সিরাজ সিকদার: বিচার ছাড়াই মৃত্যু, আর সেখান থেকেই কি বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের ইতিহাসের শুরু?

১৩ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে

 

কাউকে আদালতে নেওয়া হলো না, সাক্ষী-প্রমাণ কিছুই হাজির করা হলো না, বিচারও হলো না। পরদিন পত্রিকায় খবর আসল, বন্দুকযুদ্ধে নিহত। ব্যস, গল্প শেষ! এই যে বিচার ছাড়াই মানুষ মেরে ফেলার একটা ব্যবস্থা, এর নামই ক্রসফায়ার। এই সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে সত্তরের দশকের ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

সত্তরের দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছিল। এই আন্দোলন দমন করতে পুলিশও ব্যাপক অভিযান চালায়। তখন কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন রণজিৎ কুমার গুপ্ত। তার সময়ে এই অভিযান আরও সংগঠিত হয়। পুলিশের বক্তব্য ছিল, নকশালদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তারা মারা যাচ্ছে। কিন্তু এসব ঘটনার অনেকগুলো নিয়েই অভিযোগ উঠেছিল, এগুলো আসলে সাজানো এনকাউন্টার। মানে, বন্দুকযুদ্ধের কথা বলা হলেও বাস্তবে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এভাবেই আদালতে বিচার না করে মানুষ মেরে ফেলার এই চর্চা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

বাংলাদেশেও পরে এই সংস্কৃতি দেখা যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটা হলো সিরাজ সিকদারের মৃত্যু। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তার মৃত্যুর খবর আসে। সরকারি ভাষ্য ছিল, পালানোর চেষ্টা করার সময় তিনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে শুরু থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আর বিতর্ক রয়েছে।

এরপর ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্ট আর ২০০৪ সালে র‍্যাব গঠনের পর বাংলাদেশে ক্রসফায়ার শব্দটা আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসী, চরমপন্থী, অপরাধী আর মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময় জানিয়েছে, বন্দুকযুদ্ধে এসব লোক মারা গেছে। কিন্তু অনেক ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা আর নিহতদের পরিবারের অভিযোগ ছিল, মানুষকে আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পরে বন্দুকযুদ্ধের গল্প বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এখন কথা হলো, কেউ অপরাধী হলেই কি পুলিশ তাকে মেরে ফেলতে পারে? অবশ্যই না। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, গ্রেপ্তার করা হবে, তারপর আদালতে বিচার হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আত্মরক্ষার মতো পরিস্থিতিতে আইন অনুযায়ী বলপ্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগকে অজুহাত বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাউকে মেরে ফেলার অধিকার কোনো বাহিনীর নেই।

ক্রসফায়ারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে কে অপরাধী, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব যেন পুলিশের হাতেই চলে যায়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল, তারপর তাকে মেরেও ফেলা হলো। কিন্তু তিনি আসলেই অপরাধ করেছেন কি না, তার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ ছিল, তিনি নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এসব কিছুই আর আদালতে যাচাই হলো না।

একবার চিন্তা করেন, কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলা হলো। পরে দেখা গেল, তিনি নির্দোষ ছিলেন। তখন কী হবে? তিনি তো আর ফিরে এসে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারবেন না। আর তিনি সত্যিই অপরাধী হলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের, পুলিশের না।

তাই ক্রসফায়ারের ব্যাপারটা শুধু অপরাধ দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এখানে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রকে আমরা কতটা ক্ষমতা দেব? আজ একজনকে অপরাধী বলে বিচার ছাড়াই মেরে ফেলা হলো, কাল একই ঘটনা অন্য কারও সঙ্গে ঘটবে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?

আইনের শাসন মানে শুধু ভালো মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া না, অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও বিচার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া। কারণ বিচার ছাড়াই কাউকে মেরে ফেললে সেটা আর বিচার থাকে না, সেটা হয়ে যায় ক্ষমতার জোরে শাস্তি দেওয়া। আর রাষ্ট্রের হাতে যখন কাউকে মেরে ফেলার ক্ষমতা চলে যায়, তখন সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাবে কে?

১৩ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​