ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় জড়ায় আছে অলি আহাদের নাম। মানুষটা রাজনীতি করতে গিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি সামলাইছেন, জেল খাটছেন, বারবার গ্রেপ্তার হইছেন। কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে সহজে সরেন নাই।
১৯৪৮-৪৯ সালের দিকে ভাষা আন্দোলন আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ায় অলি আহাদকে চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলাফল কী হইল? ১৯৫০ সালে বি.কম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করার পরও এম.কমে ভর্তি হতে পারলেন না!
একবার ভাবেন, পরীক্ষায় প্রথম হইয়াও শুধু আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার কারণে নিজের পড়াশোনা চালাইতে পারলেন না। পরে দীর্ঘ ৫৮ বছর পর, ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। মানে, যে অন্যায়ের প্রতিকার হইতে এত বছর লাগল, তত দিনে একটা মানুষের জীবনের কত কিছুই না বদলাইয়া গেছে!
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘট হয়। ছাত্ররা রাস্তায় নামেন, চলে পিকেটিং। সেই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হন অলি আহাদ। ভাষা আন্দোলনের একেবারে শুরুর দিক থেকেই তিনি সামনে থেকে লড়াই করছিলেন।
এরপর আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আগের রাতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে আলোচনা চলতেছিল, পরদিন ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কি না। অনেক নেতাই ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ছিলেন না। তাদের ভয় ছিল, এতে আন্দোলন অন্যদিকে চলে যেতে পারে।
কিন্তু অলি আহাদ, আবদুল মতিন আর ইব্রাহিম তোয়াহা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, সরকারের নিষেধাজ্ঞা মাইনা নিলে আন্দোলন দুর্বল হইয়া পড়বে।
পরদিন ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাস্তায় নামলেন। পুলিশ গুলি চালাইল, প্রাণ হারাইলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। সেই ভাষার লড়াই আজ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটা।
অলি আহাদের রাজনৈতিক জীবনেও জেল-জুলুমের অভাব ছিল না। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, তিনি মোট ১৭ বার গ্রেপ্তার হইছেন। গণতন্ত্র আর মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাইতে হইছে তাকে।
এরশাদের সামরিক শাসনামলেও তিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিছিলেন। ক্ষমতায় কে আছে, সেটা বড় কথা ছিল না, অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করাটাই ছিল তাঁর রাজনীতির জায়গা।
অলি আহাদের জীবনের দিকে তাকাইলে একটা জিনিস বোঝা যায়, রাজনীতি সবার কাছে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা না। কেউ কেউ নিজের পড়াশোনা, ব্যক্তিগত জীবন, আরাম-আয়েশ সবকিছু ঝুঁকিতে ফালাইয়াও নিজের বিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়ায় থাকেন।
অলি আহাদ তেমনই একজন মানুষ ছিলেন। ভাষার অধিকারের জন্য লড়ছেন, গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন, জেল খাটছেন, বহিষ্কৃত হইছেন। তারপরও নিজের অবস্থান থেইকা সরে যান নাই। ইতিহাসে তার নামটা তাই শুধু একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে না, বরং আপসহীন এক সংগ্রামী মানুষ হিসেবেও মনে রাখার মতো।



পাঠকের মন্তব্য