নারীরা যে কত ‘সুবিধায়’ আছে, পুরুষ না হলে বুঝবেন না!

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

 

 

একজন পুরুষ হিসেবে সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাকে কী নির্মম সামাজিক যাতনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা কোনো নারী কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবেন না। আমাকে বাধ্য হয়ে বিছানা ছাড়তে হয়, কারণ আমাকে রোজগারে বেরোতে হবে। আর একজন নারী? কী অপার স্বাধীনতা তার! তিনি চাইলে সমস্ত জীবন ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থেকে রান্নাবান্না, বাসন মাজা, ঘর মোছা আর বাচ্চার মলমূত্র পরিষ্কার করার মতো ঈশ্বরীয় শান্তিময় কর্মে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন। পুরুষত্ব আমাকে এই গৃহস্থালি জীবনের অপূর্ব আত্মিক শান্তি থেকে বঞ্চিত করেছে।

সিমোন দ্য বোভোয়ার অনর্থক The Second Sex-এ নারীদের অন্য বা গৌণ বলে কান্নাকাটি করেছেন। আরে মশাই, ডিফল্ট মানব বা পুরুষ হওয়ার অভিশাপ যে কী, তা কি বোভোয়ার বুঝতেন? পুরুষকে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়, রোদে পুড়তে হয়, অফিসের বসের ঝাড়ি খেতে হয়। নারী তো পুরুষতান্ত্রিক কৃপায় ঘরের একঘেয়ে নিরাপদ খাঁচায় থেকে পরম মানসিক স্থিরতা অর্জনের অমূল্য সুযোগ পান!

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও পুরুষদের ওপর যে কী পরিমাণ বৈষম্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা দেখলে যে কোনো বিবেকবান মানুষের চোখে জল আসবে। তথাকথিত আধুনিক সমীক্ষাগুলো বলে, বৈশ্বিক শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ নাকি ৪৮ শতাংশের মতো, আর পুরুষদের ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ, পুরুষের ওপর শ্রমের কী নৃশংস দাসত্ব! নারীরা অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের নামে সংসারের আড়াই গুণেরও বেশি যত্নআত্তির ‘সুযোগ’ পাচ্ছেন, আর পুরুষরা বেতনের বিনিময়ে নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে দিচ্ছেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট গোলামিতে।

ভেবে দেখুন, নিজের মেধা ও ঘাম বিক্রি করে টাকা উপার্জন করার এই হীন দাসত্ব পুরুষকে বইতে হয়, অথচ নারী কত অনায়াসে কোনো বেতন ছাড়া, কেবল পরিবারের সেবা করার নাম করে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করেন! বেটি ফ্রিডান তাঁর The Feminine Mystique-এ গৃহিণী জীবনের এই শূন্যতাকে হাহাকার হিসেবে তুলে ধরেছেন; অথচ তিনি বুঝতেই পারেননি, কোনো অর্থনৈতিক পরিচয় না থাকা এবং সম্পূর্ণভাবে অন্যের দয়ার ওপর বেঁচে থাকার মধ্যে কী অপরিসীম রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে, যা থেকে পুরুষেরা চিরবঞ্চিত।

আর নিরাপত্তার কথা তো না বললেই নয়। রাতে একা রাস্তায় বের হলে নারীরা নাকি ভয় পান, তাঁদের ওপর নাকি পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের ভয় থাকে। কত বড় সুবিধা, চিন্তা করুন! ভয়ের এই মানসিক অভিজ্ঞতাই তো মানবজীবনকে রোমাঞ্চকর করে তোলে। পুরুষ রাতের রাস্তায় একা হাঁটলে তাকে কেউ ফিরেও তাকায় না; তাকে ছিনতাইকারী বা অপরাধী হওয়ার মহিমান্বিত তকমা নিয়ে নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে হয়।

আর নারী পাচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে সমাজের সতর্ক নজরদারি, ঘরে বন্দি থাকার অনুশাসন এবং সামাজিক সম্মানের নামে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচার স্বাধীনতাটুকু বিসর্জন দেওয়ার অপূর্ব নিরাপত্তা বিধান। সমাজে শিশুবিয়ে থেকে শুরু করে যৌতুকের দায়ে নির্যাতনের যে সুযোগগুলো নারীরা পান—তা পুরুষকে একটি কাঠখোট্টা, আবেগহীন সামাজিক প্রাণী বানিয়ে রাখা ছাড়া আর কী-ই বা করেছে?

পুরুষ হিসেবে জন্ম নেওয়াটা তাই এক চরম অভিশাপ। পিতৃতন্ত্র নারীকে গৃহবন্দিত্ব, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, অবৈতনিক আজীবন দাসত্ব এবং নিরাপত্তার নামে খাঁচায় পুরে রাখার যেসব বিরল ‘প্রিভিলেজ’ বা সুবিধা উপহার দিয়েছে, পুরুষ কেবল দূর থেকে তা দেখে দীর্ঘশ্বাসই ফেলে যেতে পারে।

রাজনীতির ময়দানে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পুরুষদের যেভাবে জোর করে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা দেখলে মনে হয় পুরুষজন্মটাই আসলে এক বিশাল রাষ্ট্রীয় শাস্তি। ক্ষমতা ও সিংহাসনের ধূলিধূসরিত পথ পুরুষের জন্য নির্ধারিত, অথচ নারী সুমহান নিরাসক্তিতে ক্ষমতার এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছেন।

বিশ্বব্যাপী পার্লামেন্টগুলোতে নারীদের উপস্থিতি মাত্র ২৭.৫ শতাংশের কাছাকাছি, আর বিশ্বজুড়ে মন্ত্রিসভায় তাদের উপস্থিতি প্রায় ২২.৪ শতাংশ। ভাবুন একবার, কত বড় রেহাই! পৃথিবীর প্রায় পৌনে একশো ভাগ রাজনৈতিক ঝামেলা, ক্যাডারবাজি, দুর্নীতি আর রাতের ঘুম হারাম করা আইনপ্রণেতার দায়িত্ব ঘাড় গুঁজে পালন করতে হচ্ছে পুরুষকে। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান হওয়ার মানসিক যন্ত্রণা পোহাচ্ছেন সিংহভাগ পুরুষ, অথচ বিশ্বের সিংহভাগ নারী ক্ষমতার এই কুৎসিত লড়াই থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে কী পরম শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছেন।

আইনগত অধিকারের দিক থেকেও বৈশ্বিকভাবে নারীরা পুরুষের প্রায় ৬৭ শতাংশ অধিকার ভোগ করেন। অর্থাৎ বাকি ৩৩ শতাংশ জটিল আইনি দায়দায়িত্ব, কর প্রদান আর ঝক্কি-ঝামেলা থেকে নারীরা কত অনায়াসে মুক্ত! সম্পত্তি, বিয়ে-বিচ্ছেদ কিংবা ভ্রমণের ওপর পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এই যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—তা তো আসলে নারীকে পার্থিব সমস্ত জটিলতা থেকে দূরে রেখে এক প্রকার নিষ্কলঙ্ক, ঝামেলাহীন পুতুলজীবনের অনন্য স্বাধীনতা দেওয়ারই নামান্তর।

নারীবাদীরা, বিশেষ করে কেট মিলেট তার Sexual Politics-এ যাকে ‘পুরুষের রাজনৈতিক আধিপত্য’ বলে চিৎকার করেছেন, তা মূলত পুরুষের ঘাড়ে ক্ষমতার বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার এক সামাজিক চক্রান্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণের উচ্চপর্যায়ে নারী নেই বলে যারা হা-হুতাশ করেন, তারা বোঝেনই না যে প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিচর্যা কিংবা নিরাপত্তার মতো নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে না নেওয়াটা কত বড় মানসিক আরাম।

মেক্সিকো বা রুয়ান্ডার মতো দেশে সংরক্ষণের মাধ্যমে নারীকে রাজনীতিতে টেনে আনার যে চেষ্টা চলছে, তা মূলত নারীর এই আদিম ও প্রথাগত রাজনৈতিক মুক্তির ওপর চরম আঘাত। ঝুঁকি নেওয়া, নোংরা প্রতিযোগিতা আর নেটওয়ার্কিংয়ের মতো যান্ত্রিক কাজে পুরুষ নিজের আয়ু ক্ষয় করছে, আর নারী সমাজের মহিমান্বিত দর্শক আসনে বসে পুরুষ রূপী পুতুলের নাচ উপভোগ করছেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এই রাজনৈতিক বঞ্চনার নেপথ্যে থাকা সামাজিক মনস্তত্ত্ব। সংসদ ভবনে তর্কাতর্কি করা, বিরোধী দলের গালাগাল খাওয়া কিংবা রাজপথে পুলিশের লাঠিচার্জ সহ্য করার দায়িত্ব পুরুষতন্ত্র নিজের কাঁধেই রেখে দিয়েছে। নারীকে দেওয়া হয়েছে ঘরের কোণে, একান্তে রাষ্ট্রচিন্তা থেকে দূরে থাকার অপূর্ব বিলাসিতা।

কোনো জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্যারা নেই, কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রেশার নেই—রাষ্ট্র নারীর হয়ে সব ভেবে দিচ্ছে, পরিবার তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পুরুষ হওয়ার একমাত্র অপরাধেই আজ আমাকে রাজপথে মিছিল করতে হয়, আর নারী পরম নিশ্চিন্তে পিতৃতন্ত্রের তৈরি করে দেওয়া রাজনৈতিক শূন্যতার ভেতরে বসে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ নাগরিক জীবন উপভোগ করেন।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে পুরুষ হওয়াটা যেন এক আজন্ম মানসিক পঙ্গুত্ব, আর নারী হিসেবে জন্ম নেওয়া মানেই এক মহাজাগতিক ও বিবর্তনীয় ছাড় উপভোগ করা। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ও আধুনিক গবেষণার আলোতেই তো স্পষ্ট—পুরুষকে প্রকৃতি ও সমাজ বানিয়ে রেখেছে এক কাঠখোট্টা, আগ্রাসী ও ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র; অন্যদিকে নারী পাচ্ছেন মনস্তাত্ত্বিক আবেগ প্রকাশ ও সামাজিক সুবিধার অপূর্ব ছায়া।

বিজ্ঞান আমাদের শোনায়, উচ্চ লিঙ্গবৈষম্যপূর্ণ দেশে নাকি নারীদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিস্থাপকতার অঞ্চল পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। ভাবুন, কত বড় সুবিধা! নারীদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্নতা প্রকাশের কত স্বাভাবিক ও সামাজিক স্বীকৃতি রয়েছে! কাঁদলে বা আবেগ প্রকাশ করলে নারীকে সমাজ নরম চোখে দেখে, সহানুভূতি ঢেলে দেয়।

আর পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক কপালে কী জোটে? পুরুষকে কোনো আবেগ প্রকাশ করা চলবে না, তাকে চিরকাল শক্ত ও পাথর হয়ে থাকতে হবে। মানসিক চাপে পিষ্ট হয়ে পুরুষ আসক্তিতে ডোবে, বাহ্যিক আচরণগত সমস্যায় ভোগে এবং শেষমেশ আত্মহত্যার উচ্চ হারের পরম প্রিভিলেজ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের রবার্ট ট্রিভার্সের Parental Investment Theory  তত্ত্ব দেখায়, সন্তান লালন-পালনে নারীকে কতটা প্রজননগত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। গর্ভধারণ, স্তন্যদান আর সন্তানের পেছনে সময় ও শক্তি ব্যয় করার এই বিবর্তনীয় সুযোগের দরুন নারীসঙ্গী বাছাইয়ে নারী পান পরম নির্বাচকের মর্যাদা!

আর পুরুষ? পুরুষকে প্রতিযোগিতা করতে হয়, নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে আগ্রাসী হতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয় এবং সিস্টেমেটিক বস্তুকেন্দ্রিক বুদ্ধির বড়াই করে মানসিক ক্লান্তি অর্জন করতে হয়। স্পেশিয়াল অ্যাবিলিটি বা স্থানিক দক্ষতা পুরুষের বেশি থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক সহানুভূতি ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতির পরম মানসিক শান্তি নারী একাই ভোগ করেন।

জুডিথ বাটলারের মতো নারীবাদীরা যাকে লিঙ্গের সামাজিক পারফরমেটিভিটি বলেন, বা সোশ্যালিস্ট নারীবাদীরা যাকে ক্ষমতার অসমতা বলে আখ্যা দেন—তার আসল সত্যটি অন্য জায়গায়। জৈবিক ও সামাজিক নিয়মগুলো পুরুষকে ঠেলে দিয়েছে অনবরত বেঁচে থাকার যুদ্ধে, আর নারীকে দিয়েছে ‘মানুষ-কেন্দ্রিক’ আবেগ ও যত্নমূলক সামাজিক জীবন উপভোগের সুযোগ। পুরুষের কাঁধে চাপানো হয়েছে পুরো পৃথিবী সামলানোর মানসিক দায়, আর নারীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে সেই পাহাড়সম মানসিক চাপ থেকে।

পুরুষতন্ত্র নারীকে যে গৃহবন্দিত্ব, মানসিক শূন্যতা, সহিংসতার ভয় এবং বাকস্বাধীনতা হরণের অপশনগুলো উপহার দিয়েছে—তাতে নারী আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ও মানসিক চাপমুক্ত নিপীড়িত প্রাণী! আর পুরুষ? পুরুষ কেবল তথাকথিত সামাজিক আধিপত্যের তকমা গায়ে জড়িয়ে, নিজের সমস্ত মানবিক আবেগ বিসর্জন দিয়ে, বিবর্তন ও পিতৃতন্ত্রের এই নীরব দাসত্ব ঘাড় পেতে বহন করে চলেছে।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top