শেখ হাসিনা: ক্ষমতা হারিয়েও বদলায়নি বয়ান

৫৮ পঠিত ... ১২ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে

 

রাজনীতিতে ক্ষমতার মেদ ঝরে গেলে যা পড়ে থাকে, তা মূলত শব্দ—কিছু আত্মপক্ষ সমর্থনের বিলাপ, কিছু সাজানো হাহাকার এবং চমৎকার একপেশে স্মৃতিশক্তি। নয়াদিল্লির সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল অবয়ব আর অডিও কণ্ঠ আমাদের আবারও এক চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাল: ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষজন কখনো ভুল করেন না, তাদের ঘিরে কেবল ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়।

রাজনীতির থিয়েটারে স্বৈরাচারের নিজস্ব একটি ট্র্যাজেডি থাকে। এই ট্র্যাজেডির প্রথম অঙ্কটি রচিত হয় আত্মতুষ্টি দিয়ে, আর শেষ অঙ্কটি সাজানো হয় আমি তো ভালোই চেয়েছিলাম, কিন্তু চক্রান্তকারীরা দেশটা ধ্বংস করল—এই সুরের খেদে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে যখন স্রেফ পরিকল্পিত রেজিম চেঞ্জ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা আর যাই হোক, বাস্তবতার নিরীখে খুব একটা নম্বর পায় না।

কিন্তু স্মৃতিভ্রমের এই কায়দাটি তো বেশ পরিচিত! দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনব্যবস্থায় যখন প্রতিটি ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহ আর চক্রান্ত হিসেবে গণ্য করা অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়, তখন হাজার মানুষের রাজপথে নেমে আসাকে মেটিকিউলাসলি ডিজাইন্ড স্কিম বা সাজানো নাটক মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক।

এখানে আসল কৌতুকটা লুকিয়ে আছে অপরাধবোধের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন, শত শত তরুণের রক্ত, গুলিবিদ্ধ রাজপথ—এসবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যখন কেবল নিজের আবেগ, নিজস্ব পরিবারের স্বজন হারানোর ক্ষত আর ৪৫০টি পুলিশ স্টেশন আক্রমণের হিসাব শোনানো হয়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্ষমতার ইতিহাস রচনা করার দায় কেবল বিজয়ীর নয়, ক্ষমতাচ্যুত শাসকেরও থাকে। তবে সেই ইতিহাসে নিজেদের ভুলগুলো থাকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য।

শেখ হাসিনার বক্তব্য তাই একজন আত্মবিচারের মুখোমুখি দাঁড়ানো নেত্রীর বক্তব্য নয়; এটি একজন নির্বাসিত শাসকের আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিচিত চিত্রনাট্য। সেখানে আন্দোলনকারীরা আন্দোলনকারী নন, তারা সুসংগঠিত রাজনৈতিক অস্ত্র। সেখানে নিজের পুলিশ বাহিনীর নির্মমতা কোনো আলোচনার বিষয় নয়, আলোচনার বিষয় কেবল তাদের ওপর হওয়া প্রতিআক্রমণ।

রাষ্ট্র যখন নাগরিককে নাগরিক না ভেবে ষড়যন্ত্রের ঘুঁটি ভাবতে শুরু করে, তখনই ক্ষমতার পতনের ঘণ্টা বাজে। আর পতন ঘটার পরেও যদি সেই একই ভাবনা জারি থাকে, তবে বুঝতে হবে রাজনীতি বদলালেও রাজনৈতিক দর্শন এক চুলও বদলায়নি।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাংলাদেশ আরেক পাকিস্তান হয়ে যাচ্ছে কিংবা ইসলামিক চরমপন্থার উত্থান মার্কা প্রেসক্রিপশনটিও অত্যন্ত ক্লিশে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্ল্যাকমেইল করার পুরনো সস্তা অস্ত্র। পশ্চিম বা ভারতের সিকিউরিটি-প্যানিককে উসকে দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের এই বিদ্যাটি রাজনৈতিক দর্শনে এতটাই পুরোনো যে তা এখন আর কারও চোখে ধুলো দেয় না।

দেশ নাকি রগ স্টেট বা চরমপন্থী রাষ্ট্র হতে চলেছে—এই ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা পুনর্দখলের যে আকুতি, তা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ব্যাকুলতা কম, বরং হারিয়ে যাওয়া আধিপত্য ফেরত পাওয়ার আইনি অজুহাত মাত্র।

রাজনীতির হাটে এখন সবচেয়ে দামি পণ্য হলো 'তারিখ’। ডিসেম্বরে দেশে ফেরার এই রূপকথাসম হুমকিটি মূলত শেখ হাসিনার জন্য কোনো বাস্তব কৌশল নয়, বরং নিজ কর্মীদের চাঙ্গা রাখার এক মরিয়া রাজনৈতিক টনিক।

যখন দল নিষিদ্ধ, অফিসগুলোতে তালা, আর মূল নেতারা হয় জেলে নয়তো দেশছাড়া, তখন দূর থেকে "আমি আসছি" বলাটাই তৃণমূল কর্মীদের দল না ছাড়ার একমাত্র মানসিক শেকল। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে শাসক রাষ্ট্রের ওপর বন্দুকের নল উঁচিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করেন এবং শেষমেশ দেশ ছেড়ে যান, জনতার মেমোরি কার্ডে তার প্রত্যাবর্তনের চিত্রনাট্যটি সাধারণত বেশ করুণ হয়।

আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক নেত্রী যখন বলেন, ভয় আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করবে না, তখন প্রশ্ন জাগে—যে দায়িত্বের কথা তিনি বলছেন, তা কি বিগত শাসনের রক্তের দায় নেওয়ার দায়িত্ব, নাকি নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরির দায়িত্ব?

এই পুরো নাটকের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক চরিত্র অবশ্য ভারত সরকার। ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান হলো সেই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ফড়িয়ার মতো, যে প্রকাশ্যে হাত ধুয়ে ফেলে বলে, এটা একটা বেসরকারি ক্লাবের অনুষ্ঠান, বাকস্বাধীনতা! আর অন্তরালে হাসিনাকে নিজের ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে চায়ে চুমুক দেয়।

নয়াদিল্লির এই দ্বিমুখী খেলা অত্যন্ত পুরোনো কৌশল। হাসিনাকে চাপের পয়েন্ট হিসেবে জিইয়ে রাখা মানে বাংলাদেশের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ যে কোনো সরকারকে ব্যাকফুটে রাখা—যাতে ভারতের নিরাপত্তা, সীমান্ত বা চীনের প্রভাব-সংক্রান্ত দরকষাকষিতে সবসময় একটা শেখ হাসিনা তাস হাতে থাকে।

এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করলেও, ভূ-রাজনীতির নির্মম সত্য হলো: আদর্শের চেয়ে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ আর নিজেদের স্বার্থটাই রাষ্ট্রের কাছে বড় হয়ে ওঠে।

তবে এই পুরো রাজনৈতিক সার্কাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং কিছুটা কৌতুকপূর্ণ দিক হলো বিশ্বস্ত সহযোগীদের ভূমিকা। সাকিব আল হাসানের মতো চরিত্ররা যখন ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আগস্টকে দুঃখের মাস বলে ট্র্যাজেডির আবহ তৈরি করতে চান, তখন বোঝা যায়—ক্ষমতার সমীকরণে সুবিধাবাদ কীভাবে চেতনার রূপ নেয়।

১৫ বছরের শাসনকালে যারা জনগণের অধিকার হরণের সময় নিশ্চুপ থেকে ক্ষমতার সুফল ভোগ করেছেন, তারা আজ নির্বাসিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করছেন। নিহত শিক্ষার্থীদের রক্তকে পরিকল্পিত সহিংসতার অজুহাতে ঢেকে দিয়ে, নিজেদের ভিকটিম বানানোর এই চেষ্টাটা কেবল সত্যের অপলাপ নয়, এটি সরাসরি গণমানুষের স্মৃতির সঙ্গে এক ধরনের উপহাস।

পরিশেষে, শেখ হাসিনা এবং তার অনুসারীদের এই নয়া অবতার আমাদের একটা বড় শিক্ষা দেয়: ক্ষমতা হারানো কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু কেন ক্ষমতা হারালেন সেই সত্যটা স্বীকার না করাটাই হলো রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব।

জুলাই-আগস্টের শত শত শহিদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে যখন কোনো দল কেবল নিজেদের হারানো গদি আর পুলিশ স্টেশনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মেলাতে বসে, তখন বুঝতে হবে সেই দল অতীত থেকে কিছুই শেখেনি।

ডিসেম্বরে তিনি ফিরবেন কি ফিরবেন না, তা সময় বলবে। তবে ২০২৪-এর রাজপথের ইতিহাস যে রায় দিয়ে দিয়েছে, তা নয়াদিল্লির অডিও বার্তা বা সংবাদ সম্মেলন দিয়ে মুছে ফেলা অসম্ভব।

৫৮ পঠিত ... ১২ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top