যে মানুষটা আমাদের ভাত খাওয়ায়, তার নিজের ঘরে ভাত কম কেন?

১১ পঠিত ... ৯ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে

 

একটু ভেবে দেখেছেন কি? যে মানুষটা ভোর চারটায় উঠে হাঁটু পানিতে নেমে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পুরো দেশের পেটের ভাত জোগাচ্ছে, মাস শেষে তার নিজের পকেটের অবস্থাটা কী?

পরিসংখ্যানের খাতা খুলে বসলে দেখবেন, বছরে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের আয় নাকি মাত্র ৩৩-৩৪ হাজার টাকা! ভাবা যায়? একটা পরিবারের সারা বছরের আয় এটা! কিন্তু কেন? আমরা তো মুখে খুব বলি, কৃষক আমাদের অন্নদাতা, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু ভেতরের আসল গল্পটা কী? কেন এই মানুষগুলোর পকেটে সবসময় টান পড়ে থাকে?

আসেন, কোনো কেতাবি কথা না বলে একদম মেঠো বাংলায় সহজ চোখে হিসাবটা বোঝার চেষ্টা করি।

প্রথম ঝামেলাটা হলো জমি আর ওই 'স্কেল'-এর ফাঁদ। ধরেন, আপনার জমি আছে মোটে ৩৩-৩৪ শতক। এখন এইটুকু জমিতে বীজ কিনতে গেলে, সার কিনতে গেলে বা পানি দিতে গেলে যে খরচ, আর বড় গৃহস্থের ১২০ শতক জমিতে যে খরচ—অনুপাতটা চিন্তা করেন? বড় কৃষকের স্কেল বড়, খরচ পোষায় যায়। আর আমাদের ক্ষুদ্র কৃষক? জমি ভেঙে টুকরো হতে হতে এমন জায়গায় ঠেকেছে যে, উৎপাদন খরচ উঠাতেই শার্টের কলার ভিজে যায়, আর ফসল বেচে দিনশেষে হাতে থাকে কেবল খুচরো পয়সা।

এরপর আসেন সরকারি সাহায্যের কিসসায়। সরকার তো চিৎকার করে বলে, আমরা সার ভর্তুকি দিচ্ছি, হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছি! শোনেন, আসল মজাটা কই। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সেই বাজেটের সিংহভাগ সুবিধা পায় শীর্ষ ২০ পার্সেন্ট ধনী কৃষক! আর তলানির ৪০ পার্সেন্ট ক্ষুদ্র কৃষক পায় মাত্র সামান্য এক ছাঁটকাটা অংশ। মানে, যার পেট ভরা তাকে দেওয়া হচ্ছে বড় প্লেট, আর যে ক্ষুধায় মড়ছে তাকে দেওয়া হচ্ছে উচ্ছিষ্ট। একে নীতি বলবেন না তামাশা বলবেন?

তারপর ধরেন ফসল তো কোনোমতে ফলালো। এবার যাবে কই? বাজারে! কিন্তু বাজারে তো বাঘ বসে আছে—মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার, দালাল। কৃষক ঘাম ঝরিয়ে টমেটো ফলাল কেজি ৫ টাকায়, আর আপনি-আমি কারওয়ান বাজারে গিয়ে কিনলাম ৪০ টাকায়। মাঝখানের ৩৫ টাকা গেল কার পেটে? ওই যে সুট-টাই পরা বা গাদিতে বসা বুদ্ধিমান দালালদের পকেটে! আর কোল্ড স্টোরেজ? কৃষক কি পকেটে করে কোল্ড স্টোরেজ নিয়ে ঘুরবে? পচে যাওয়ার ভয়ে পানির দামে আড়তদারের পায়ে ফসল সঁপে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফেরা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকে না।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের একঘেয়েমি আর কপাল। ধান চাষ করে যে কোটিপতি হওয়া যায় না, এটা কৃষকও জানে। কিন্তু অন্য কিছু চাষ করার মতো টাকা কই? ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কই? একটু হাই-ভ্যালু ফসল ফলাতে গেলে পুঁজি লাগে, ব্যাংক ঋণ লাগে। ব্যাংকে গেলে তো দলিল আর কাগজের চক্করেই কৃষকের দিন শেষ। ওদিকে এনজিওর চড়া সুদ! এর ওপর ফ্রি বোনাস হিসেবে আছে অসময়ের বন্যা আর খরা।

তাহলে দিনশেষে ছবিটা কী দাঁড়াল? জমি ছোট, খরচ বেশি, সরকারি নীতি উল্টো, বাজারে দালালের রাজত্ব, আর মাথার ওপর ঋণের বোঝা। এতগুলো দেয়াল চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলে একটা মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াবে কীভাবে?

আমরা তাদের মুখে খাদ্যদাতা বলে সম্মান জানাই, গলায় মালা দিই, সুন্দর বক্তৃতা ঝাড়ি। কিন্তু ভেতরের আসল সত্যিটা হলো—কাঠামোটাই এমনভাবে বানানো, যাতে উনি আমাদের ভাত জুগিয়ে যাবেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পকেটের ভাত আর কোনোদিন মেলাতে পারবেন না!

১১ পঠিত ... ৯ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top