ফ্রান্সে এখন আন্দোলনের মৌসুম চলছে। রাস্তায় নামছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, এমনকি পুরোনো ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের লোকজনও। আন্দোলনের শুরুটা হইছিল স্কুল-কলেজের সমস্যা নিয়া। অনেক স্কুলে শিক্ষক নাই, ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর চাপ বেশি, স্কুলের ভবনগুলোর অবস্থাও ভালো না। মানে স্কুল আছে, শিক্ষার্থী আছে, শুধু পড়ানোর মানুষটাই নাই! বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কেন্দ্রীয় অনলাইন আবেদন পদ্ধতি পারকুরসুপ নিয়েও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে ভর্তির আবেদন করে। কিন্তু আবেদন করলেই যে ভর্তি হওয়া যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। অনেকে আবেদন করে অপেক্ষমাণ তালিকায় পড়ে থাকে। এক কথায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা আছে, যোগ্যতাও আছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উত্তর আসতে একটু দেরি হচ্ছে। কখনো সেই উত্তর আর আসেই না!
এরপর আন্দোলন আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। এর সঙ্গে যোগ হইছে জীবনযাত্রার খরচ, জ্বালানি ও খাবারের দাম, বাসাভাড়া আর সরকারি সেবার মান নিয়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। মানুষের আয় বাড়তেছে না, কিন্তু বাজারের ব্যাগের ওজনের সঙ্গে বিলের অঙ্ক বাড়তেছে নিয়মিত। মাসের শেষে বেতন হাতে পাওয়ার পর ফরাসি নাগরিকদেরও হয়তো মনে হয়, এই টাকা কি আমার জন্য, নাকি বাড়িওয়ালা আর সুপারমার্কেটের জন্য?
তবে সব দোষ শুধু ম্যাক্রোঁ সরকারের ঘাড়ে চাপালেও হিসাবটা মিলে না। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ অনেক বেশি, জনসংখ্যার বড় একটা অংশ বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, পেনশন ও স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়তেছে। ইউরোপের জ্বালানি সংকটও জীবনযাত্রার খরচ বাড়াইছে। সরকার একদিকে নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা দিতে চায়, অন্যদিকে বাজেটের অবস্থা এমন যে নতুন করে টাকা খরচ করতে গেলেই ঋণের হিসাব সামনে চলে আসে। শিক্ষা ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষক নিয়োগ ও স্কুল পরিচালনার সমস্যাও বহুদিনের। অর্থাৎ শুধু টাকা দিলেই হবে না, টাকাটা কোথায় যাচ্ছে সেটারও একটা হিসাব থাকা দরকার। নইলে টাকা ঢুকবে, ফাইল ঘুরবে, আর শিক্ষার্থী শিক্ষক খুঁজতে থাকবে।
আন্দোলনের মধ্যে আবার সহিংসতার ঘটনাও ঘটতেছে। কোথাও দোকানপাট ভাঙচুর, কোথাও সরকারি ভবনে আগুন, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশে কিছু উগ্র গোষ্ঠীও সুযোগ নিচ্ছে। ফলে যারা ভালো স্কুল, শিক্ষক আর সাশ্রয়ী জীবন চেয়ে রাস্তায় নামছে, তাদের দাবির সঙ্গে মাঝেমধ্যে ভাঙা জানালা আর পোড়া গাড়ির ছবিও ভাইরাল হচ্ছে। আন্দোলনের দাবি একদিকে, আর টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ আরেকদিকে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে কে কয়টা গাড়ি পোড়াল, সেটাই বড় খবর হয়ে দাঁড়ায়!
রাজনৈতিক দলগুলোও এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। বামপন্থীরা বলতেছে সরকার জনগণের কথা শুনছে না, ডানপন্থীরা বলতেছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেছে। সামনে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাই আন্দোলন এখন শুধু রাস্তায় না, রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাবের খাতাতেও ঢুকে গেছে। জনগণ চাইতেছে ভালো শিক্ষা, কম খরচে জীবনযাপন আর ভালো সরকারি সেবা। আর রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত কে এই ক্ষোভ থেকে কতটা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারবে, সেই হিসাব করতে।
সব মিলিয়ে ফ্রান্সের এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষা, অর্থনীতি, শ্রমিক অধিকার, সরকারি ঋণ এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থার সংকট। নাগরিকরা বলতেছে, আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দেন। সরকার বলতেছে, বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। জনগণের পকেটে টাকা নাই, সরকারের পকেটে ঋণ। আর রাজনীতিবিদদের পকেটে নির্বাচনের হিসাব। আপাতত ফ্রান্সের রাস্তায় এই তিন পক্ষের টানাটানিই চলতেছে।



পাঠকের মন্তব্য