সরকার গঠনের পর এপ্রিলে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ঢাকার জন্য ১২ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। বিশেষ করে উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ভিজিবলি কিছু কাজ করেছে—যদিও মিরপুর-ভিত্তিক বেশি। তিনি নিজে ময়লা-আবর্জনা, পরিচ্ছন্নতা, ইত্যাদি ইস্যুতে রাস্তায় বের হয়েছেন। এই বিষয়ে আর্জি রেখে, মন্তব্য করেছেন। জুলাইয়ে তিনি দূষণ কমিয়ে, কার্বন ক্রেডিট অর্জনের কথা বলেছেন। প্রতি নবজাতক শিশুর বিপরীতে একটি গাছ লাগাতে জনগণকে আহবান করেছেন। বায়ু ও শব্দ দূষণে প্র্যাক্টিক্যাল ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আগস্টে তিনি নদী দূষণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ঢাকা শহরের আশেপাশের দখল হওয়া খালবিল ও নদী পুনরুদ্ধারে উদ্যোগের কথা বলেছেন—যেটা সম্ভবত বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। ক্ষমতায় আসার পরপর এই কাজে কিছু বরাদ্দও দেয়া হয়েছিল বলে মনে পড়ে। গত মাসেও তিনি দূষণ-মুক্ত নদীর কথা বলেছেন। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় সুনির্দিষ্ট করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী ও আশেপাশের খাল ও নালার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা ও বৈর্জ্য অপসারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার বন্ধের কথা বলেছেন। গুলশান-বনানি লেকের দূষণ বন্ধের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। সারাদেশে বন উদ্ধারের কথা বলেছেন। তার দল কোটি কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জনগণকে দায়িত্ব নিতে বলেছেন। এই সেদিনও বলেছেন যে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর একটি হিসেবে ঢাকা শহরের অবস্থানটা লজ্জাজনক।
এর আগে কোনো প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ ও দূষণ, ইত্যাদি নিয়ে এভাবে কথা বলেননি। এগুলো সবই ওয়েলকাম, রিফ্রেশিং।
কিন্তু দিনশেষে, এগুলো তো সব কথার কথা। তিনি ফিলোসফার কিংয়ের মতো পরামর্শ দিয়ে গেলেন, আহবান জানালেন, নির্দেশ দিলেন, ইত্যাদি। কিন্তু পলিসিমেকার হিসেবে তিনি কী করলেন? আসুন দেখে আসা যাক।
কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে এলজিআরডি সড়ক বানাচ্ছে—যেটা, প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন দখলদারদের যাতায়াতের সুবিধা করে দেয়ার জন্য। গাজীপুরের শালবনের ভেতর বিশাল বড় ময়লার বাগাড় বানিয়েছে সিটি কর্পোরেশন।
আচ্ছা, এগুলো না হয় স্থানীয় সরকার করেছে। তার জাতীয় সরকার কী করেছে?
বণিকবার্তা বলছে, খুব সঙ্গোপনে ফের বদলে ফেলা হয়েছে ঢাকা শহরের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ। এতে করে, আগে যেখানে বাসাবাড়ি করা যেতো না, সেখানে এখন বাসাবাড়ি করার জন্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগের চেয়েও বেশি ক্রাউডেড হবে শহর; দূষণ বাড়বে অবধারিতভাবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, যেই বুড়িগঙ্গার দূষণ সম্ভবত আমাদের জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক—যেই লজ্জার কথা তিনি নিজে ইভোক করে আমাদের সকলকে লজ্জা দিতে চেয়েছেন—এবং যেই বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে তিনি সভা করেছেন, সেই বুড়িগঙ্গার প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় ভারি শিল্প গড়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তাহলে লাভ কী? আপনি তাহলে কীভাবে নদীর দূষণ কমাবেন? বর্তমান স্ট্যাটাস কোতেই পারছেন না; আরও ভারি শিল্প হলে পারবেন?
শুধু তা-ই না। আপনি ও আপনার দল এত অসংখ্যবার গাছ লাগানোর কথা বলেছেন, বনের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই আপনারাই সুন্দরবনের অতি কাছে ভারি শিল্প স্থাপনের অনুমতি দিবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সেখানে একটা শিল্প অঞ্চল গড়ে উঠেছে। প্রায় ২০০টার মতো কারখানা। এখন বনের প্রতিবেশগত অঞ্চলে ভারি শিল্প স্থাপনের অনুমতি দেয়া হলে, হয়তো দেখা যাবে, পশুর নদীও হয়ে যাবে বুড়িগঙ্গার মতো।
এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে বলতে হচ্ছে যে, আপনার কথায় আর কাজে কোনো মিল নাই, প্রাইম মিনিস্টার। বরং উল্টোটা। আপনি যদি শুরু থেকে বলতেন যে পরিবেশ, প্রতিবেশের দরকার নাই, কারখানা লাগবে, জব সৃষ্টি করতে হবে, গরিব দেশের এসব লাক্সারি খাটে না, তাহলে বুঝতাম। কিন্তু প্রো-এনভারনমেন্ট প্ল্যাটফর্মে ক্ষমতায় এসে ও রেটরিক ব্যবহার করে, একইসঙ্গে এসব ফাজলামির মানে কী?
যদি আসলেই দূষণ কমানোর ইচ্ছা থাকে, তাহলে জনগণের উদ্দেশ্যে বাণী প্রসবের বদলে সরকার ও প্রশাসনের অনেক কিছু করার রয়েছে। প্রথমত, এমন পলিসি চেঞ্জ কেন আনবেন যেটা বিদ্যমান খারাপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে! ইট ডাজেন্ট মেইক অ্যানি সেন্স! দ্বিতীয়ত, কেন ইটিপি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার করে না কারখানাগুলো, সেটা কেন দেখছেন না? বুড়িগঙ্গার প্রবলেমেটিক বেসরকারি কারখানা রাতারাতি সরালে মানুষের সমস্যা হবে, বুঝলাম। কিন্তু সবচেয়ে বড় দূষক যে সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান—যেমন, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, ইত্যাদি—সেগুলোকে দূষণ মুক্ত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা অ্যাডপ্ট করতে বাধ্য করছেন না কেন! এটা তো সম্পূর্ণ আপনার সাধ্যের মধ্যে। কেন ঢাকা শহরের আশেপাশের ব্রিক কিন নিয়ে কাজ করছেন না? কেন নগর অঞ্চলে কন্সট্রাকশন কোম্পানিগুলোকে ও সরকারি প্রকল্পের কন্ট্রাক্টরদের বায়ু ও শব্দ দূষণ রোধে ব্যবস্থা নেয়ার পলিসি নিচ্ছেন না? এই নগরে তো সরকার আর মিলিটারির চেয়ে বড় ইনফ্রাস্ট্রাকচার স্পেন্ডার নাই।
ইয়োর ওয়ার্ডস মাস্ট বি মেট উইথ অ্যাকশন্স। নয়তো এসব কথার ফুলঝুরির কোনো দাম থাকবে না দুইদিন পর।
নাজমুল আহসান; এক্সিকিউটিভ এডিটর, নেত্র নিউজ



পাঠকের মন্তব্য