হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের কুৎসিত হাঁসের গল্পটা কি তার নিজের?

১০০ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

তখন পড়ি ক্লাস থ্রিতে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি পড়তে পারি। মাঝে মাঝে পাবলিক লাইব্রেরিতে যাই। মজার মজার বই পড়ি। এত ছোট মানুষ পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ি দেখে বড় বড় ভাইয়া-আপুরা অবাক হতেন। আদর করতেন, উঁচু তাক থেকে বই পেড়ে দিতেন। চিলড্রেনস জোনের একদম ওপরের তাকটা তখনও আমার হাতের নাগালের বাইরে ছিল। একদিন একজন আপু বিশাল এক বই পেড়ে দিলেন আমাকে। কালচে-সবুজ কভারে বাঁধাই করা, তার ওপর সোনালি বর্ডার আর ক্যালিগ্রাফিক ফন্টে লেখা Tales of Hans Christian Andersen। বইটা খুলতেই হাজার হাজার রঙিন ছবি আমাকে এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে গেল। সেই আপু আমাকে এই রঙিন ইংরেজি বই থেকে পড়ে পড়ে শোনালেন। ইংরেজিতে পড়ে শোনানোর পর আবার বাংলাতেও গল্পগুলো বুঝিয়ে বলতেন। আমার সঙ্গে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের পরিচয় সেখান থেকেই।

এরপর বড় হলাম। ডিজনির যেসব মুভি দেখে বড় হয়েছি, সেগুলোর অনেকগুলোরই মূল লেখক যে আসলে এই হ্যান্স, সেটাও জানলাম। আরও জানলাম, বাচ্চাদের মন যাতে ভেঙে না যায়, সে জন্য ডিজনি গল্পগুলোর অনেকগুলোরই আশাবাদী সমাপ্তি দিয়েছে। তখন মনে হলো, তাহলে আসল গল্পগুলো কেমন?

বইয়ের রাজ্যে তখন আমার ছিল অবাধ বিচরণ। আর রূপকথার বই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। ওই যে ছোটবেলায় রঙিন বইটার ভেতরে ঢুকেছিলাম, আর বের হতে পারিনি। খুঁজতে খুঁজতে একসময় পেয়ে গেলাম হ্যান্সের রূপকথাগুলোর আসল সংস্করণ। পড়ে আমার কান্না পেয়ে গেল। লিটল মারমেইড কেন ফেনা হয়ে সমুদ্রে মিশে গেল? গল্পগুলো এত দুঃখের কেন?

বড় হওয়ার পর বুঝলাম, যে মানুষটার জীবনে দুঃখ ছাড়া যেন আর কিছুই ছিল না, সে মানুষটা দুঃখের গল্পই তো লিখবে।

হ্যান্সের দুঃখের কাহিনি আর কী বলব...

হ্যান্সের বাবা ছিলেন একজন সাধারণ জুতা সেলাইকারী। তিনি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও বইপ্রেমী মানুষ ছিলেন। কাজ থেকে ফিরে ছোট্ট হ্যান্সকে পাশে বসিয়ে আরব্য রজনীর রূপকথা পড়ে শোনাতেন, শেক্সপিয়ারের নাটক থেকে আবৃত্তি করতেন। আর তাঁর মা ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, অশিক্ষিত ও অন্ধবিশ্বাসী একজন ধোপা। তিনি ছেলেকে খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু ভূতপ্রেত আর নানা অলৌকিক গল্পে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন।

ছোট্ট হ্যান্সের চেহারা অন্য দশটা শিশুর মতো ছিল না। ঢ্যাঙা শরীর, অস্বাভাবিক বড় নাক, লম্বা হাত-পা আর ভীষণ লাজুক স্বভাব। রাস্তার অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারতেন না। সমবয়সীরা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত, খেপিয়ে তুলত। ফলে হ্যান্সের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠল তাঁর কল্পনাশক্তি। তিনি জুতার ফিতা, কাপড়ের টুকরো আর কাঠের টুকরো দিয়ে ছোট ছোট পুতুল বানাতেন। তাঁর বাবাই তাঁকে একটি ছোট কাঠের পুতুলনাচের থিয়েটার বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ছোট্ট কাঠের মঞ্চে হ্যান্স নিজের লেখা অদ্ভুত সব গল্পে পুতুলগুলোকে দিয়ে অভিনয় করাতেন।

কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ হঠাৎ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

১৮১৬ সাল। নেপোলিয়নের যুদ্ধে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া হ্যান্সের বাবা মারা গেলেন। তখন হ্যান্সের বয়স মাত্র ১১ বছর। সংসারের চরম অনটনে তাঁর মা পড়াশোনা ছাড়িয়ে তাঁকে কাজ শিখতে পাঠালেন। কখনও তাঁতের কাজ, কখনও দর্জির দোকানে। কিন্তু বিষণ্ন, স্বপ্নাতুর হ্যান্সের মন কোথাও টিকল না। তিনি কারখানার কর্মচারীদের ডেনিশ গান গেয়ে শোনাতেন কিংবা শেক্সপিয়ারের সংলাপ আবৃত্তি করতেন। এতে অন্য শ্রমিকেরা তাঁকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করত। নিঃসঙ্গতা যেন তাঁর পিছু ছাড়ল না।

স্বপ্নের শহরে...

১৮১৯ সাল। হ্যান্সের বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। পকেটে জমানো সামান্য কিছু টাকা আর কাঠের পুতুলগুলো একটি ছোট পুটলিতে বেঁধে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলে দর্জির কাজ শিখুক, কিন্তু হ্যান্স ছিলেন অনড়।

— তুমি কোপেনহেগেনে গিয়ে কী করবে? কান্নাজড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তার মা।

১৪ বছরের ছেলেটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল,

— আমি বিখ্যাত হব! প্রথমে মানুষ অনেক কষ্ট পায়, কিন্তু তারপর তারা বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

কোপেনহেগেন ছিল রূপকথার শহর, কিন্তু হ্যান্সের জন্য তা হয়ে উঠল এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। বিশাল রাজপথ, বড় বড় দালান আর ধনী মানুষদের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত বহিরাগত। রয়্যাল ডেনিশ থিয়েটারে গিয়ে অভিনয়ের সুযোগ চাইলেন, কিন্তু তার ঢ্যাঙা চেহারা আর অদ্ভুত নাটুকে চালচলন দেখে সবাই তাঁকে হেসে উড়িয়ে দিল। কেউ কেউ তো তাঁকে পাগল বলেও মনে করেছিল।

ক্ষুধার্ত ও দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটছিল হ্যান্সের। এমন সময় তার গানের প্রতিভার দিকে নজর পড়ে থিয়েটার পরিচালক জোনাস কোলিনের। তিনি হ্যান্সের ভেতরের অদম্য সৃষ্টিশীলতাকে চিনতে পারেন। রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডেরিকের কাছ থেকে তাঁর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন এবং স্লাগেলস শহরের একটি গ্রামার স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেন।

কিন্তু সেখানেও শান্তি মেলেনি। ছোট শিশুদের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়া, আর নিষ্ঠুর প্রধান শিক্ষক মাইসলিংয়ের অপমান ও তাচ্ছিল্য হ্যান্সের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই কষ্টের কথা তিনি নিয়মিত ডায়েরিতে লিখে রাখতেন।

সবকিছু সহ্য করে ১৮২৮ সালে তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপরই শুরু হয় অ্যান্ডারসনের আসল যুদ্ধ।

১৮২৯ সালে তাঁর কল্পনাভিত্তিক ভ্রমণকাহিনি A Journey on Foot from Holmen's Canal to the East Point of Amager প্রকাশিত হয়। এরপর ১৮৩৫ সালে ইতালি ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ওপর লেখা উপন্যাস The Improvisatore তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।

তবে একই বছর অর্থের প্রয়োজনে প্রকাশিত Fairy Tales Told for Children সংকলনই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সমালোচকেরা রূপকথা লেখাকে 'তুচ্ছ সাহিত্য' বলে আক্রমণ করলেও অ্যান্ডারসন পিছু হটেননি। নিজের দুঃখ, সামাজিক বৈষম্য আর জীবনদর্শনকে ক্যানভাস বানিয়ে তিনি লিখে ফেললেন The Little Mermaid, The Ugly Duckling, The Little Match Girl এবং The Emperor's New Clothes-এর মতো কালজয়ী সব রূপকথা।

প্রেমে পড়া বারণ হ্যান্সের...

সাহিত্যে বিপুল খ্যাতি পেলেও অ্যান্ডারসনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম নিঃসঙ্গতায় ভরা। তিনি বারবার প্রেমে পড়েও ব্যর্থ হয়েছেন। প্রথমে বন্ধুর বোন রিবোর্গ ভয়ট, পরে তাঁর অভিভাবকের মেয়ে লুইস কোলিন—কেউই তাঁর ভালোবাসার প্রতিদান দেননি।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেম ছিলেন ‘সুইডিশ নাইটিঙ্গেল’ খ্যাত অপেরা গায়িকা জেনি লিন্ড। ১৮৪৩ সালের বড়দিনে অ্যান্ডারসন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জেনি অত্যন্ত মার্জিতভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, হ্যান্সকে তিনি কেবল একজন ‘ভাই’ হিসেবেই দেখেন।

এই প্রত্যাখ্যান অ্যান্ডারসনকে সারাজীবনের জন্য আরও একাকী করে দেয়। বড় বড় রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ পেলেও রাত শেষে তিনি ফিরতেন নিঃসঙ্গ ঘরে। আজীবন তিনি অবিবাহিতই থেকে যান।

মৃত্যুর পর তার বুকের কাছে একটি ছোট চামড়ার থলি পাওয়া গিয়েছিল। সেই থলির ভেতরে ছিল বহু বছর আগে তাঁর প্রথম প্রেম রিবোর্গ ভয়টের হাতে লেখা একটি চিঠি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অ্যান্ডারসন সেই চিঠিটি বুকের কাছেই আগলে রেখেছিলেন।

চার্লস ডিকেন্স ও হ্যান্স: বন্ধু হতে গিয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম...

আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার পর অ্যান্ডারসন ইউরোপজুড়ে ভ্রমণ করতেন। তিনি বলতেন,

To travel is to live.

১৮৫৭ সালে তিনি ইংল্যান্ডে চার্লস ডিকেন্সের বাড়িতে অতিথি হয়ে যান। সেখানে চার-পাঁচ দিন থাকার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত টানা পাঁচ সপ্তাহ থেকে যান। হ্যান্সের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ ও কিছুটা অস্বস্তিকর আচরণে ডিকেন্সের পরিবারের সদস্যরা বিরক্ত হয়ে পড়েন।

অ্যান্ডারসন বিদায় নেওয়ার পর ডিকেন্স নাকি রসিকতা করে তাঁর অতিথিকক্ষে একটি নোট রেখে দিয়েছিলেন, যেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করার বিরক্তির ইঙ্গিত ছিল। এরপর ধীরে ধীরে তিনি অ্যান্ডারসনের চিঠির উত্তর দেওয়াও বন্ধ করে দেন। এই ঘটনাটি হ্যান্সকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল।

১৮৬৭ সালে জন্মশহর ওডেন্স তাঁকে 'সম্মানসূচক নাগরিক' হিসেবে বরণ করে নেয়।

১৮৭২ সালে খাট থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

১৮৭৫ সালের ৪ আগস্ট, ৭০ বছর বয়সে কোপেনহেগেনের কাছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেলকিওর পরিবারের রোলিগহেড ভিলায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন রূপকথার সেই জাদুকর। পরে কোপেনহেগেনে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন চলে গেছেন দেড়শ বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু তিনি আজও বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্টির ভেতর। ডেনমার্ক ছাড়িয়ে তাঁর রূপকথা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র ইউরোপে, তারপর সারা বিশ্বে।

শৈশবে সবাই যাকে কুৎসিত বলে অবহেলা করেছিল, নিজের সৃষ্টির জাদুতেই সেই ছেলেটি একদিন সত্যিই অপূর্ব এক রাজহাঁসে পরিণত হয়েছিল।

হয়তো এ কারণেই The Ugly Duckling শুধু একটি রূপকথা নয়—এটি ছিল হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের নিজের জীবনের গল্প।

 

১০০ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top