প্যারাসেইলিং না প্যারাসুইসাইড?

৮২ পঠিত ... ১৬:৪৯, আগস্ট ০৩, ২০২৬

 

আমাদের সমাজজীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও সর্বব্যাপী নীতিটি খুব সরল— অমুক করিতেছে, অতএব আমাকেও করিতে হইবে। অমুক ডালপুরি খাইয়া পেট খারাপ করিয়াছে? আমি কেন বাদ যাইব? অমুক শেয়ারবাজারে টাকা ঢালিয়া রাস্তায় বসিয়াছে? আমারও ফকিরি হইবার অধিকার রহিয়াছে! এই পরম মানসিক ব্যাধির সর্বশেষ ও সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সংস্করণের নাম— প্যারাসেইলিং।

ঘটনাটা খোলাসা করা যাক। গত ১ আগস্ট ২০২৬, কক্সবাজারের দরিয়ানগর সৈকতে খুলনার এক যুবক, বয়স আনুমানিক ৩০, আকাশে ডানা মেলার অদম্য সাধ নিয়ে ২,০০০ টাকার টিকিট কাটলেন। তার ওজন ছিল প্রায় ১১০ কেজি। প্যারাসেইলিংয়ের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিয়ম স্পষ্ট ভাষায় বলে— ৯০ বা ৯৫ কেজির ওপরের কাউকে আকাশে ঝুলিয়ে দেওয়াটা মোটেও নিরাপদ নয়। কিন্তু আমাদের বাণিজ্যপ্রেমী অপারেটররা ভাবলেন, ওজন আবার কী? টাকাই আসল!

বাতাসের গতি সেদিন ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার, যেখানে সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতেই খেলা বন্ধ করে দেওয়ার কথা। উপরন্তু, ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’ নামক মহান প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রশাসনিক অনুমোদনই ছিল না। ২০২৫ সালের পর নাকি জেলা প্রশাসন কাউকেই লাইসেন্স দেয়নি!

ফলাফল? প্রায় ৩০০–৪০০ ফুট উঁচুতে ওঠার পর সেফটি হারনেস থেকে ছিটকে সৌভিক সরাসরি পড়ে গেলেন বঙ্গোপসাগরের বুকে। লাইফজ্যাকেট আলাদা ভাসছে, মানুষটি তলিয়ে যাচ্ছেন। তীরে এনে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা যা বললেন, তা আমরা সবাই জানি।

ঝুঁকি নেওয়া আর জেনেশুনে গর্তে লাফ দেওয়া— এ দুয়ের মাঝে যে একখানা সূক্ষ্ম রেখা ছিল, বাঙালি তাহা বহু আগেই ভুলিয়া গিয়াছে। ফেসবুকে ছবি দিতে হইবে, Flying Like a Bird ক্যাপশন দিতে হইবে; ব্যস, জীবন তো একটাই, সুতরাং সেটাকে চারশো ফুট ওপর থেকে ফেলে দেওয়াই তো শ্রেয়!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এটি কোনো আকস্মিক দৈব দুর্ঘটনা নয়। গত এক বছরে কেবল ওই এলাকায় অন্তত ৭ জন পর্যটক ডানা-ভাঙা পাখির মতো সাগরে আছড়ে পড়েছেন বা ঝাউগাছে আটকে থেকেছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে এক দম্পতিকে নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে ঝুলাতে গিয়ে ফেলে দেওয়া হলো, আগস্টে আরেকজন আটকে রইলেন গাছে। কিন্তু বাঙালি কি তাতে থেমেছে? মোটেই না। কারণ আমাদের ভেতরের সেই পরম বাণী— ‘অমুক উড়িছে, সুতরাং আমি কেন মাটির ওপর হেঁটে বেড়াব?’

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে— তবে কি মানুষ আকাশে উড়বে না? রোমাঞ্চ খোঁজা কি পাপ?

উত্তর হলো— রোমাঞ্চ ভালো, কিন্তু সস্তা অ্যাডভেঞ্চারের নামে জীবনটাকে লটারির টিকিট বানিয়ে দেওয়াটা চরম মূর্খতা। আপনি যখন সমুদ্রসৈকতে গিয়ে চারশো ফুট ওপরে ওঠার পরিকল্পনা করছেন, তখন কয়েকটি অতি সাধারণ ও মামুলি বিষয় মাথায় রাখা কি খুব বেশি কষ্টকর?

আকাশে ওঠার আগে যা যা দেখা বাধ্যতামূলক:

১. নিজের শরীরের খবর নিন: আপনার ওজন যদি ১১০ কেজি হয়, তবে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন না দেখে মাটিতে বসে ডাব খাওয়া অনেক বেশি সম্মানজনক ও নিরাপদ। ওজনসীমা (সর্বোচ্চ ৯০–৯৫ কেজি) না মানলে আকাশ আপনাকে ক্ষমা করবে না।

২. বাতাসের মেজাজ বুঝুন: হাওয়ার বেগ ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি থাকলে কিংবা ঝোড়ো আবহাওয়া থাকলে অপারেটর যত বড় প্রলোভনই দিক, সরাসরি না বলুন। টাকা ফেরত না-ই দিক, প্রাণটা তো বাঁচবে!

৩. লাইফজ্যাকেট ও হারনেস পরখ করুন: আপনাকে যে লাইফজ্যাকেট দেওয়া হচ্ছে, সেটি কি আপনার সাইজ অনুযায়ী ঠিকমতো ফিট করছে, নাকি আলগা ঝোলা কাপড়? জরুরি উদ্ধারের জন্য কোনো রেসকিউ বোট বা জেটস্কি প্রস্তুত আছে তো?

৪. অনুমোদন আছে কি? যে আপনাকে ঝুলিয়ে দেবে, তার নিজের কোনো বৈধ লাইসেন্স আছে তো? নাকি সে কোনো এক রাতে ছাগল বেচে প্যারাসেইল কিনে অবৈধভাবে ব্যবসা শুরু করেছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি শোনানো যাক সেইসব বীর বন্ধুদের, যারা অন্যকে উসকে দিতে ওস্তাদ— কিরে, তুই পারবি না? তুই তো ভীরু! তুই তো কাপুরুষ!— এই ধরনের অতি-উৎসাহী ট্রল করা বন্ধ করুন। যে প্যারাসেইলিং করতে চাচ্ছে না, তাকে লজ্জা দেওয়া বা পীড়াপীড়ি করা কোনো বীরত্ব নয়; বরং অপরাধের শামিল।

অমুক পারতেছে, আমাকেও পারতে হবে— এই ভেড়া-মার্কা প্রবণতা ছাড়ুন। জীবনটা আপনার ফেসবুক প্রোফাইলের কোনো স্টোরি নয়, যে ২৪ ঘণ্টা পর গায়েব হয়ে যাবে আর পরদিন আবার নতুন স্টোরি বানাবেন। জীবন একবারই মেলে, আর বঙ্গোপসাগরের লোনা জল কোনো দয়া-মায়া চেনে না।

বাঁচলে তবেই না আবার রোমাঞ্চ!

 

৮২ পঠিত ... ১৬:৪৯, আগস্ট ০৩, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top