গত ১৭ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাখাত সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছে আওয়ামী লীগ - হাসিনাকে এই দায় দিয়ে দেওয়া অনেক সোজা। কিন্তু তাতে কালচারাল সত্যটা আড়াল করা যায় না।
বাংলাদেশে (ঢাকায় বলি নাই, বলেছি বাংলাদেশে) প্রকৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয় ২০০০ সালের আশপাশে। গ্রামে গ্রামে কারেন্ট আসে। হাতে হাতে ফোন আসতে শুরু করে। মেশিনে ধান মাড়াই শুরু হয়। ১৪ পুরুষ ধরে যে বাজারে লোকে হেঁটে যাইতো, সে বাজারে যাইতে রিকশা ভাড়া করা শুরু হয়।
এই উন্নয়নের জন্য হাসিনা বা খালেদা দায়ী না। দায়ী মূলত মুক্তিযুদ্ধ। যার ফলাফল প্রকাশ পাইতে ৩০ বছর লেগে গেছিল। এর পাশাপাশি দায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এইড কালচার। দায়ী আবেদ, ইউনূস, জাফরুল্লাহ, নাভানার জহির সাহেব প্রমুখ।
যাই হোক, গত ১০০০ বছরে মানুষের উন্নয়ন ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে ঘটে নাই। ঠাস করে ঘটেছে। ১৯৭০ সালের আলেমন আর ১৪৭০ সালের জেলেমনের জীবনের মধ্যে পার্থক্য খুব অল্প। দুজনই স্বামীর হাতে কিল খেয়ে সন্ধ্যায় দাওয়ায় প্রদীপ দিতেন।
তাদের জীবন প্রথমবারের মতো ঠাস করে পালটে যায় ৯০-২০০০-এর দিকে। ফলে মানসিকতারও একটা মুক্তি ঘটে। ঘোষের ছেলে ঘোষ আর শীলের ছেলে শীল হবে - এই ভাবতে অভ্যস্ত হাতিবান্ধা গ্রামের মাজেদা বেওয়া যখন দেখে তার জীবনটা এসবের মধ্যেই লিমিটেড না, এখন সে সরাসরি সৌদি আরবে রিয়েল টাইম ফোন কল দিতে পারে; তখন তার স্বপ্নের সীমা-পরিসীমা থাকে না। এইবার আর শীলের ছেলে শীল হবে না। ডাইরেক্ট বিসিএস ক্যাডার হবে।
এই ফেনোমেনার বহু অনুসিদ্ধান্ত (যেমন ডেসটিনি, যুবক, ভিওআইপি ইত্যাদি)-এর মাত্র একটা হিসেবে শুরু হয় সারা বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুল। শুরু হয় জেনারেশন এক্সের সন্তান নিয়ে চোখভরা স্বপ্ন, বুকভরা আশা - আমার ছেলেই আমার জেনারেশনাল গরিবির সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিবে।
শুরু হয় - মেরা বেটা বড়া হোকার কালেক্টর বানেগা।
এই নব্য মধ্যবিত্তের পিঠে তখন ডানা। চোখে সীমাহীন স্বপ্ন। তার জেনারেশনাল লাইফস্টাইলের সুতা কেটে গেছে। এখন সে আর কোনো কিছুতে সেকেন্ড হবে না। তার সবকিছুতে ফার্স্ট হওয়া চাই। আর সবাইকে ফার্স্ট বানানোর সুযোগ দিতেই এসেছিল বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন।
অলিতে গলিতে স্কুল, ছাদে, সিঁড়ির তলে, গাছের তলে স্কুল। সবগুলোর নাম ইংরেজি। পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান তাদের নিজের শরীরের সমান ভারী ব্যাগ নিয়ে টাই পরে, শার্ট পরে অন্ধকার সব ক্লাসরুমে যাচ্ছে আর ফার্স্ট হচ্ছে। (এই পিচ্চিগুলা পরে বড় হয়ে জেনজি হবে।)
১৪ জনের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া সুইট্টির মায়ের জগৎটা ১৪ জনকেন্দ্রিক।
তার তখনও ধারণা ছিল না পৃথিবীটা কত বড়। তার মেয়ে সুইট্টি ১৪ জনের মধ্যে ফার্স্ট বলে সে ধরে নেয়, তার মেয়ে সব জায়গাতেই ফার্স্ট হওয়া ডিজার্ভ করে। না হইলে সেটা তার মধ্যবিত্ত ইগোর জন্য অনেক বড় কলঙ্ক। বিশাল বড় জিল্লতি।
কিন্তু জিল্লতি তো সুইট্টির মায়ের প্রাপ্য ছিলই।
কারণ কিন্ডারগার্টেন ১৪ জনের হলেও থানা ১৪ জনের না। থানায় অনেক ছাত্র। তার মেয়ে থানায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় না। তার মেয়ে থানায় ফার্স্ট হয় না। তার মেয়ে ক্লাস সিক্স, সেভেন, এইটে মহল্লার বড় স্কুলে গিয়ে ৬ শাখায় ৩০০ জনের সঙ্গে কম্পিট করে পারে না। এতে মধ্যবিত্ত সমাজে চাপা ক্ষোভ জমে। কারণ সুইট্টি তো একা না।
সব তো টয় স্টোরির বাজ লাইটইয়ার।
সরকার আসলে কোনো এলিয়েন বস্তু না। সরকার হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। জনগণ চাইসে শেখ হাসিনা ১৭ বছর থাকুক। সে থাকসে। জনগণ যখন চায় নাই সে থাকুক, হাসিনা থাকতে পারে নাই। সিম্পল অ্যাজ দ্যাট।
তো এই জনগণের ফার্স্ট হওয়া নিয়ে চাপা হতাশা, আশা-আকাঙ্ক্ষা কি মাউশি পর্যন্ত যায় নাই?
আলবৎ গেছে।
জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাইতে ও জনগণকে খুশি করতেই লীগ সরকার পাসের হার এবং জিপিএর হার বাড়াইছে।
এমন না যে শিক্ষাখাত নিয়ে তার নিজের দূরভিসন্ধিমূলক কোনো পরিকল্পনা ছিল। শুধু জনগণের চাহিদা নিরূপণ করতে, ভোট রক্ষা করতে এবং সর্বোপরি সুইট্টির মায়েদের ডিপ্রেশন থেকে রক্ষাবিধান করতে সরকার তার সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্থাৎ জিপিএ-৫ সবাইকে দিতে শুরু করে।
ছেলে কান্দে - নাও জিপিএ ফাইভ।
ছাওয়াল কান্দে - নাও জিপিএ ফাইভ।
বাসার কুত্তাটা কান্দে - তারেও দাও জিপিএ ফাইভ।
এই গল্পের সকলেই নায়ক। কেউ সাইড ক্যারেক্টার হতে রাজি না।
এই জেনজি আকাশভরা তারা দেখতে পায় ২০২২-২৩-২৪ সালে। কারণ পিএসসি আর জেএসসি সার্টিফিকেট দিয়ে প্লেন উড়াইলেও সমস্যা নেই। সমস্যা হলো চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। অতঃপর জিপিএ ফাইভরা এবার শেখ হাসিনাকে ফেলে দেয়।
এখন কথা হলো - গল্প কি এখানেই শেষ? সুইট্টির মায়েরা কি মরে গেছে?
মরে নাই।
সুইট্টির এখন একটা ছোট ভাই আছে। সুইট্টি চাকরি না পাওয়ার পর, সুইট্টিকে বিয়ে দেওয়ার পর, এই ফ্যামিলিতে সুইট্টির মায়ের প্রিয় পুত্র এখন সেই ছোট ভাই।
সেই এখন জেনারেশনাল গরিবি থেকে এই বংশকে উদ্ধার করবে।
অর্থাৎ, সমাজে এখনও জিপিএ ফাইভ নামক একটা আনইউজুয়াল বিষয় নিয়ে ফেটিশ কাটে নাই। এইচএসসি পাস করাটা এখনও সম্পূর্ণরূপে যথেষ্ট না। এখনও এই দেশে একটা ছেলে নাচতে নাচতে চিৎকার করে বলে না, আম্মা, আমি পাস করছি!
তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তার জন্য শেখ হাসিনা-পরবর্তী সরকারগুলোর ধন্যবাদ প্রাপ্য।
তো জিপিএ ফাইভ ফেটিশের মৃতমান লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আমি পাস করা ছেলেমেয়েদের একটা সুসংবাদ দিতে চাই।
দেখো, দেশে যে পরিমাণ পোলাপানের HSC পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তাদের ৩৬% ফর্ম ফিলাপই করে নাই। তারা জানতো, তারা পাস করতে পারবে না।
যারা ফর্ম ফিলাপ করেছে, তাদের ৪৮% পাস করতে পারে নাই। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৩৩% মাত্র পাস করে বের হয়েছে। বাকি ৭০% বাদ।
এর মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিটিশনে ৭০% ছেলেমেয়ে বাদ গেছে। বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট পর্যন্ত খালি থাকবে। সুতরাং, তোমাদের মতো সুযোগ গত ১০-১৫ বছরে কোনো ব্যাচ পেয়েছে কি না, মনে পড়ে না। সুতরাং সেলিব্রেট কর।



পাঠকের মন্তব্য