সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় আইন কি সবার জন্য সমান?

৬ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

১

ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভার সিকেউসিক গ্রামের আকাশটা কেমন যেন একটু অন্যরকম। বিকেল নামলেই সেখানে মেঘ জমে, গাছের পাতায় জলের ফোঁটা জমতে জমতে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামে। সেই গ্রামেরই এক কোণে একটা ছোট্ট কাঁচা ঘরে বাস করত তুতি। তুতির কোলজুড়ে একটা পুঁচকে খোকা ছিল। খোকাটার বয়স তখন কতই বা হবে! খিদের চোটে সে যখন কেঁদে উঠত, তুতির বুকটা কেমন যেন চিনচিন করে উঠত। অভাব এমন এক জিনিস, যা মানুষের চোখের সব আলো ধীরে ধীরে নিভিয়ে দেয়।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস। বাতাসে তখন কেমন একটা বিদায়ী শরতের গন্ধ। তুতি ঠিক করল, আর নয়। এভাবে দিন কাটানো যায় না। দেশ ছেড়ে বহু দূরে, যেখানে বালির সমুদ্র আর কেবলই তেলের দেশের গল্প শোনা যায়, সেই সৌদি আরবে তাকে যেতেই হবে। লোকে বলত, সেখানে গেলে নাকি অনেক টাকা রোজগার করা যায়। খোকাটার মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দেওয়া যায়, বৃষ্টির দিনে মাথার ওপরের ফুটো চালটা সারাই করা যায়। বুকভরা আশা আর চোখে অজস্র জল নিয়ে তুতি বিমানে উঠল। সে তখন ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে এই বিমান তাকে এক দীর্ঘ রাতের নরকের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে।

তায়েফ শহরটা বেশ অদ্ভুত। পাহাড়ের ঢালে গড়া সেই শহরে মানুষগুলো অন্য ভাষায় কথা বলে, তাদের চালচলনও অচেনা। তুতি কাজ পেল এক বয়স্ক মানুষের পরিচর্যার। বাড়ির কর্তা সুউদ মালহাক আল উতাইবি। প্রথম প্রথম সব ঠিকঠাকই ছিল হয়তো। কিন্তু মাস গড়াতে লাগল। দেখতে দেখতে আট মাস পার হয়ে গেল, অথচ তুতির হাতের তালুতে জমানো বেতনের একটা পয়সাও পড়ল না। ছয় মাসের পুরো বেতন বকেয়া পড়ে রইল। রাতের পর রাত তুতি জানালার ধারে একা দাঁড়িয়ে নিজের ছোট্ট খোকার মুখটা মনে করে ফুঁপিয়ে কাঁদত। আর দিনের বেলা? দিনের বেলা সেই অচেনা বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর তার ওপর শুরু হলো এক অকথ্য অন্ধকার। মানুষ মানুষের ওপর এতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে, তুতি তা আগে জানত না।

২

দিনগুলো আসছিল অন্ধকারের কালো চাদর মুড়ি দিয়ে। মানুষের লোভ আর লিপ্সার কি কোনো শেষ আছে? সম্ভবত নেই। ২০১০ সালের ১১ মে। তায়েফ শহরের আকাশটা সেদিন কেমন যেন থমথমে হয়ে ছিল। বাতাস থমকে ছিল গাছের পাতায়।

সেদিন বিকেলে সুউদ লোকটির ভেতরের পশুটা চরম রূপ নিল। সব লজ্জা, ভয় আর মনুষ্যত্বের তোয়াক্কা না করে সে হিংস্র পশুর মতো তুতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু মানুষ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার চরম মুহূর্তে পৌঁছায়, তখন তার ভেতরের ভীরু সত্তাটাও আচমকা আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। তুতি চিৎকার করতে পারল না, শুধু বাঁচতে চাইল। তার হাত দুটো অন্ধের মতো আশপাশে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইল। ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল একখানা শক্ত কাঠের লাঠি। তুতি আর এক মুহূর্তও ভাবল না। নিজের ইজ্জত আর প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় সে লাঠিটা উঁচিয়ে সজোরে আঘাত করল সুউদের মাথায়।

শব্দটা খুব বেশি বড় ছিল না, কিন্তু ফলাফল হলো ভয়াবহ। রক্তে ভেসে গেল মেঝের একপাশ, আর তাতেই লোকটির প্রাণপাখি উড়ে গেল ওপারে।

ঘটনার আকস্মিকতায় তুতির মাথার ভেতরটা যেন এক লহমায় ফাঁকা হয়ে গেল। সে কী করবে, কোথায় যাবে? থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের দরজা খুলে সে বেরিয়ে এল রাস্তায়। পালানো ছাড়া আর কোনো পথ তার সামনে খোলা ছিল না। বের হওয়ার সময় নিজের আট মাসের পাওনা বেতনের কিছুটা ক্ষতিপূরণ আর বাঁচার সামান্য সম্বল হিসেবে ঘর থেকে কিছু গয়না আর কিছু টাকা সঙ্গে নিয়েছিল। মরুভূমির অচেনা রাস্তায় একটা মেয়ে একাকী ছুটতে লাগল।

কিন্তু নিয়তির পরিহাস বোধহয় একেই বলে। মক্কার পথ ধরে যখন সে পালাচ্ছিল, তখন তার সঙ্গে দেখা হলো কয়েকজন মানুষের। তারা অভয় দিল, আশ্বাস দিল, তাকে নিরাপদে মক্কায় পৌঁছে দেবে বলে জানাল। নিঃস্ব, ভয় পাওয়া তুতি বিশ্বাস করেছিল সেই মানুষগুলোকে। সে জানত না, সভ্যতার মুখোশ পরা শয়তানরা রাস্তার মোড়ে মোড়েই ওত পেতে থাকে। নয়জন পুরুষ মিলে সেই অসহায় মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাকে নির্যাতন করল, গণধর্ষণ করল, আর সঙ্গে থাকা শেষ সম্বলটুকুও লুট করে নিয়ে এক অন্ধকার রাতে তাকে ফেলে রেখে গেল।

পরদিন, ১২ মে। তায়েফের পুলিশ এসে তুতিকে গ্রেপ্তার করল। তখন আর তার চোখে কোনো জল ছিল না, ভয়ও যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। পুলিশের কাছে তুতি সমস্ত সত্যি স্পষ্ট করে বলল, সে কাউকে ইচ্ছা করে মারেনি, কেবল নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু মরুভূমির দেশের বিচারকেরা হয়তো কোনো এক অজানা ভাষায় কথা বলতেন, যে ভাষায় একজন বিপন্ন নারীর আত্মরক্ষার আকুতি পৌঁছাত না।

৩

আইন, আদালত, বিচারকের কাঠের হাতুড়ি, এই সব ভারী ভারী জিনিস নাকি মানুষকে বিচার এনে দেয়। কিন্তু তায়েফের সেই অন্ধকার আদালতকক্ষে তুতির জন্য কোনো ন্যায়বিচার অপেক্ষা করছিল না; অপেক্ষা করছিল নিরেট এক মৃত্যুদণ্ড।

২০১১ সালের জুন মাস। আদালতের ভেতরে অদ্ভুত থমথমে নীরবতা। তুতি একা দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে কোনো আইনজীবী নেই, কেউ নেই তার হয়ে দুটি কথা বলার জন্য। শুধু মাঝখানে দোভাষী নামের একজন মানুষ, যিনি দুটো কাঠখোট্টা বাক্যে সব অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। তুতির একটাই আকুতি ছিল, আমি তো শুধু নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম! কিন্তু আদালত সেই আত্মরক্ষার আর্জি কানে তুলল না। রায় হয়ে গেল, ‘কিসাস’। অর্থাৎ, রক্তের বদলে রক্ত, প্রাণের বদলে প্রাণ।

সংবাদটা যখন সুদূর ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছাল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবুও চেষ্টা থামেনি। ইন্দোনেশিয়া সরকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিনবার আইনজীবী বদল করা হলো, উচ্চ আদালতে আপিল হলো, পুনর্বিবেচনার আবেদন জমা পড়ল। এমনকি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নিজে সৌদি বাদশাহর কাছে দুটি চিঠি পাঠালেন, একটিমাত্র জীবনের ভিক্ষা চেয়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে অনেক জল ঘোলা হলো। পরিবারের লোকজনকে শেষবারের মতো দেখা করতে তায়েফে নিয়ে আসা হলো তিনবার। অচেনা কাচের ওপাশ থেকে মা তার সন্তানকে দেখল, চোখের জলে গাল ভেসে গেল, কিন্তু ভাগ্য তাতে বিন্দুমাত্র বদলাল না। কারণ, নিহত সুউদের পরিবার তুতিকে ক্ষমা করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

তারপর এল সেই কৃষ্ণপক্ষ। ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর।

তায়েফ শহরের সকালটা সেদিন প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল। অথচ ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল একটা জীবন। ইন্দোনেশিয়ার কনস্যুলেটকে কিছু জানানো হলো না, তুতির মা-বাবাকে শেষ একটা খবর পর্যন্ত দেওয়া হলো না। কোনো এক নিঃশব্দ, অন্ধ প্রকোষ্ঠে ৩৪ বছরের একটা মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হলো, আর এক কোপে তার শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। তুতির বুকের ভেতরের সেই একলা খোকাটির কথা, তার দেশের ঝুম বৃষ্টির কথা, আর কোনোদিন কারও কাছে পৌঁছাল না।

খবরটা যখন ছড়িয়ে পড়ল, ইন্দোনেশিয়ার রাস্তায় রাস্তায় মানুষের রাগ আর ক্ষোভ উপচে পড়ল। প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ফোন করে প্রতিবাদ জানালেন, রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠালেন, মানবাধিকারের বুলি বাতাসে ভাসল কিছুদিন। কিন্তু দিনশেষে তো সব শান্ত হয়ে যায়। সময় গড়িয়ে যায়, মানুষ নতুন গল্পে মেতে ওঠে।

শুধু দূর দেশের কোনো এক কাঁচা ঘরের বারান্দায় ঝুম বৃষ্টির রাতে হয়তো একটা বুড়ো মা আর একটা বড় হয়ে ওঠা ছেলে আজও অলৌকিক কোনো ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকে। তারা জানে না, সেই বহু দূর মরুভূমির দেশে তুতি নামের মেয়েটির গল্পটা কত আগেই এক চিরন্তন স্তব্ধতায় মিশে গেছে।

৬ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​