সাব অল্টার্ন দুর্নীতি করে এফলুয়েন্ট হয়ে উঠেই সাব অল্টার্নকে নির্যাতন

২৫ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে

 

ইন্ডিয়ায় বসে হাসিনার বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একের পর এক চিঠি দিয়েছে। ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেসব চিঠিকে পাত্তা দেয়নি। অবশেষে একটি কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘হাসিনার পুতুল নাচের ইতিকথা’ চালিয়ে যাবে—এটা তাদের অযৌক্তিক জাস্টিফিকেশনমার্কা বক্তব্যে স্পষ্ট।

ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লেখা কড়া চিঠিতে ইন্ডিয়া যতটুকু ব্যথা পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি ব্যথাকাতর হয়েছে বাংলাদেশের এক শ্রেণির লোকজন।

আমরা স্বভাবতই সাব অল্টার্নের শোষিত ও নিপীড়িত জীবন দেখে কষ্ট পাই। কিন্তু এই সাব অল্টার্ন একটু রবীন্দ্রসংগীত শোনা শিখলে, একটু ইংরেজি শিখলে তখন অবিকল কলকাতার বেঙ্গল রেনেসাঁর লোকেদের মতো হয়ে পড়ে। যারা সাব অল্টার্ন থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি, মুন্সি, গোমস্তার ছেলেদের মতো—যারা ইংরেজি শিখে ও সাসপেন্ডার পরতে শিখে নিজেদের কেউকেটা ভাবতে শিখেছিল। এরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কারও কড়া চিঠি দেখলে অনেক ব্যথা পেয়ে যেত। আমাদের ঢাকার নিও-টেগোর ও নিও-ইংলিশ ছেলে, যারা দৈবচয়নে সাব অল্টার্ন থেকে মিডল ক্লাস হয়েছে, তারাও ব্যথা পেয়ে যায় ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে কড়া চিঠি লিখলে।

এই সাব অল্টার্ন সাইকিই হাসিনার বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে সহনাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আসত; এখন সেই একই সাইকি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগে মামলা দিয়ে আসে।

গাড়ির জানালায় যে হতদরিদ্র লোকটি ভিক্ষার জন্য হাত পেতেছে, তাকে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিয়ে দিলেই সে নিষ্ঠুর পুলিশ প্রদীপ হয়ে তিন-চারশো মানুষকে ক্রসফায়ার দেখিয়ে হত্যা করতে সক্ষম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হাড়জিরজিরে ছেলেটি কাতর ও করুণ চেহারা নিয়ে ঘুরত, সে বিসিএস দিয়ে পুলিশ হলে জঙ্গিবাদের নাটক সাজিয়ে মানুষ খুন করে বেড়ায়। আবার গ্লোরিয়া জিনসে হাসিনার চাকর-বাকরের সঙ্গে ক্যাপুচিনো খেয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আলাপ করে।

সাব অল্টার্ন হাতে দলীয় ক্ষমতা পেলে চাঁদাবাজি করে। শীর্ণ হাড়গোড়ের ওপর চর্বি জমলেই তার লিবিডো তাকে তাড়িত করে। যে কারণে দল ক্ষমতায় গেলেই ওয়েস্টিনে পাপিয়ার আসর গড়ে ওঠে। ধানক্ষেতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর দিন শেষ হলেই তখন লিবিডোর মশারি টাঙানোর শখ জাগে। লিবিডোর কোনো আওয়ামী লীগ, জামায়াত, বিএনপি নেই; দলীয় ক্ষমতা-টেকাটুকা আর লিবিডো একই সূত্রে গাঁথা।

এটা কেবল বাংলাদেশ সমাজের চিত্র নয়; ইন্ডিয়া-পাকিস্তানেও একই অবস্থা। আমাদের আলোচনার কেন্দ্র বাংলাদেশ বলে, উদাহরণগুলো সেখান থেকে নেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে অ্যাংলো-স্যাক্সন কালচার নিজেদের ভুল স্বীকার করে সভ্যতার পাঠ নিতে চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান-মানবাধিকার নিশ্চিত করায় সাব অল্টার্ন থেকে পরিশ্রমের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত হওয়ার সুযোগ সেখানে তৈরি হয়েছে। এর ফলে সুশৃঙ্খল সামাজিক গতিশীলতা সেখানে দেখা যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্র কখনোই শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান-মানবাধিকারের ব্যবস্থা করেনি। ফলে ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল হয়ে বাংলাদেশ আমলে সাব অল্টার্ন থেকে এফলুয়েন্ট হওয়ার একটাই পথ—সরকারের দালালি করা। পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই এই দালাল সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে।

সরকারি পদায়ন মানেই কিছুদিন পরে জনগণের পদাঘাত—এই প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সূত্র সামনে থাকার পরেও সাব অল্টার্ন গিয়ে সরকারের পা পূজা করে এফলুয়েন্ট হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে কলকাতা এমন এক জায়গা, যেখানে বেঙ্গল রেনেসাঁর কারণে মানুষের দুই কাঁধে দশ কেজি ওজনের কালচার রক্ষার পাথর বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সাব অল্টার্ন এখানে পোস্ত ভর্তা দিয়ে ভাত খেলেই চলবে না; তাকে আবার কবিতা লিখতে হবে ও রবীন্দ্রসংগীত গাইতে হবে।

ব্রিটিশেরা উপনিবেশ গড়ার আগে পূর্ববঙ্গ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইকোনমিক পাওয়ার হাউস। ফলে সম্পন্ন কৃষক ও কারিগরের সহজিয়া জীবন ছিল; অবসরে আধ্যাত্মিকতা ছিল—কবিতা ও গান ছিল।

ব্রিটিশ উপনিবেশ এই জনপদকে জমিদারি প্রথার শাসন-শোষণ-লুণ্ঠনের মাধ্যমে নিঃস্ব করে ফেলে। কলকাতায় যারা গোরা সাহেবের পা পূজা করে ইংরেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে রাতারাতি একটু ধনী হয়ে পড়ে, সেই সাব অল্টার্ন গোষ্ঠীটি দাবি করে বসে, তারা জমিদার আর পূর্ববঙ্গের মানুষ সাব অল্টার্ন।

সেই থেকে পূর্ববঙ্গের মানুষের কাছে সাফল্যের সূচক কলকাতার জমিদার; তাদের বাবু বিলাস, তাদের নব্যশিক্ষিত ছেলের কালচার, নদীয়ার আঞ্চলিক ভাষা আর ইংরেজি শেখা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়ে গেলে রয়ে যায় কলকাতার কালচারাল জমিদারিটুকু। ফলে ঢাকাতেও কিছু লোকের কাঁধে সেই কালচার রক্ষার দশ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে দেওয়া হয়।

ঐ পাথরটির কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইন্ডিয়ার কাছে কড়া চিঠি লিখলে তাতে ইন্ডিয়ার চেয়ে বেশি ব্যথা পায় কালচারাল সাব অল্টার্নেরা।

জুলাই বিপ্লব বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে হাজির হলে যেসব সাব অল্টার্ন এরই মধ্যে পালা করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-সিপিবির ক্ষমতার ঝুঁটি ধরে একটু চর্বি জমিয়েছে, জমিদারের লেবাস পরে বাবু কালচার করতে শিখেছে, তারা ভীত হয়ে পড়ে। এই যে পলিটিক্যাল পার্টির ঝুঁটি ধরে জাতে ওঠা; আমলাতন্ত্রে, ব্যবসায় দুর্নীতি বসন্তের ফসল গোলায় তোলার যে শত বছরের ঐতিহ্য; সেই ঐতিহ্যকে বাঁচাতেই এত কাসুন্দি সকাল-বিকাল।

যতদিন পর্যন্ত সাম্যচিন্তাটা আমাদের সমাজের চিন্তা ও অনুশীলনে গভীরভাবে প্রোথিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই অস্বাস্থ্যকর কলতলার কথকতা থেকে মুক্তি নেই। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান-মানবাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে, পরিশ্রম সৌভাগ্যের একমাত্র পথ—এই চিরন্তন সূত্রটি সমাজে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

দুর্নীতিই সৌভাগ্যের একমাত্র পথ—এই অভিশপ্ত মন্ত্র বুকে নিয়ে ক্ষমতাহীন ক্ষমতায় গিয়ে উপায়হীনের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে দেশ লুণ্ঠন; সেই নির্যাতকের পতন ঘটিয়ে উপায়হীনের নির্যাতক হয়ে ওঠা; এই চোখের বদলে চোখ, চুপ করিয়ে রাখার শর্তে দেশ লুণ্ঠন, সাব অল্টার্ন দুর্নীতি করে এফলুয়েন্ট হয়ে উঠে সাব অল্টার্নকে নির্যাতন—এই প্রতিশোধচক্রে আটকে থাকা বিবর্ণ কালচারাল কলোনির সামষ্টিক মানুষের মুক্তি আসবে না।

২৫ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top