হাতকড়া, শিকল, দড়ি, তালাবন্ধ বাক্স, পানিভর্তি ক্যান, এমনকি মাথা নিচে করে পানির ট্যাংকে আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। কিন্তু প্রতিবারই কয়েক মিনিট পর দেখা যেত, লোকটা দিব্যি বের হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। পৃথিবীর কোনো তালাই তাকে আটকানোর জন্য যথেষ্ট না।
এই মানুষটির নাম হ্যারি হুডিনি।
আজ তার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন মানুষ, যিনি অসম্ভব সব জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুডিনি এত বিখ্যাত হলেন কেন? পৃথিবীতে তার আগেও জাদুকর ছিলেন, এস্কেপ আর্টিস্টও ছিলেন। হুডিনির বিশেষত্ব ছিল, তিনি শুধু জাদুর দেখাননি, বরং জাদুর কৌশলটাকে এমন এক নাটকীয় ঘটনায় পরিণত করেছিলেন, যার শেষটা না দেখা পর্যন্ত দর্শকের শান্তি লাগত না।
হুডিনির আসল নাম ছিল এনরিক ওয়েস । ১৮৭৪ সালে বুদাপেস্টে জন্ম, ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চলে আসেন। কৈশোরেই জাদুর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। শুরুতে তার ক্যারিয়ার খুব একটা জমছিল না। কখনও সার্কাস, কখনও ছোটখাটো শো, কখনও মেডিসিন শোতে পারফর্ম করেছেন। এমনকি একটা সময় জাদুর পুরো জিনিসপত্র বিক্রি করে নিয়মিত চাকরি করার কথাও ভেবেছিলেন।
তারপর ১৮৯৯ সালে তার জীবনে আসে এক ব্রেক থ্রু মোমেন্ট। শিকল আর হাতকড়ার তালা থেকে পালানোর দক্ষতা দেখে শো-ব্যবসার ম্যানেজার মার্টিন ব্রেক বুঝতে পারেন, এই ছেলেটির মধ্যে অন্য কিছু আছে। হুডিনিকে সাধারণ কার্ডের কৌশল বাদ দিয়ে এস্কেপ আর্টে মন দিতে বলেন। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় The King of Handcuffs।
কিন্তু হুডিনির আরেকটি অসাধারণ গুন ছিল, তিনি জানতেন কীভাবে বিখ্যাত হতে হয়।
কোনো শহরে গেলেই তিনি আগে স্থানীয় পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করতেন। সংবাদপত্রকে খবর দিতেন, তারপর পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বলতেন, তাকে হাতকড়া পরানো হোক, জেলের সেলে ঢোকানো হোক। পুলিশ তাঁকে তালাবদ্ধ করত, সাংবাদিকরা অপেক্ষা করত, আর কিছুক্ষণ পর হুডিনি বেরিয়ে আসতেন। এই স্টান্টগুলোর খবর পত্রিকায় ছাপা হতো, আর মানুষ তার শো দেখতে ভিড় করত।
অর্থাৎ হুডিনি বুঝেছিলেন, জাদু দেখানোর আগে জাদুকরের একটা গল্প তৈরি করতে হয়।
লন্ডনে একবার ডেইলি মিরর পত্রিকা তার জন্য বিশেষ হাতকড়া তৈরি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এবার দেখি হুডিনি কী করেন। দর্শকের সামনে সেই হাতকড়া পরানো হলো। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে হুডিনি বেরিয়ে এলেন। হলজুড়ে তখন হইচই।
আরেকবার জার্মানিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে প্রতারক বলে অভিযোগ করেছিলেন। হুডিনি চুপ করে থাকেননি। মানহানির মামলা করে বসেন। মামলায় নিজের কিছু টেকনিকও বলতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ঘটনাও তার জন্য পাবলিসিটি হয়ে দাঁড়ায়। মানে একদম নেগেটিভ কাজের পজেটিভ রেজাল্ট! জার্মানিতে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ক্যোনিগ ডেয়ার হ্যান্ডশেলেন, অর্থাৎ হাতকড়ার রাজা হিসেবে।
তারপর হুডিনি বুঝলেন, শুধু হাতকড়া দিয়ে আর কত? দর্শককে এবার আরও চমক দেখাতে হবে। যেন বুঝতেই না পারে হচ্ছে কী আর হবে কী!
১৯০৮ সালে তিনি নিয়ে এলেন জায়ান্ট মিল্ক ক্যান এস্কেপ। বিশাল একটি মেটাল ক্যান পানি দিয়ে ভরা হলো। হুডিনিকে তার ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগানো হলো। এরপর শুরু হলো অপেক্ষা। পানির নিচে আটকে থাকা মানুষটি বেরোতে পারবেন তো?
হুডিনি বেরিয়ে এলেন।
এটা এত জনপ্রিয় হলো যে একই বছর তিনি সেটি নিয়ে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে ঘুরে বেড়ালেন।
হুডিনির বিখ্যাত সেই জায়ান্ট মিল্ক ক্যান এস্কেপ অ্যাক্ট
কিন্তু হুডিনির নিজের কাছেই এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ দরকার ছিল। ১৯১৩ সালে তিনি হাজির করলেন ওয়াটার টর্চার সেল। কাচের ট্যাংকে পানি ভরা। হুডিনির পা আটকে দেওয়া হচ্ছে, তারপর তাকে মাথা নিচের দিকে করে পানির মধ্যে নামিয়ে তালাবন্ধ করা হচ্ছে। দর্শক সবকিছু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। Library of Congress এর ডোকুমেন্টেশনে তার এই এস্কেপ অ্যাক্টকে তার আগের জায়ান্ট মিল্ক ক্যানের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অ্যাক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই জায়গাতেই হুডিনির জনপ্রিয়তার আসল রহস্যটা বোঝা যায়। তিনি শুধু মানুষকে চমকে দিতে চাইতেন না, মানুষের ভয়কে বিনোদনে পরিণত করতে জানতেন। পানি, দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিকল, জেলখানা, উঁচু ভবন থেকে ঝুলে থাকা- যেসব জিনিস সাধারণ মানুষের দুঃস্বপ্ন হতে পারে, হুডিনি সেগুলোকে মঞ্চের খেলায় পরিণত করেছিলেন। উৎকণ্ঠার পর স্বস্তির যে আনন্দ সেটা তিনি দর্শকদের দিতে জানতেন।
একবার তো নিউইয়র্কের একটি ভবন থেকে উল্টো ঝুলে স্ট্রেইটজ্যাকেট (শরীর আটকে রাখা একরকম পোশাক) থেকে বেরিয়ে আসার সময় নিচে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। আরেকবার হাতকড়া ও পায়ের শিকল পরা অবস্থায় একটি বাক্সে ঢুকিয়ে বাক্সটি দড়ি দিয়ে বেঁধে, ভারী ওজন চাপিয়ে নদীতে নামানো হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই হুডিনি পানির ওপর উঠে এলেন।
তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গেল যে তিনি শুধু জাদুকর রইলেন না, হয়ে উঠলেন সেলেব্রেটি। ইউরোপজুড়ে তার শো সোল্ড আউট হতে লাগল। তার নামে পোস্টার, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন, চ্যালেঞ্জ- সবকিছুই তার নিজের তৈরি করা চরিত্রটাকে আরও বড় করে তুলছিল।
তবে হুডিনির জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায় ছিল জাদুর মঞ্চের বাইরে।
তিনি ভূত-প্রেত বা মৃত মানুষের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের দাবিকে বিশ্বাস করতেন না। বরং জীবনের শেষ দিকে তথাকথিত মিডিয়াম, সাইকিক আর স্পিরিচুয়ালিস্টদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে লড়াই শুরু করেন। কেউ যদি দাবি করত, মৃত মানুষের আত্মাকে ডেকে আনতে পারে, হুডিনি চেষ্টা করতেন দেখিয়ে দিতে কীভাবে সেই অলৌকিক ঘটনা আসলে হাতসাফাই বা প্রতারণার মাধ্যমে ঘটানো যায়।
এমনকি এই কারণে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সঙ্গেও তুমুল মতবিরোধ হয়। ডয়েল স্পিরিচুয়ালিজমে বিশ্বাস করতেন, হুডিনি ছিলেন তার প্রকাশ্য বিরোধী। দুই বন্ধুর এই অদ্ভুত দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কেও ফাটল ধরায়।
হুডিনি যেন সারাজীবন একটা কথাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন চোখে দেখলেই সবসময় সেটা সত্যি না, এর পেছনেও আছে নানা কারসাজি!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার নিজের চোখও এমন একটি দৃশ্য দেখল, যার কোনো এস্কেপ ছিল না।
১৯২৬ সালের অক্টোবরে মন্ট্রিয়েলে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তার পেটের পেশির শক্তি নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন জে. গর্ডন হোয়াইটহেড নামের এক ছাত্র হুডিনির অনুমতি নিয়ে তার পেটে ঘুষি মারতে শুরু করে। হুডিনি নাকি তখনও আঘাতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এরপর থেকেই তার তীব্র পেটব্যথা শুরু হয়।
তবুও তিনি পারফরম্যান্স চালিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, তার অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেছে এবং ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯২৬ সালের ৩১ অক্টোবর, হ্যালোউইনের রাতে, ৫২ বছর বয়সে হ্যারি হুডিনি মারা যান। মৃত্যুর কারণ ছিল রাপচার্ড অ্যাপেন্ডিক্স থেকে হওয়া পেরিটোনাইটিস।
বহু বছর ধরে গল্পটা এমনভাবে বলা হয়েছে যেন সেই ছাত্রের ঘুষিই হুডিনিকে মেরে ফেলেছিল। কিন্তু ঘটনাটা এতটা নিশ্চিত নয়। অ্যাপেন্ডিক্স আগে থেকেই ইনফেক্টেড ছিল কি না, আঘাতটি কতটা ভূমিকা রেখেছিল, এসব নিয়ে ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিষয়ক বিতর্ক আছে। তাই এক ঘুষিতে হুডিনির মৃত্যুকে নিশ্চিত সত্য বলা ঠিক হবে না।
তবু তর মৃত্যুর গল্পে একটা অদ্ভুত আয়রনি থেকে যায়।
সারা জীবন হুডিনি মানুষকে দেখিয়েছেন, কোনো বন্ধনই শেষ নয়। হাতকড়া খুলে ফেলা যায়, তালা ভাঙা যায়, পানির নিচ থেকেও ফিরে আসা যায়। জেলখানার দরজা, দড়ি, শিকল- সবকিছুরই কোথাও না কোথাও একটা ফাঁক আছে।
শুধু একটাই বন্ধন থেকে তিনি আর বেরোতে পারেননি।
মৃত্যু।
তথ্যসূত্র: লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক




পাঠকের মন্তব্য