লা*শটা ‘ভয়ংকর ডাকাত’ মুকুটের

১৭ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

১৯৭৩ সালের নভেম্বর। ঢাকা শহর তখনো যুদ্ধের ক্ষত শুকাতে শেখেনি। রাস্তায় রাস্তায় গর্ত, ফুটপাথে উদ্বাস্তুদের তাঁবু, আর বাতাসে এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলার গন্ধ—স্বাধীনতার পরেও যেন মুক্তির স্বাদ সম্পূর্ণ মেলেনি কারও।

মতিঝিল কলোনির সেই সকালটা ছিল কুয়াশায় মোড়া। নভেম্বরের হিম হাওয়ায় কাঁপছিল টিনের চাল, কাঁপছিল বারান্দায় দাঁড়ানো রমিজার বুকটাও। টিকাটুলির মোড় থেকে খবর এসেছে—একটা লাশ পড়ে আছে। চেনা মুখ। কলোনির সবার চেনা।

লাশটা মুকুটের।

মতিঝিল কলোনির মানুষরা মুকুটকে চিনত রায়হান নামে। লম্বা, চওড়া কাঁধ, চোখে অদম্য এক আত্মবিশ্বাস। সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন ছিল, কলোনির সব টুর্নামেন্টে ওর নাম থাকত প্রথম সারিতে। বাবা সরকারি কলেজের অধ্যাপক, মা স্কুলশিক্ষিকা। ভদ্র সংসার। রায়হান ছিল সবার চোখের মণি—যতক্ষণ না যুদ্ধ এলো।

একাত্তরের মার্চে রায়হান অদৃশ্য হলো। ফিরল ডিসেম্বরে, বিজয়ের পর। ফিরল এক বদলে যাওয়া মানুষ হয়ে। ওর চোখের তারায় তখন অন্য কিছু—যেন একটা আগুন জ্বলে, কিন্তু সেটা আলো দেয় না, পোড়ায়।

অস্ত্র জমা দিবি না?—বন্ধু সেলিম জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।

রায়হান হেসেছিল। যুদ্ধ তো শেষ হয় নাই, সেলিম ভাই। এই শহরেই তো শুরু হইছে নতুন যুদ্ধ।

সেই হাসিটাই আতঙ্ক ছড়িয়েছিল পরে। যখন রাতের ঢাকায় ছিনতাই শুরু হলো, যখন বাসাবাড়িতে মুখোশ পরা তরুণদের দল ভাঙচুর করত, তখনো কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি যে সেই দলের সর্দার ছিল রায়হান। একসময়ের চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু, যার হাতে পুলিশের অ্যামবুশও ফাঁকি খেয়ে যেত বারবার।

.

শিমুল ছিল নীলক্ষেতের মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ে, চোখে স্বপ্ন আর মননে এক অদ্ভুত সাহস। রায়হানের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল বুড়িগঙ্গার ঘাটে, বিজয়ের পরের শীতে। তখনো রায়হান অপরাধী হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি—ছিল শুধুই অস্থির, ক্ষুব্ধ, হারিয়ে যাওয়া এক তরুণ।

তুমি এত রাগ করো কেন?—জিজ্ঞেস করেছিল শিমুল এক বিকেলে, যখন তারা রমনা পার্কের ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে হাঁটছিল।

কারণ এই শহরটা আমারে কিছু দেয় নাই, শুধু কেড়েছে।

কী কেড়েছে?

রায়হান চুপ করে গিয়েছিল। বলতে পারেনি যে তার বাবাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, পারেনি বলতে যে তার ছোট বোনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পারেনি বলতে যে যুদ্ধ তাকে শিখিয়েছে একটাই জিনিস—টিকে থাকতে গেলে হিংস্র হতে হয়।

শিমুল তার হাত ধরেছিল সেদিন। সব হারানো মানুষই কি ডাকাত হয়?

না। কেউ কেউ প্রেমিকও হয়।

দুটোতেই হেসেছিল তারা। কিন্তু সেই হাসি স্থায়ী হলো না।

.

শহর বদলাচ্ছিল দ্রুত। আনকোরা নবগঠিত সরকার, তাদের সামনে দেশ পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ। আর সেই ফাঁকে গজিয়ে উঠছিল অপরাধের নতুন নতুন ধারা। অস্ত্রবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি—সব মিলেমিশে একাকার।

রায়হান তার দল তৈরি করল। চার-পাঁচজন—সবাই যুদ্ধফেরত, সবাই বিক্ষুব্ধ, নাকি বিভ্রান্ত! প্রথম দিকে ছোটখাটো, পরে পুরোদস্তুর ডাকাতি। সিদ্ধেশ্বরী, মগবাজার, কমলাপুর—কোথাও কিছু ঘটলে পুলিশের প্রথম সন্দেহ হতো—মুকুটের দল।

কিন্তু পুলিশ ওদের কখনো ধরতে পারেনি। একবার তো ফাঁদ পেতে সারা রাত অপেক্ষা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। রায়হান জানত শহরের প্রতিটা গলি, প্রতিটা ছাদ, প্রতিটা ড্রেন। আর জানত কীভাবে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে হয়।

শিমুল এসব জানত না পুরোপুরি। জেনেছিল আস্তে আস্তে, যখন ভালোবাসা গভীর হলো, যখন রায়হানের চোখের নিচে কালি পড়তে শুরু করল, যখন তার গায়ে মাঝে মাঝেই রক্তের দাগ লেগে থাকত।

এক রাতে সে বাধা দিতে এলো।

রায়হান, তুমি কেন এগুলো করো?

বাঁচার জন্য।

এই বাঁচা না। এটা মরা, রোজ রোজ মরা।

রায়হান কিছু বলতে যাবে, কিন্তু থেমে গেল। বাইরে তখন ডিসেম্বরের ঠান্ডা হাওয়া, মতিঝিলের সরু গলিতে কুকুর ডাকছে। দূরে কোথাও আজানের সুর ভেসে এলো—ফজরের আজান।

আমার আর ফেরার পথ নাই, শিমুল।

থাকে। সবসময় থাকে।

না, থাকে না। আমি দেখছি।

.

কথাটা শিমুল বুঝেছিল খুব দেরিতে, যখন সবকিছু গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। মুকুটের নাম তখন সারা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ডাকাতির সঙ্গে যোগ হয়েছে খুন, চাঁদাবাজি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সব মহল তাকে ভয় পেত, সমীহ করত।

কিন্তু কিছু ক্ষমতাবান মানুষ তাকে টার্গেট করল। শহরের অভিজাত পাড়ার ক্লাবে তখন এক দাপুটে যুবকের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী গ্রুপ। তারা শহর থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে চায়—এবং মুকুট তাদের তালিকার শীর্ষে।

পরিকল্পনা ছিল সহজ। প্রলোভন দেখানো হবে, ক্লাবে আনা হবে, তারপর...

সে রাতে শিমুল এসেছিল ফিরোজশাহ্ মোড়ে। চোখে পানি, হাতে একটা চিরকুট।

কাল ওই ক্লাবে যাচ্ছ তুমি?

রায়হান অবাক হলো। তুই জানলি কী করে?

সবাই জানে। সবাই জানে তোমাকে ওখানে ডাকা হয়েছে বড় একটা প্রস্তাবের জন্য। প্লিজ, যেও না।

কেন?

কারণ... কারণ তোমাকে মারার ফাঁদ ওটা।

রায়হান থমকালো। তারপর হাসল। মৃদু, বিষণ্ণ হাসি।

জানি।

জানো?

হ্যাঁ, জানি। কিন্তু যেতেই হবে। পালিয়ে বেড়ানো যায় না সারাজীবন।

শিমুল কাঁদছিল। সেই কান্না যেন নদী হয়ে বয়ে গেল ফুটপাথের ওপর দিয়ে। তাহলে আমাকে নিয়ে চলো। কোথাও চলে যাই। এই শহর ছেড়ে...

এই শহরই আমার জীবন, শিমুল। এই মতিঝিল, এই বুড়িগঙ্গা, এই ধুলো-ধোঁয়া—এগুলো আমি ছাড়তে পারব না।

.

শেষ রাত। টিকাটুলির সরু গলিতে ভোরের আজান ভেসে আসছে। কয়েকটা কাক উড়ে গেল আকাশে। নির্জন রাস্তায় একটা দেহ পড়ে আছে—রক্তে ভেসে যাচ্ছে পিচের কালো শরীর।

মুকুটের চোখদুটো নেই। কেউ তুলে নিয়ে গেছে।

পরের দিন পত্রিকায় ছোট্ট খবর—বেপরোয়া ডাকাতের রহস্যজনক মৃত্যু। কোনো তদন্ত হলো না, কেউ জবাবদিহি করল না। আরও কয়েক দিন পর সূর্যসেন হলের সামনে পাওয়া গেল তার দুই সহযোগীর লাশ। পুলিশ বলল—সেভেন মার্ডার কেস। রহস্যজনক সাত খুন।

শিমুল দাঁড়িয়েছিল মতিঝিল কলোনির ছাদে। দূরে কমলাপুর স্টেশনের বাঁশি ভেসে এলো। কুয়াশা কেটে সূর্য উঠল একটু একটু করে। শহর জেগে উঠল আবার—গাড়ির হর্ন, রিকশাওয়ালার ডাক, ফেরিওয়ালার সুর। এই শহর কারও জন্য থামে না।

তার মনে পড়ল রায়হানের শেষ কথাটা—পালিয়ে বেড়ানো যায় না সারাজীবন।

শেষ

বছর ঘুরল। শহর বদলাল। মতিঝিল কলোনির সরু গলিতে এখন নতুন বাচ্চারা খেলে। তাদের কাছে মুকুট শুধুই গল্প—ভয়ংকর এক ডাকাতের গল্প, যার চোখ কেউ তুলে নিয়েছিল।

কেউ জানে না, সেই চোখ ছিল একসময় সাঁতারের চ্যাম্পিয়নের। কেউ জানে না, একটা সময় ছিল যখন সে ভালোবাসতে চেয়েছিল নীলক্ষেতের একজন সাধারণ মেয়েকে। কেউ জানে না, ডিসেম্বরের এক ভোরে টিকাটুলির রাস্তায় শুধু একজন ডাকাত মারা যায়নি—মারা গিয়েছিল এক অসমাপ্ত প্রেম, একটা হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।

শহরের ইতিহাসে মুকুট এখন শুধুই একটা নাম। কিন্তু মতিঝিলের বুড়োরা বলে, শীতের ভোরে আজও নাকি টিকাটুলির মোড়ে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়—লম্বা, চওড়া কাঁধ, চোখ নেই, শুধু রক্তগড়ানো কোটর। অপেক্ষায়। কার? শহরের? ভালোবাসার? নাকি সেই চূড়ান্ত প্রতিশোধের, যেটা কখনো নেওয়া হয়নি?

বুড়িগঙ্গার জলে আজও তার প্রতিচ্ছবি ভাসে। আর নীলক্ষেতের কোনো এক ছাদে শিমুল এখনো রাত জেগে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে—যেখানে কোনো তারা নেই, শুধু ধোঁয়া, শুধু অন্ধকার, শুধুই ঢাকা।

 

১৭ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top