এপস্টিনের দ্বীপে যা হয়েছিল, সাভারের মাদ্রাসাতেও কি তাই ঘটেছে?

৪৯৩ পঠিত ... ১৯ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে

 

শ্রাবণ মাসের শেষে সাভারের আকাশটা বড্ড বিশ্রী রকম থমথমে হয়ে থাকে। পূর্ব শাহীবাগের গলিগুলোতে বৃষ্টির কাদা আর নোংরা পানি জমে একাকার। সেই কাদা পেরিয়ে সকালবেলা হেঁটে যাচ্ছিল সাত বছরের এক বালক, নাম তার রিফাত (ছোট মানুষদের আসল নামটা আড়ালেই থাক, পেপারের পাতায় নাম উঠলে নাকি ওদের আয়ু কমে যায়। রিফাতের পরনে হালকা নীল রঙের একটা জামা, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। স্যান্ডেলের পেছনে কাদা ছিটকে তার প্যান্টের পেছনের অংশ ভিজে গেছে।

রিফাতের হাত ধরে হাঁটছিলেন তার বাবা। পরনে ইস্ত্রি ছাড়া শার্ট আর সস্তা সুতির প্যান্ট, হাতে একটা প্লাস্টিকের ছোট ব্যাগ। ব্যাগটার ভেতরে রিফাতের একটা বাড়তি জামা, দাঁতের মাজন আর একখানা নতুন কায়দা।

বাবা চাকরি করেন সাভারের একটা পোশাক কারখানায়। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গায়ের ঘাম ঝরিয়ে ওভারটাইম খেটে যা পান, তা দিয়ে সংসার চালানোই দায়। তবুও ছেলের কথা ভেবে চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। সমাজে মানুষ হতে হলে শিক্ষা দরকার, আর নীতি-নৈতিকতা শিখতে হলে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া চাই। এই একটা সরল বিশ্বাস নিয়ে তিনি ছেলেকে নিয়ে এসেছেন মারকাজুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায়।

মাদ্রাসার লোহার গেটটা পার হতেই একধরনের ঠান্ডা সোঁদা গন্ধ নাকে আসে। সুগন্ধি আতর, ভেজা ফ্লোর আর পুরোনো বইয়ের পাতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। লম্বা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেল, ছোপ ছোপ টুপি মাথায় দিয়ে ১০-১২ বছরের কিছু ছেলে গোল হয়ে বসে সুর করে কোরআন তেলাওয়াত করছে। বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন বড় হুজুর, মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া বিন কাসেম। গাঢ় রঙের জুব্বা, মুখে সফেদ দাড়ি।

জিয়া সাহেব পরম স্নেহে রিফাতের মাথায় হাত বুলালেন। মিষ্টি হেসে বললেন, কোনো চিন্তা করবেন না। ছেলে আমাদের আমানত। এখানে আল্লাহর কালাম শিখবে, আদব-কায়দা শিখবে।

রিফাতের বাবা স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের একমাত্র কলিজার টুকরোকে এই পবিত্র পরিবেশে রেখে নিশ্চিন্ত মনে কারখানার দিকে পা বাড়ালেন।

দিনটা ছিল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক। কিন্তু সেই শান্ত, সুশোভিত চার দেয়ালের পেছনে যে কতটা আদিম আর বীভৎস অন্ধকার ওঁৎ পেতে বসে ছিল, তা বোঝার ক্ষমতা সাত বছরের রিফাতের বা তার দিনমজুর বাবার ছিল না।

মাদ্রাসার নিয়মকানুনের ভেতরে রিফাত নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ভোরবেলা ফজরের আজানের আগে ঘুম থেকে ওঠা, সারাদিন মক্তব বিভাগে ক্বারী রফিকুল ইসলামের কাছে বসে পড়া, আর রাতে এশার নামাজের পর হাত-মুখ ধুয়ে ঘুমাতে যাওয়া। সপ্তাহের শুক্রবার দিন শুধু বাবা এসে তাকে আধঘণ্টার জন্য দেখে যেতেন, দু-একবার বাড়িও নিয়ে যেতেন।

ভর্তির পর দেখতে দেখতে ২০-২১ দিন কেটে গেল। দিনটা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি, তখন সবেমাত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে, তৃতীয় রোজা।

সন্ধ্যার দিকে আকাশটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। বারান্দার বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছিল। রিফাত বাথরুমে গিয়েছিল হাত-মুখ ধুতে। ঢালাই করা ছোট, অন্ধকার টাইপের টয়লেট। ভেতরে হালকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

ঠিক সেই মুহূর্তেই টয়লেটের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ২০ বছর বয়সী এক বড় ছাত্র। দরজার খিলটা সশব্দে আটকে গেল।

সাত বছরের রিফাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক দানবীয় শক্তির মুখোমুখি হলো। ছোট শরীরটা ভয়ে বরফ হয়ে গেল। তীব্র ব্যথায় রিফাত যখন কঁকিয়ে উঠে চিৎকার দিতে চাইল, তখন একটা শক্ত বিশালাকার হাত তার মুখটা চেপে ধরল। চেপে ধরে ফিসফিস করে কানে বলা হলো, একটুও শব্দ করবি না। কাউকে যদি এক বর্ণ বলিস, গলা টিপে মেরে ফেলব

সেই একুশে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় টয়লেটের নোংরা মেঝেশয্যায় সাত বছরের একটা শিশুর পৃথিবীর আলো-বাতাস, শৈশব আর বিশ্বাস; সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।

পাপের একটা অদ্ভুত ধর্ম আছে। একটা অন্যায় যখন বন্ধ দরজার পেছনে ঢাকা পড়ে যায়, তখন আরও দশটা অন্যায়ের পথ খুলে যায়।

মাদ্রাসার কয়েকজন সহপাঠী আর বয়সে একটু বড় ছাত্ররা কেমন করে যেন ব্যাপারটা টের পেয়ে গেল। তারা রিফাতকে বাঁচানো বা বড়দের জানানো দূরের কথা, ওই ছোট শিশুটাকেই নিজেদের ভোগের শিকার বানাতে শুরু করল। ঘটনার পাঁচ দিন পর আরেক শিক্ষার্থী তাকে ধরে নিয়ে গেল। তারপর আরেকজন।

অসহ্য শারীরিক কষ্ট আর মানসিক ট্রমা নিয়ে রিফাত ভেবেছিল, যারা তাকে নীতি-শিক্ষা দেন, সেই শিক্ষকদের কাছে গেলে হয়তো সে রেহাই পাবে।

একদিন সুযোগ বুঝে সে কেঁদে কেঁদে মক্তব বিভাগের প্রধান ক্বারী রফিকুল ইসলামের কাছে গেল। ক্বারী সাহেবের ভারিক্কি চেহারা। রিফাত ফুপিয়ে ফুপিয়ে নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের কথা বলতে শুরু করল। সে ভেবেছিল, হুজুর তাকে কোলে তুলে নেবেন, ওই পাপাচারীদের কঠিন শাস্তি দেবেন।

কিন্তু ক্বারী রফিকুল ইসলাম যা করলেন, তা কোনো পশুর কল্পনাকেও হার মানায়। তিনি ছোট শিশুটিকে আগলে রাখা তো দূরের কথা, ঘটনার কথা শুনে নিজের ভেতরের সুপ্ত পশুটাকে জাগিয়ে তুললেন। তিনি সুযোগটা লুফে নিলেন। একে একে সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন, হাফেজ সাব্বির, হাফেজ কামরুজ্জামান; যাদের কাছে রিফাত বিচারের আশায় গিয়েছিল, তারা সবাই শিশুটির ওপর নিজেদের পাশবিক অত্যাচার চালাল।

কাউকে বললে তোকে মেরে লাশ গুম করে দেব, এই এক হুমকিতে স্তব্ধ হয়ে রইল সাত বছরের একটা শিশু।

ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই। টানা প্রায় পাঁচ-ছয়টি মাস।

সাভারের সেই অন্ধকার ঘরগুলোতে দিনের পর দিন একটা ছোট শিশুর ওপর চলতে লাগল নারকীয় তাণ্ডব। মোট দশজন—শিক্ষক, হাফেজ আর সহপাঠী মিলে শিশুটির দেহ আর মনকে পুরোপুরি তছনছ করে দিল। জুলাইয়ের ৬ তারিখ পর্যন্ত চলল এই পৈশাচিক অধ্যায়।

জুলাইয়ের গোড়ার দিকে রিফাত যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ল, শরীর আর বইতে পারছিল না, তখন এক শিক্ষার্থী তাকে মারধরও করে। পুরো মাদ্রাসায় ততদিনে বিষয়টা ছড়াছড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।

আগস্টের ১২ তারিখ। রিফাত যখন বাড়ি এলো, সে আর আগের সেই হাসিখুশি রিফাত নেই। সে কারো সাথে কথা বলে না। খাবার দিলে প্লেট ঠেলে সরিয়ে দেয়। ঘরের এক কোণে হাঁটুর ভেতর মুখ গুঁজে বসে থাকে। আর মাঝরাতে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, ওদেরকে আসতে দিও না! আমাকে মেরো না!

মা আঁতকে উঠলেন। বুকের ভেতর টেনে নিয়ে বললেন, কী হয়েছে সোনা? বাবা বল আমাকে, কী হয়েছে তোর?

১৪ আগস্ট রাতে, মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সাত বছরের রিফাত একে একে বলে গেল সেই নরকযন্ত্রণার কাহিনি। তার ছোট ছোট কথাগুলো যখন মায়ের কানে পৌঁছাচ্ছিল, মায়ের মনে হচ্ছিল চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তার মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে।

১৫ আগস্ট রাতে রিফাতের বাবা সোজা গিয়ে হাজির হলেন মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া বিন কাসেমের কাছে।

জিয়া সাহেব সব শুনলেন। কিন্তু তার চোখে-মুখে কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা দেখা গেল না। তিনি খুব ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আপনি পুলিশ বা সাংবাদিকের কাছে যাবেন না। ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার দরকার নেই। আমি নিজে অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দেব। মাদ্রাসার বদনাম কইরেন না

কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। পরিচালক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো রিফাতের বাবাকে ডেকে হুমকি দিলেন, মুখ বন্ধ রাখতে হবে।

রিফাতের শারীরিক অবস্থা ততদিনে আশঙ্কাজনক। মলদ্বারে মারাত্মক ক্ষত, তীব্র সংক্রমণ আর অনবরত রক্তপাত। ১৮ আগস্ট তাকে নেওয়া হলো সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। চিকিৎসকেরা অবস্থা দেখে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে রেফার করলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।

সেখানে চারটা দিন একটা সাড়ে সাত বছরের শিশু যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। আর তার দরজি বাবা হাসপাতালের বেডের পাশে বসে চোখের জল ফেলেছেন।

২৩ আগস্ট ২০২৬।

ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ালেন সেই ধুলোমাখা পোশাক শ্রমিক বাবা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি ১০ জন আসামির নাম উল্লেখ করে দরখাস্ত দিলেন, যার মধ্যে ১০ নম্বর আসামি স্বয়ং পরিচালক জিয়া বিন কাসেম।

আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় মামলা রুজু হলো। ২৬-২৭ আগস্ট মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করা হলো। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা সুলতানা সুইটির খাসকামরায় বসে সাত বছরের শিশুটি তার জীবনের সেই ভয়াবহ জবানবন্দি দিল।

কিন্তু ততক্ষণে আসামিরা সব একে একে চম্পট দিয়েছে। সাভার মডেল থানার এসআই সামরুল হোসেন খাতাপত্র বগলে নিয়ে বললেন, তদন্ত চলছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে

পরিচালক জিয়া বিন কাসেম কিছুদিন পর ফিলিপাইন থেকে ঘুরে এসে গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে শান্ত মুখে বললেন, আমি তো তাবলিগে ফিলিপিন্স ছিলাম। এসে শুনেছি। ওরা ছোট ছোট বাচ্চা, নিজেরা নিজেরা এগুলো করে। মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত হতে পারে

এক সাত বছরের শিশুর ক্ষতবিক্ষত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে এক বিদগ্ধ পরিচালকের এই ঠাণ্ডা মাথার যুক্তি; পুরো সমাজব্যবস্থার মুখে এক সশব্দ চড় মারার মতো শোনালো।

আদালতের নথিতে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ লেখা হলো। কিন্তু সাভারের সেই টিনের ঘরের ভেতর রাত কাটানো শিশুটির শৈশব, তার সরল হাসি আর মানুষের ওপর বিশ্বাস; সবকিছু ততদিনে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

সাত বছরের রিফাতের জীবনের সেই ক্ষতবিক্ষত পৃষ্ঠাগুলো যখন সাভার মডেল থানার ফাইলের নিচে চাপা পড়তে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই হাজার মাইল দূরে, সাতসমুদ্র তেরো নদীর ওপারে হঠাৎ এক মৃত মানুষের জমানো পাপাচারের কফিনের ঢাকনা খুলে গেল।

মানুষটির নাম জেফ্রি এপস্টিন।

এপস্টিন লোকটা বেঁচে থাকতে পৃথিবীর বুকে এক অসীম ক্ষমতার মহীরূহ ছিলেন। নিজের নামে একটা আস্ত ব্যক্তিগত দ্বীপ ছিল ক্যারিবীয় সাগরে; লিটল সেন্ট জেমস। সেই দ্বীপে ছিল ধবধবে সাদা রাজপ্রাসাদ, ব্যক্তিগত বিমান, আর অগাধ টাকার গরম। কিন্তু সেই চোখধাঁধানো জাঁকজমকের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বীভৎস, আদিম অন্ধকার।

এপস্টিন ছোট ছোট শিশুদের, বিশেষ করে নাবালিকা মেয়েদের ফুসলিয়ে বা অভাবের সুযোগ নিয়ে নিজের দ্বীপে নিয়ে যেতেন। তারপর নিজের ও তার ক্ষমতার শীর্ষে থাকা বন্ধুদের কাছে উপহার হিসেবে তুলে দিতেন।

২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের এক অন্ধকার জেলখানায় এপস্টিন আত্মহত্যা করেন। অনেকে ভেবেছিল, লোকটা মরার সাথে সাথে তার নোংরা গোপন পাপগুলোও মাটির নিচে তলিয়ে গেল। কিন্তু কাগজের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মানুষ মরে ছাই হয়ে যায়, কিন্তু কাগজের লেখা মরে না।

২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬-এর এই শুরু পর্যন্ত, মার্কিন প্রশাসনের পেটের ভেতর থেকে হুড়মুড় করে বের হয়ে আসতে শুরু করল এপস্টিন ফাইলস। প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথিপত্র, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি আর হাজার হাজার ভিডিও।

হঠাৎ করে দুনিয়াজুড়ে যেন তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়ে গেল।

বিকেলের শান্ত রোদে আমাদের দেশের চা-দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা মানুষগুলো পর্যন্ত চায়ের কাপে তুফান তুলল। টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল করতে লাগল।

দেখেছেন ভাই, ট্রাম্পের নাম নাকি ফাইলে ৩৮ হাজার বার এসেছে!

আরে ধুর, ট্রাম্প নাকি ফ্লাইটে ৯ বার উঠেছে, তবে দ্বীপে নাকি যায়নি!

বিল ক্লিনটন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু; কেউ বাদ নেই হে! দুনিয়াটা পাপে একদম শেষ হয়ে গেল!

সংবাদপত্রের আন্তর্জাতিক পাতায় চার কলামের বড় ছবি ছাপা হলো। অ্যাপলের সিইও থেকে শুরু করে নামীদামী বিজ্ঞানী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে ইউরোপীয় রাজপরিবার; কার নাম এপস্টিনের খাতায় আছে আর কার নাম মুছে ফেলা হলো, তা নিয়ে চায়ের টেবিল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সব জায়গায় তোলপাড়। মানুষ এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ নিয়ে সেই খবরগুলো গিলতে লাগল।

কিন্তু সেই উত্তপ্ত আড্ডায়, এপস্টিন ফাইল নিয়ে হাজারটা বিশ্লেষণের ভীড়ে, কেউ সাভারের সেই সাত বছরের পোশাক শ্রমিকের ছেলেটার কথা একবারের জন্যও মনে রাখল না।

অথচ ভেবে দেখুন, এপস্টিনের সেই ক্যারিবীয় দ্বীপের বিলাসবহুল ঘর আর সাভারের পূর্ব শাহীবাগের মারকাজুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের মধ্যে দূরত্বের ফারাকটা কতটুকু? হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব হতে পারে, কিন্তু দুটি জায়গাতেই অন্যায়ের রূপ আর পশুর চরিত্রটা হুবহু একই।

পার্থক্য শুধু এক জায়গায়; শিকার ও শিকারির সামাজিক পরিচয়ে।

এপস্টিনের দ্বীপে যারা নির্যাতিত হয়েছিল, তাদের হয়ে কথা বলার জন্য কোটি কোটি ডলারের আইনজীবী ছিল, পুরো পৃথিবীর হাজারটা ক্যামেরা ২৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। আর সাভারের সেই সাত বছরের শিশুটির বিচার চাওয়ার জন্য আছে কেবল তার ছেঁড়া স্যান্ডেল পরা, গায়ের ঘামে ভেজা এক পোশাক শ্রমিক বাবা। যিনি সাভার থেকে ঢাকার ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় কাদা মেখে হেঁটে বেড়ান, আর ধুলোবালিমাখা শার্টের হাতায় চোখের পানি মোছেন।

মানুষ দূরের পাপ দেখতে খুব ভালোবাসে। কারণ দূরের পাপ নিয়ে কথা বললে নিজের ঘাড়ে কোনো দায়িত্ব আসে না, নিজের কোনো অপরাধবোধ থাকে না। কিন্তু ঘরের পাশে, নিজের চেনা গলিতে যখন একই পৈশাচিক অন্যায় ঘটে, আমরা তখন সুবিধাজনকভাবে অন্ধ আর বধির হয়ে যাই।

সাভারের মামলার ১০ নম্বর আসামি, মাদ্রাসার মুহতামিম জিয়া বিন কাসেম ফিলিপাইন থেকে ঘুরে এসে বড় বড় চোখ করে বলেছিলেন,ওরা ছোট ছোট বাচ্চা, নিজেরা নিজেরা এগুলো করে

আহা! কী নির্মল অসংকোচ উপস্থাপন! ক্ষমতার কী নিপুণ অহংকার! এপস্টিন লোকটা বেঁচে থাকলেও হয়তো কোর্টের সমন দেখে এমন একটা অমায়িক হাসি দিয়ে বলতেন, আহা, ওরা তো ছোট ছোট মেয়ে, নিজেরা নিজেরা খেলাধুলা করত!

আকাশে তখন মেঘের ঘটা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি নামল বলে। কিন্তু সেই বৃষ্টির ধারায় কি সাভারের ওই টিনের ঘরের বিষাদ ধুয়ে যাবে? নাকি এপস্টিন ফাইলের চাঞ্চল্যকর সংবাদের আড়ালে হারিয়েই যাবে সাত বছরের রিফাতের বিচার পাওয়ার পথ?

পৃথিবীর আলো আর অন্ধকারের হিসাব-নিকাশটা বড্ড অদ্ভুত।

প্রতিটা বড় অন্যায়ের পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা বা ব্যবস্থার জোর কাজ করে। জেফ্রি এপস্টিন তার অঢেল অর্থ, রাজনৈতিক প্রতিপত্তি আর সামাজিক সম্মানের এমন এক মায়াজাল বুনেছিলেন, যার সামনে আইনের হাত বারবার থমকে গেছে। তার সেই দ্বীপে কী ঘটেছিল, তা আমেরিকার নীতি-নির্ধারকদের অনেকেই জানতেন, কিন্তু ক্ষমতার উত্তাপের কাছে সবাই সুবিধাজনকভাবে চোখ বুজে ছিলেন।

আর আমাদের এই সাভারের নীরব গলিটার কথা ধরা যাক। এখানে কোটি কোটি ডলারের ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু ছিল এক পরম অন্ধ বিশ্বাসের সুদৃঢ় দেয়াল।

এক একজন দরিদ্র বাবা-মা যখন তাদের সাত বছরের সন্তানকে কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের হাতে সঁপে দেন, তারা কেবল সন্তানকে পাঠায় না; নিজেদের জীবনের সমস্ত বিশ্বাস ও আস্থাকেও সেই চার দেয়ালের ভেতর জমা রাখেন। তারা নিশ্চিন্তে ধরে নেন, এই পবিত্র পরিবেশে তাদের সন্তান অন্তত নিরাপদ। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসের অন্দরেই সুযোগ নিয়ে পৈশাচিক অন্ধকার বাসা বাঁধে, তখন অপরাধের বিষাক্ততা শতগুণ বেড়ে যায়।

এপস্টিন ফাইলের হাজার হাজার পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায়, কীভাবে দশকের পর দশক ধরে বিচারকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে শক্তিশালী মিডিয়া, ক্ষমতাবান বন্ধু আর গোপন নথির মারপ্যাঁচে শোষিতের কান্না চেপে দেওয়া হয়েছিল।

সাভারের সেই মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেও হুবহু একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

সাত বছরের শিশুটি যখন পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আতঙ্কে শিহরিত হতো, তাকে ভয় দেখানো হতো। সে যখন কান্নাকাটি করে বিচারের আশায় শিক্ষকের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, সেই শিক্ষক সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো নিজের ভেতরের হিংস্র পশুকে বের করে আনলেন। আর ঘটনার কথা জেনে পরিচালক জিয়া বিন কাসেম যখন বাপদাদাকে ডেকে এনে বললেন, পুলিশে জানাবেন না, ৯৯৯-এ ফোন দেবেন না, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে. ..তখন মূলত সেই একই সত্য গোপনের কৌশল কাজ করছিল, যে কৌশলে এপস্টিনের মতো মানুষেরা বছরের পর বছর নিজেদের আড়াল করে এসেছে।

মানুষের সামাজিক মনস্তত্ত্ব বড় বিচিত্র। আমরা সাতসমুদ্র ওপারের অন্যায় দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করি, খবরের পাতায় চোখ রেখে ধিক্কার জানাই। কিন্তু চোখের সামনে, নিজের মহল্লায় যখন একই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তখন আমরা নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে চলে যাই।

কারণ, দূরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সহজ ও নিরাপদ। কিন্তু ঘরের কাছের অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে নিজের পরিচিত ব্যবস্থার কাঠামোর দিকে আঙুল তুলতে হয়, নিজের দীর্ঘদিনের অন্ধ বিশ্বাস ধাক্কা খায়।

ঢাকার আদালতে তারিখের পর তারিখ পড়ে। বিচারকের নির্দেশে সাভার মডেল থানার এসআই ফাইল বগলে নিয়ে ঘোরেন। ফাইলগুলোর ওপর নতুন নতুন সিল পড়ে। কিন্তু দিনশেষে যখন রাত নেমে আসে, তখন সাভারের সেই ছোট টিনের ঘরটায় সাত বছরের শিশুটি মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে থেকে যায়। তার কোটরে জমে থাকা ভয়টুকু মুছে দেওয়ার ক্ষমতা কোনো আইনি কাগজের থাকে না।

এপস্টিন ফাইলের রোমাঞ্চকর তথ্য নিয়ে হয়তো বিশ্বজুড়ে আরও কিছুদিন চর্চা চলবে। তারপর একদিন নতুন খবরের ভিড়ে সেই নথিপত্রেও ধুলোর আস্তরণ জমবে। কিন্তু সাভারের সেই শিশুটির মন থেকে যে শৈশবের নির্মল আলোটুকু চিরতরে মুছে গেল, তা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো আদালতের নেই, কোনো বড় খবরের শিরোনামেরও নেই।

রাতের নিস্তব্ধতায় সাভারের রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। বাতাসের আর্দ্রতায় ভেসে বেড়ায় এক করুণ প্রশ্ন, যে বিশ্বাসের আড়ালে একটি শিশুর শৈশব গুঁড়িয়ে গেল, সেই বিশ্বাসের দায়ভার আসলে কে নেবে?

রাত তখন চারটে। সাভারের ছোট টিনের ঘরের চালে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা শিশির বা অকালবৃষ্টির জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। ঘরের ভেতর গাঢ় অন্ধকার। সাত বছরের রিফাত খাটের এক কোণে সিঁটিয়ে শুয়ে আছে। সে ঘুমায়নি, তার চোখ দুটো খোলা। অন্ধকারে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে শ্বাস নেয়।

আজ রাতেও সে স্বপ্ন দেখেছে। সেই লম্বা স্যাঁতসেঁতে বারান্দা, বন্ধ টয়লেটের দরজা আর ওপর থেকে চেপে ধরা বিশালাকার দুটো হাত। সে চোখ বন্ধ করতে ভয় পায়। কারণ চোখ বন্ধ করলেই সেই চেনা মুখগুলো আবার দানব হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।

হাজার মাইল দূরের সেই ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপ আর সাভারের এই এক চিলতে টিনের ঘরের গল্পটা শেষ পর্যন্ত একই করুণ মোহনায় এসে মেশে, তার নাম লুণ্ঠিত শৈশব।

পার্থক্য কেবল পোশাকে আর পদবিতে। এপস্টিনের নথিতে যাদের নাম এসেছে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি স্যুট-টাই পরা কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক। তারা ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে ঘুরে বেড়ান, বড় বড় বিশ্বসভায় ভাষণ দেন। আর সাভারের এই গল্পে অভিযুক্তদের গায়ে সাধারণ সুতির জুব্বা, মাথায় টুপি কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়। কিন্তু কাম, পাশবিকতা আর ক্রুরতার যে নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা নেই, এই তিক্ত সত্যটা আমরা বারবার ভুলে যেতে চাই।

আমরা অপরাধীকে দেখার আগে তার পোশাক দেখি, তার সামাজিক বা ধর্মীয় অবস্থান মেপে নিই। তারপর অদৃশ্য এক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে হিসাব কষতে বসি, অপরাধী কি আমার বিশ্বাসের ঘরের মানুষ, নাকি বাইরের কেউ?

এপস্টিন ফাইলের আড়ালে যেমন বিশ্বরাজনীতি আর কোটি কোটি ডলারের অদৃশ্য দড়ি টানাটানি চলেছে, সাভারের এই ছোট শিশুটির জীবনের ক্ষেত্রেও শুরু হয়ে যায় এক নির্লজ্জ দর-কষাকষি। মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে: এমন হাজারো অজুহাতের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা চলে সাত বছরের একটা শিশুর রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত শরীর আর থরথর করে কাঁপতে থাকা মনকে।

অথচ কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বা সামাজিক সম্মানের অজুহাত একটি শিশুর সুবিচারের চেয়ে বড় হতে পারে না।

আদালতের মামলার নথিতে মেপে মেপে তারিখ লেখা থাকে, ১৩ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়, মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়। সাভার মডেল থানার খাতায় হয়তো আসামিদের নামের পাশে লাল কালিতে লেখা থাকে পলাতক। কিন্তু যারা পালিয়ে গেল, তারা তো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। তারা আমাদের এই সমাজেই রূপ বদলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো নতুন কোনো নামে, অন্য কোনো গলিতে, নতুন কোনো অবোধ শিকারের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে বসে আছে।

ভোর হওয়ার আলো ফুটতে শুরু করে। সাভারের টিনের চাল ঘেঁষে ধূসর আলো ঘরের ভেতর এসে পড়ে।

রিফাতের বাবা খাটের পাশে চুপচাপ বসে আছেন। তার হাতের তালুতে হাজারো সুতোর ঘর্ষণে জেগে ওঠা কড়া পড়া দাগ। তিনি হয়তো কোনোদিন মার্কিন বিচার বিভাগের নাম শোনেননি, এপস্টিন ফাইলের ৩০ লাখ পৃষ্ঠার রহস্যও বোঝেন না। তিনি কেবল জানেন, তার জীবনের সম্বলটুকু কেউ কেড়ে নিয়েছে। যে ছেলেকে তিনি মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সেই ছেলেটি আজ নিজের ছায়াকেও ভয় পায়।

সময় গড়ায়, নতুন নতুন খবরের চাঞ্চল্যে পুরোনো খবর ম্লান হয়। কিন্তু আদালতের ধুলোমাখা ফাইলগুলোর আড়ালে জমা হয়ে থাকা এই দুটি ঘটনা আমাদের সভ্যতার মুখে একটা প্রকাণ্ড প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়ে যায়, আমরা কি কেবল দূরের পাপ দেখে বিশ্ববিবেক জাগিয়ে রাখব, নাকি নিজের ঘরের ভেতরের অন্ধ গলিতে শোষিত হওয়া শিশুদের পাশে দাঁড়াতে শিখব?

 

৪৯৩ পঠিত ... ১৯ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top