গেমিং যখন হোয়াইট হাউজের প্রোপান্ডার হাতিয়ার

৩০ পঠিত ... ২২ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে

হোয়াইট হাউজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট সম্প্রতি Arcade.gov নামের একটি গেমিং ওয়েবসাইট পাবলিশ করেছে। এখানে এখনও পর্যন্ত পাবলিশ হয়েছে ৫টি মিনি গেম। সবই বিশ্বখ্যাত গেমগুলোর আদলে তৈরি। তবে বলা যায়, এগুলো বিশ্বখ্যাত গেমগুলোর ট্রাম্পীয় ভার্সন। গেমগুলো রিলিজের পর থেকেই নানারকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কারণ, এই গেমগুলো আসলে শুধুই গেম নয়, বরং ট্রাম্পের যত বিতর্কিত নীতি, সেগুলোকেই গেমিফিকেশনের মাধ্যমে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন খুব সূক্ষ্মভাবে এই বিতর্কিত বিষয়গুলোকে হাস্যরস আর গেমিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত করার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে।

সরকারিভাবে নানা বিতর্কিত বিষয়কে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নেয়। তবে সেগুলো সাধারণত খুবই রাখঢাক করে, সাবধানে। যেন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে সরকার পক্ষ থেকে, তা কোনোভাবেই প্রমাণ করা না যায়। অনেকটা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’... কিন্তু ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ প্রশাসন এক্ষেত্রে বেশ ব্যতিক্রমী উদ্যোগই নিয়েছে, দেখা যায়। তারা সরাসরি তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেই এই গেমগুলো রিলিজ করেছে। গেমগুলো কেমন?

ফ্ল্যাপি বিল (Flappy Bill)

প্রথমে আছে ফ্ল্যাপি বিল। বুঝতেই পারছেন, এক সময়ের বিপুল জনপ্রিয় মোবাইল গেম Flappy Bird-এর একটি সরাসরি রাজনৈতিক সংস্করণ হলো এই গেমটি। এখানে শুধু একটি পাখির বদলে ওড়ানো হয় একটি টাক ঈগলের পায়ে ধরা একটি ফাইল, যেটি আসলে কোনো সরকারি আইনি নথি বা বিল। আর এর পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন ক্যাপিটল হিল। খেলোয়াড়কে পর্দায় বারবার ট্যাপ করে বিলটিকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে হয় এবং ক্যাপিটলের ভেতরের নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা এড়িয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। মূলত মার্কিন আইনসভায় বিল পাসের জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং ক্যাপিটল হিলের রাজনীতিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরতেই এই গেমটি তৈরি।

বিল্ড দ্য ওয়াল: জম্বি বর্ডার সিজ (Build the Wall: Zombie Border Siege)

এরপর আছে বিল্ড দ্য ওয়াল: জম্বি বর্ডার সিজ। ক্ল্যাসিক Tetris এবং টাওয়ার ডিফেন্স গেম মিলিয়ে তৈরি এই গেমটির পটভূমি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত। গেম চলাকালীন ডান দিক থেকে সবুজ রঙের ভিনগ্রহী বা ‘এলিয়েন’ সীমানার দিকে ধেয়ে আসতে দেখা যায়। খেলোয়াড়ের কাজ হলো উপর থেকে পড়তে থাকা টেট্রিস ব্লকগুলো সঠিকভাবে সাজিয়ে একটি শক্ত দেয়াল তৈরি করা, যাতে কোনো এলিয়েন ভেতরে ঢুকতে না পারে। সীমান্ত অভিবাসীদের ‘বহিরাগত শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে এখানে গেমিফাইড করা হয়েছে।

রিও রান (Rio Run)

তিন নম্বর গেমটি হলো রিও রান। এটি মূলত বিশ্বখ্যাত আর্কেড গেম Snake-এর একটি রাজনৈতিক সংস্করণ। গেমটিতে খেলোয়াড়কে একজন স্যুট-টাই পরা সরকারি কর্মকর্তার ভূমিকা দেওয়া হয়, যাকে সীমান্তসংলগ্ন নদীর পাড় ধরে টহল দিতে হয়। গেমের মূল উদ্দেশ্য হলো সীমান্ত পার হওয়া মানুষদের ধরে ফেলা। প্রতিবার কোনো মানুষকে ধরার সঙ্গে সঙ্গে সে কমলা রঙের কয়েদির জাম্পস্যুট পরা অবস্থায় প্রধান চরিত্রের পেছনে শিকলের মতো যুক্ত হতে থাকে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বহুল আলোচিত ম্যাস ডিপোর্টেশন নীতিকে তুলে ধরে। খেলা শেষে খেলোয়াড় ঠিক কতজন মানুষকে বহিষ্কার করতে পেরেছেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা স্ক্রিনে ভেসে ওঠে।

সাপ্লাই লাইন (Supply Line)

এরপরের গেমটি হলো সাপ্লাই লাইন। এটি একটি ফাস্ট-পেসড আর্কেড অ্যাকশন গেম, যা তৈরি করা হয়েছে একটি অ্যাসেম্বলি লাইনের আদলে। গেমটিতে একটি সরকারি স্কুলের দুপুরের খাবার প্রসেসিং কনভেয়ার বেল্ট দেখা যায়, যেখান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার যেতে থাকে। খেলোয়াড়ের দায়িত্ব হলো ক্ষতিকর বা অস্বাস্থ্যকর খাবার, যেমন প্রসেসড ফাস্টফুড বা এনার্জি ড্রিংকস, এগুলোকে ঘুষি মেরে বেল্ট থেকে ফেলে দেওয়া। কেবল তাজা শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবারকে এগিয়ে যেতে দেওয়া। সরকারি স্কুলে শিশুদের খাবারের মান উন্নয়ন আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার নীতিকে এই গেমের মাধ্যমে হাইলাইট করা হয়েছে।

ট্রাম্প সেভিংস টাইকুন (Trump Savings Tycoon)

সবশেষে আছে ট্রাম্প সেভিংস টাইকুন। আকাশ থেকে পড়া বস্তু কুড়ানোর এই গেমটির ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যায় ওয়াশিংটন ডিসির স্কাইলাইন এবং ইউএস ক্যাপিটলের ওপর বসানো একটি বিশাল কনস্ট্রাকশন ক্রেন। গেমের মধ্যে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে থাকে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি বা মেমকয়েন এবং ডলারের ব্যাংকনোট। খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্য হলো সময় শেষ হওয়ার আগেই এসব কয়েন ও নোট কুড়িয়ে শিশুদের জন্য তৈরি ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’ পূর্ণ করা। ট্রাম্প সরকারের চাইল্ড সেভিংস স্কিম এবং ক্রিপ্টো-বান্ধব আর্থিক নীতিকে প্রচার করতেই এই গেমটি তৈরি করা হয়েছে।

সাইটের ডিজাইন দেখে বোঝা যাচ্ছে, আরও গেম আসতে চলেছে। তবে এই সাইট প্রকাশের পরপরই নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প ভক্তদের গেমগুলো ভালো লাগলেও বেশ ভালো ক্রিটিসিজম হচ্ছে। বিশেষত, এই গেমগুলোর মেইন ভার্সনগুলোর কোম্পানিগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্লেস্টেশন ২, এক্সবক্স ৩৬০ এবং নিনটেনডো গেমকিউব-এর কনসোল স্টার্টআপ অ্যানিমেশনের প্যারোডি ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এই সাইটের প্রচার চালানো হয়েছে। এছাড়া সেগা (Sega)-র বিখ্যাত লোগোটি এডিট করে লেখা হয়েছে MAGA। তবে এসব কোম্পানির প্রতিবাদে ট্রাম্প প্রশাসন একেবারেই দমেছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের কাণ্ডকীর্তি থেকে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তা কেবল তাদের প্রচার আরও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে এবং যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য হাজারো গুরুতর সমস্যা থেকে নজর অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

পপ-কালচার এবং গেমিং ইন্ডাস্ট্রিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই ট্রেন্ড অবশ্য একেবারেই নতুন নয়। তবে একটি দেশের অফিসিয়াল রাষ্ট্রীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে এভাবে পপ-কালচারের আইকনিক এলিমেন্টগুলোকে স্যাটায়ার বা প্যারোডির নামে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে এক নতুন মাত্রার সূচনা করল। গেমিং ওয়ার্ল্ড যেখানে বিনোদন আর মুক্ত কল্পনার জায়গা, সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের এমন সরাসরি প্রবেশ নিয়ে সচেতন মহলে বিতর্ক চলবেই।

আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও প্রযুক্তিবোদ্ধাদের মতে, Arcade.gov কেবল কয়েকটি সাধারণ মিনি-গেমের সমাহার নয়, এটি আধুনিক ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা এবং গেমিফিকেশনের (Gamification) একটি বড় উদাহরণ। নস্টালজিয়াকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং একই সঙ্গে নিজেদের বিতর্কিত নীতিগুলোকে হালকা ও হাস্যরসাত্মকভাবে পরিবেশন করাই যেন ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের আসল চাবিকাঠি।

তথ্যসূত্র: Arcade.gov এবং IGN

৩০ পঠিত ... ২২ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top