২০১২ সালে যখন ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ নামের এই লম্বা আর কেতাবি স্বপ্নের ফিতা কাটা হইছিল, তখনই যেন একটা চমৎকার নাটকের প্রথম দৃশ্য শুরু হইছিল। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার রাস্তায় ঝকঝকে বাস সাঁই সাঁই করে চলবে। আপনি চায়ে চুমুক দিতে দিতে গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।
কিন্তু সমস্যা হইলো, আমাদের দেশে প্রজেক্টের নকশা করার সময় বাস্তবে গাড়ি কীভাবে চলে, সেই কথাটা অনেক সময় মাথায় থাকে না। শুরুতে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিকমতো করা হইছিল কি না, সেই প্রশ্নও আছে। উপরন্তু, একই প্রকল্পে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ আর এলজিইডির মতো একাধিক সংস্থা যুক্ত ছিল। তিন মাথা এক হইলে যেখানে বুদ্ধি বাড়ার কথা, সেখানে সমন্বয়ের অভাবে কাজ আরও জটিল হইছে।
শুরুতে প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। পরে জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন আর নানা জটিলতায় খরচ বাড়তে থাকে। প্রজেক্ট এগোয় ধীরগতিতে, কিন্তু বাজেট বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। যেন রাস্তা বানানো না, আমরা এক অন্তহীন গল্প লিখতেছি, যার প্রতিটা অধ্যায়ে শুধু খরচের অঙ্ক বাড়ে।
কিন্তু আসল ঝামেলা দেখা দিল বাস কেনার জায়গায়। রাস্তার অনেক কাজ শেষ হইলেও যে বিশেষ বাস এই লেন দিয়ে চলার কথা, সেই বাস কেনার উদ্যোগই সফল হইল না। দুবার দরপত্র আহ্বান করা হইলেও বাস কেনা যায়নি। অর্থাৎ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে স্টেডিয়াম বানানো হইল, কিন্তু খেলা শুরু করার সরঞ্জামই জোগাড় করা গেল না!
বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনাতেও প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা আর বাস্তবায়নের নানা সমস্যা সামনে এসেছে। তত দিনে গাজীপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করা মানুষের বছরের পর বছর সময় গেছে যানজট, ধুলাবালি আর ভোগান্তির মধ্যে।
২
নকশায় সমস্যা, বাস কেনায় জটিলতা আর বছরের পর বছর কাজ ঝুলে থাকার পর যখন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হইলো, তত দিনে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ খরচ হইছিল প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
শুনে মনে হইতে পারে, এত টাকা খরচ হইছে, অন্তত একটা ভালো রাস্তা তো পাওয়া গেল! কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ না। শুরুতে প্রকল্পের বাজেট ছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। পরে তা বাড়তে বাড়তে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার বেশি হয়। ২০২৫ সালে সেটাকে আরও বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হইছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি।
এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিছে, বিআরটির বিশেষ বাসব্যবস্থা আর চালু করা হবে না। রাস্তার মাঝখানের লেন বিভাজক আর স্টেশন সরিয়ে দুই পাশে তিনটা করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়ক বানানো হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এখন প্রশ্ন হইলো, এই পরিবর্তন করতে আবার কত টাকা লাগবে? স্টেশন সরানো, রাস্তা ঠিক করা আর ওভারপাস বড় করার খরচ কত? আগের বানানো অবকাঠামোর কতটুকু কাজে লাগানো যাবে?
আগের খরচ হওয়া প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার সবটাই যে নষ্ট হইছে, এমন বলা যাবে না। রাস্তা, ওভারপাস আর অন্যান্য অবকাঠামোর কিছু অংশ কাজে লাগানো সম্ভব। কিন্তু বিআরটির জন্য বিশেষভাবে বানানো স্টেশন আর লেন বিভাজকের কিছু অংশ সরাতে হবে। ফলে আগের বিনিয়োগের কতটা কাজে লাগবে, সেটা পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।
ব্যাপারটা অনেকটা এমন, রাজমিস্ত্রি ডেকে বাড়ি বানানোর পর ঘুম ভেঙে বুঝলেন, দরজাটা ভুল দেয়ালে লাগানো হইছে। এখন আবার ভেঙে নতুন করে বানাতে হবে। প্রশ্ন হইলো, ভুলটা হইল কীভাবে, আর সেই ভুলের খরচ দেবে কে?
৩
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হইলো, এই যে এত বছর ধরে মানুষকে যানজট, ধুলাবালি আর রাস্তার ভোগান্তির মধ্যে থাকতে হইলো, এর দায় নেবে কে?
একটা প্রকল্প চালু করার কথা ছিল ২০১৬ সালের মধ্যে। কিন্তু এত বছর পর এসে সেই প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ ছয় লেনের রাস্তা বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হইছে। এর পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হইছে। এখন আবার পরিবর্তনের জন্যও টাকা লাগবে।
কিন্তু প্রকল্প বন্ধ করে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ?
যারা পরিকল্পনা করছেন, যারা নকশা তৈরি করছেন, যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কাজের মূল্যায়ন হবে না? কোথায় ভুল হইছিল, কেন বারবার খরচ বাড়ল, বাস কেনার উদ্যোগ কেন সফল হইল না, এসব প্রশ্নের উত্তর কি পাওয়া যাবে না?
সরকার বদলায়, দায়িত্বে থাকা মানুষ বদলায়, কিন্তু জনগণের টাকার হিসাব তো বদলায় না। একটা প্রকল্পের পেছনে এত টাকা খরচ হওয়ার পরও যদি শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার কারণ জনসমক্ষে আসা দরকার।
গাজীপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করা মানুষ এই প্রকল্পের জন্য বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাইছে। তাদের নষ্ট হওয়া সময় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু অন্তত ভবিষ্যতে যেন একই ভুল আবার না হয়, সেই ব্যবস্থা করা সম্ভব।
তাই শুধু প্রকল্প বন্ধ করলেই হবে না। কত টাকা খরচ হইছে, কেন প্রকল্পটা ব্যর্থ হইল, এখন নতুন করে কত টাকা লাগবে আর কারা এর জন্য দায়ী, এসব বিষয়ে পরিষ্কার হিসাব প্রকাশ করা দরকার।
নইলে জনগণের টাকায় একটা প্রকল্প শুরু হবে, বছরের পর বছর খরচ বাড়বে, মানুষ ভোগান্তি পোহাবে, আর শেষে এসে বলা হবে, থাক ভাই, আর ভালো লাগতেছে না, প্রকল্পটা বাদ দিই!



পাঠকের মন্তব্য