অসহায় ছেলেটাকে প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে সে আর দুর্বল নেই।
আর এই প্রমাণটা সে কাকে দিতে চাইছিল? ওই বাজারকে, যে আজ হাততালি দিল, যারা কাল আবার অন্য কারও ভাঙা দাঁত দেখে হাসবে?
তার মনে পড়ল ভার্দুনের কাদায় পড়ে থাকা চন্দননগরের ছাব্বিশজন সৈনিকের কথা। একশো বছর পর কেউ তাদের গল্প খুঁজে বের করেছিল। রাকিবুলের গল্প কে খুঁজবে?
কোনো আর্মির অফিসার কি কোনোদিন লিখবে, পিলখানার এক সিপাহি, সমুদ্র পেরোনো এক লিজিয়নার, যাকে দেশ ভুলে গিয়েছিল আর যে দেশকে ভুলতে পারেনি?
হয়তো না। আজকাল কারও কাছে স্মৃতির পেছনে খরচ করার মতো সময় বা টাকা নেই।
জানালার বাইরে ধানখেতের ওপর ভোরের আলো ফুটছিল। কমলা রঙের আলো। ঠিক সেই আলোটা, যেটা সে একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে বর্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখত।
এত ঘুরে এসে সে বুঝল, এই আলো কোনো শহরের ছিল না। এটা শুধু সূর্য ওঠার আগমুহূর্তে আকাশের নিজের রঙ।
রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি বসানোর শব্দ এল। রাকিবুল চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবার সেই শিশুটার চোখ দেখতে পেল। তারপর চোখ খুলল। এবার আর কিছু নেই, শুধু ভাতের গন্ধ।
মানুষ যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধ থেকে সত্যি সত্যি বের হতে পেরেছে কি না, তার কোনো সার্টিফিকেট কোনো দেশ দেয় না।



পাঠকের মন্তব্য