১
১৯২৬ সালের ১ আগস্ট। শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা দুপুর।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে প্রচণ্ড হট্টগোল। প্ল্যাটফর্মে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দাঁড়িয়ে আছে নোয়াখালীগামী লোকাল ট্রেন। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের হিসহিস শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
ট্রেনের একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরার জানালায় এক যুবক বসে আছেন। বয়স ছাব্বিশ কিংবা ২৭। মাথায় বাবরি চুল, পরনে ধবধবে সাদা খদ্দরের কুর্তা আর ধুতি। চোখ দুটো আশ্চর্য রকমের জ্বলজ্বলে—যেন একটু ফুঁ দিলেই সেখান থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হবে। যুবকের এক হাতে ধরানো একটা পান, অন্য হাতে অনবরত খাতা-কলম চলছে।
এই যুবকের নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
তার ঠিক মুখোমুখি বসে আছেন ছিপছিপে গড়নের আরেক তরুণ। নাম হবীবুল্লাহ বাহার। চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেওয়ার পর থেকেই বাহার সাহেব বেশ কিছুটা নার্ভাস। তার নার্ভাস হওয়ার দুটো কারণ। প্রথম কারণ—পাশে বসে থাকা লোকটা সাধারণ কেউ নন, গোটা বাংলায় এখন যার নাম শুনলে ব্রিটিশ পুলিশের পিঠ দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। আর দ্বিতীয় কারণ—তিনি এই অগ্নিপুরুষকে নিয়ে যাচ্ছেন তার নিজের জন্মভূমি ফেনীতে।
ফেনী তখন কোনো আলাদা জেলা নয়। নোয়াখালী জেলার অধীনস্ত ছোট্ট একটি মহকুমা শহর। ১৮৮১ সালে আমীরগাঁও থেকে মহকুমা সদর দপ্তর ফেনী শহরে আনার পর থেকে অল্প অল্প করে শহরটা জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ চালু হওয়ার পর থেকে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিন্তু শহরের আয়তন যত ছোটই হোক, এখানকার মানুষের রক্তে রাজনীতির তেজ একটু বেশিই।
বাহার সাহেব কাচুমাচু হয়ে বললেন, কাজীদা, ট্রেনে তো প্রচণ্ড ভিড়। ফেনী স্টেশনে নেমেই কিন্তু সোজা ইসলামিয়া হাই স্কুল মাঠে যেতে হবে। মানুষ কিন্তু সকাল থেকে বসে আছে।
নজরুল খাতা থেকে চোখ তুলে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত সুন্দর এক টুকরো হাসি ফুটল। পান চিবোতে চিবোতে তিনি বললেন, বসুক বাহার, বসুক! মেঘ না চাইলে জল মিলবে কীভাবে? ফেনীর বাতাস কেমন হে বাহার? ইংরেজদের ভয়ে শক্ত হয়ে আছে, না কি বিপ্লবের গন্ধ পাওয়া যায়?
বাহার সাহেব একটু ইতস্তত করে বললেন, পরিস্থিতি ভালো না কাজীদা। চারদিকে একটা অদ্ভুত টানটান উত্তেজনা। খিলাফত আন্দোলন আর অসহযোগের পর থেকে ব্রিটিশদের অত্যাচার বেড়েছে। স্থানীয় জমিদার আর তালুকদারদের দাপটও কম না। তার ওপর খবর রটেছে, খোদ কলকাতায় নাকি হিন্দু-মুসলিমে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার কলকাঠি নাড়া হচ্ছে।
নজরুল পান চিবোনো বন্ধ করলেন। হঠাৎ তার চেহারার চিরচেনা হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গেল। একমুহূর্তের জন্য চোখ দুটো চরম গম্ভীর হয়ে উঠল।
তিনি ট্রেনের কামরার কাঠের ফ্রেমে লাগানো কাচের বাইরে তাকালেন। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারা। সবুজ ধানের ক্ষেতগুলো বৃষ্টিতে ভিজে একাকার।
শাসনতন্ত্রের ওপর যাদের ভরসা, তারা তো মানুষে-মানুষে দেয়াল তুলবেই বাহার, নজরুলের গলাটা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো।
শ্রমিক-কৃষক পেট পুরে খেতে পায় না, আর বড় বড় নেতারা গদিতে বসে ক্ষমতার হিসাব মেলাচ্ছে! এই শৃঙ্খল তো ভাঙতেই হবে।
হবীবুল্লাহ বাহার চুপ হয়ে গেলেন। নজরুলের এই রূপটা তিনি চেনেন। এই মানুষটা যখন কথা বলেন, তখন মনে হয় প্রতিটি শব্দের পেছনে কোনো এক অদৃশ্য বাজনা বাজছে।
ট্রেন ঝিকঝিক শব্দে এগিয়ে চলেছে। বাঁশি বাজিয়ে একসময় ট্রেনটি ঢুকতে শুরু করল ফেনী জংশন স্টেশনে।
বাহার সাহেব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। স্টেশন প্ল্যাটফর্ম লোকে লোকারণ্য! বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ছাতা মাথায়, কেউ বা গামছা মাথায় দিয়ে শয়ে শয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা।
ট্রেনের চাকা থামতেই একদল তরুণ চিৎকার করে উঠল—কাজী নজরুল ইসলাম—জিন্দাবাদ! ইনকিলাব—জিন্দাবাদ!
নজরুল কামরার দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তখনও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। বাতাসের আর্দ্রতায় ভেসে আসছে ফেনী নদীর সোঁদা গন্ধ আর হাজার মানুষের গলার সোচ্চার আওয়াজ।
তিনি একবার হাত তুলে উপস্থিত জনতার দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বাহারের কাঁধে হাত রেখে বললেন, চল বাহার, দেখা যাক তোর ফেনীর মানুষ কতটা পথ হাঁটতে প্রস্তুত!
২
স্টেশন থেকে বের হতেই ভিড় ঠেলে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ল।
ফেনী জংশন স্টেশন চত্বরে তখন সাজসাজ রব। তরুণ আর যুবকদের চোখেমুখে এক অলৌকিক উন্মাদনা। ১৯২৬ সালের এই সময়টায় পুরো ফেনী মহকুমায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ভেতর ভেতরে বেশ ফুটছিল। শহরের অলিগলিতে স্থানীয় জমিদারদের প্রভাব থাকলেও আমজনতার মন কিন্তু জমে থাকা বারুদের মতো শুকিয়ে ছিল—একটুকু আগুনের স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায়।
ইসলামিয়া হাই স্কুলের মাঠটি স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটে গেলে মিনিট পনেরো-কুড়ি।
নজরুলের কাঁধে একটি কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। তিনি ছাতা খুললেন না। গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টিতে ভিজেই হাঁটতে শুরু করলেন। তার ডানপাশে হবীবুল্লাহ বাহার, আর বাঁপাশে স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মী।
রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ টিনের চালের দোকানপট্টি। চায়ের দোকানগুলোতে কাজ বন্ধ করে কেরোসিনের কুপি আর কাপ হাতে মানুষ বের হয়ে এসেছে। কাঠঘাঁটা আর বাজার এলাকার শত শত চোখ স্থির হয়ে আছে ওই বাবরি চুলওয়ালা তরুণটির দিকে।
একজন বয়স্ক লোক লাঠিতে ভর দিয়ে ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ালেন। লোকটার গা খালি, পরনে তালি মারা ময়লা লুঙ্গি। তিনি নজরুলের একদম কাছে এসে ধমকের সুরে বলে উঠলেন, ও হে কাজী কবি! তুমি যে কাগজে লিখছ—স্বরাজ টরাজ বুঝি না ভাই, বুঝি খিদে আর রুটি—এই হকের কথাগুলা কে শুনব শুনি? ডর-ভয় কি একবারে বেচে খাইছ?
নজরুল থমকে দাঁড়ালেন। লোকটির দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
হাসি থামিয়ে প্রবীণ মানুষটির কাঁধে দুটো হাত রেখে একদম কাছ থেকে বললেন, চাচা, ভয় তো পেটে খিদে থাকলে লাগে! যে পেটে খিদে নাই, সে তো বাবুদের ডর পাইবোই। খিদে তো আমাগো বুকের রক্ত গরম রাখে, ভয় পামু কোন দুঃখে?
লোকটি হাঁ করে কবির দিকে তাকিয়ে রইল। তার কিছু বলার আগেই ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে উঠল, কথা তো ভুল কয় নাই! মাটির মানুষের কবি!
ইসলামিয়া হাই স্কুল মাঠে পৌঁছাতেই দৃশ্যপট বদলে গেল।
বিশাল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। হাজার পাঁচেক মানুষ তো হবেই। ফেনী পাইলট স্কুল, ইসলামিয়া স্কুল আর ফেনী কলেজের ছাত্ররা মাঠের সামনের দিকে বসে আছে। শামিয়ানা টাঙানো হলেও গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টিতে কাপড়ের ছাদটা ভিজে ভারী হয়ে ঝুলছে। এক কোণে ছোট একটা কাঠের মঞ্চ।
নজরুল মঞ্চে উঠে একটা কাঠের চেয়ারে বসতেই চারপাশে শ্লোগান উঠল—ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
মঞ্চের একপাশে বসা এক স্থানীয় স্বরাজ দলের নেতা বাহার সাহেবের কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, বাহার, পরিবেশ কিন্তু গরম। মহকুমা শাসকের (SDO) পুলিশ কিন্তু মাঠের পেছনের বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে নজর রাখছে। নজরুল সাহেবকে একটু রয়ে-সয়ে কথা বলতে বোলো। পুলিশ যদি সভা ভেস্তে দেয়, মুশকিল হবে।
বাহার সাহেব একটু চিন্তিত মুখে নজরুলের দিকে তাকালেন। কিন্তু নজরুলের সেদিকে খেয়ালই নেই। তিনি পকেট থেকে দেশলাই বের করে একটা চুরুট ধরালেন।
তৎকালীন নোয়াখালী জেলার এই ছোট্ট মহকুমা শহর ফেনী—যা ছিল মূলত কৃষি আর সীমিত নদী-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল—সেদিনের সেই বিকেলে যেন এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের সাক্ষী হতে যাচ্ছিল। স্থানীয় মানুষ অত্যাচারী জমিদার আর ব্রিটিশ পেয়াদাদের চাপে কীভাবে পিষ্ট হচ্ছিল, সেই যন্ত্রণা তাদের চোখের ভেতরে স্পষ্ট।
হবীবুল্লাহ বাহার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সংক্ষিপ্ত সূচনা বক্তব্য শেষ করে বললেন, এখন আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন—কাজী নজরুল ইসলাম।
পুরো মাঠ একমুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাতাস থমকে গেল যেন।
নজরুল আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। চুরুটটা নিভিয়ে একপাশে রাখলেন। তারপর ধীরপায়ে কাঠের মঞ্চের একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার পরনের খদ্দরের পাঞ্জাবিটা বৃষ্টি আর ঘামে কিছুটা ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে আছে।
তিনি একবার গোটা মাঠের দিকে চোখ বোলালেন। কৃষক, ছাত্র, দিনমজুর, প্রবীণ মাস্টারমশাই—সবার চোখের দিকে তাকালেন।
তারপর কোনো লম্বা ভুমিকা ছাড়াই, গম্ভীর ও মেঘাচ্ছন্ন গলায় বলে উঠলেন—
ফেনীর ভাইয়েরা আমার! আপনারা কি ভাবতেছেন আমি কলকাতা থেকে আপনাদের সাহিত্য শোনাইতে আসছি?
৩
নজরুলের ওই এক বাক্যে পুরো মাঠে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ নেতারা চমকে উঠলেন। বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা পকেট থেকে চট করে খাতা বের করে নোট নেওয়া শুরু করলেন।
নজরুল মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন—
না! আমি সাহিত্য বিক্রি করতে আসি নাই। আমি আসছি আপনাদের বুকের ভেতরের জমে থাকা আগুনটাকে একটু বাতাস দিতে। আপনারা দেখতেছেন না, আপনাদের মাথার ওপর ব্রিটিশের চাবুক কীভাবে ঘুরতেছে? আপনারা দেখতেছেন না, এই যে আপনাদের মাঠের ফসল, আপনাদের রক্ত জল করা ঘাম—সব কেড়ে নিয়ে বড় বড় বাবুরা আর ইংরেজ শাসকেরা ভোজ খাচ্ছে?
মাঠের একদম সামনের সারিতে বসে থাকা তরুণদের বুক যেন গর্জে উঠল।
নজরুল হঠাৎ থেমে গেলেন। আকাশের দিকে তাকালেন। শ্রাবণের কালো মেঘগুলো তখন আরও নিচে নেমে এসেছে। ঠিক যেমন থমথমে দেশের পরিবেশ—যেকোনো মুহূর্তে ঝড় উঠতে পারে।
নজরুল গলা এক পর্দা চড়িয়ে বললেন, আজকে হিন্দু-মুসলিমে দাঙ্গা বাঁধানোর চক্রান্ত হচ্ছে। কলকাতায় ভাই ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙ্গাচ্ছে! কেন? কারণ ইংরেজ জানে, আপনারা যদি হাত ধরাধরি করে দাঁড়ান, তবে তাদের ওই সিংহাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে! ওরা চায় আমরা যেন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে মরি, আর ওরা পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ে।
তিনি ডান হাতটা উঁচিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করলেন।
শুনুন ফেনীর মানুষ! শৃঙ্খল পরানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। যে হাত আপনার অধিকার কেড়ে নেয়, সেই হাত উপড়ে ফেলার সময় আসছে। উঠে দাঁড়ান! শাসক শ্রেণির এই নিদারুণ অত্যাচার আর মেনে নেওয়া যাবে না!
পুরো মাঠে তখন তুমুল করতালি আর উত্তেজনার ঢেউ। মানুষ দাঁড়িয়ে গেছে।
ঠিক তখনই ভিড়ের ভেতর থেকে এক তরুণ ছাত্র চঁচিয়ে উঠল, কাজীদা! শুধু কথা না, গান শুনব! আমাদের গান শোনান!
চারপাশ থেকে একযোগে আওয়াজ উঠল—গান! গান! 'কারার ঐ লৌহকপাট' গান!
নজরুলের ঠোঁটের কোণে আবার সেই পরিচিত খেয়ালী হাসিটা ফিরে এল। তিনি একটুও ইতস্তত করলেন না। হারমোনিয়াম বা তবলা—কিছুরই প্রয়োজন পড়ল না। তিনি দুই হাতে নিজের বুকের ওপর হালকা থাপ্পড় মেরে তাল ঠিক করে নিয়ে সোজা সুর ধরলেন—
কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!...
নজরুলের গলার আওয়াজ যেন কোনো স্বাভাবিক মানুষের গলা নয়—একদম মেঘের গর্জন! মাইক ছাড়াই সেই আওয়াজ মাঠ পেরিয়ে দূরের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ সম্মোহিতের মতো কবির সাথে গলা মেলাতে লাগল। যে মানুষগুলো কিছুক্ষণ আগেও ব্রিটিশ পুলিশের ভয়ে সিঁথিয়ে ছিল, তাদের চোখেমুখে তখন কোনো ভয়ের ছাপ নেই।
পরপর তিনি গাইলেন ওঠ রে চাষী আর দুর্গম গিরি কান্তার মরু।
গান শেষ হতেই পুরো মাঠ এক অভূতপূর্ব শিহরণে কেঁপে উঠল। মানুষ যেন এক নতুন নজরুলকে আবিষ্কার করল—যিনি শুধু কবি নন, যিনি যুদ্ধের দামামা বাজানো এক সেনাপতি।
তখনই পেছন থেকে একজন প্রবীণ শিক্ষক উঠে এসে হাত জোড় করে বললেন, কাজী বাবা, আমাদের একটা শেষ অনুরোধ আছে। আপনি কি 'বিদ্রোহী' কবিতাটা একটু আবৃত্তি করে শোনাবেন না?
নজরুল হাসলেন। মাথা নেড়ে সম্মতি জানানোর জন্য মুখ খুলতে যাবেন, ঠিক তখনই—
আকাশ চিরে এক প্রকাণ্ড বিজলি চমকে উঠল! আর তার পরমুহূর্তেই বিকট শব্দে কড়কড় করে বাজ পড়ল দূরের কোনো এক ধানক্ষেতে।
৪
বাজ পড়ার পর মুহূর্তেই আকাশ যেন থালা উপুড় করে জল ঢালতে শুরু করল।
মুহুর্মুহু বিজলির আলোয় চারদিক আলোকিত হয়ে উঠছে। শ্রাবণের সেই মুষলধারে বৃষ্টিতে শামিয়ানার কাপড় ছিঁড়ে জল পড়তে লাগল সোজা মঞ্চের ওপর। মাঠের মানুষ অবশ্য নড়ল না। ভেজা খদ্দরের কাপড় আর গামছা মাথায় জড়িয়ে শত শত লোক কবির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
নজরুল একবিন্দু সরলেন না। বৃষ্টির ছাঁটে তার বাবরি চুল আর মুখ ভিজে একাকার। পানি গড়িয়ে পড়ছে তার থুতনি দিয়ে।
তিনি দুই হাত ওপরে তুললেন। বৃষ্টির শব্দের তোড়কে ছাপিয়ে, সমস্ত গর্জনকে তুচ্ছ করে তার কণ্ঠস্বর চড়ে গেল একেবারে সপ্তমে—
বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!...
বৃষ্টির জলের সাথে মিশে গেল নজরুলের কবিতা আবৃত্তি। 'বিদ্রোহী'র একের পর এক পংক্তি যখন তার মুখ থেকে আগ্নেয়গিরির মতো বের হচ্ছিল, পুরো মাঠে তখন এক অলৌকিক স্তব্ধতা। বৃষ্টি থামেনি, কিন্তু মানুষের গায়ের রোম খাঁড়া হয়ে গেছে।
আমি মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ,
আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহা-ভীতি, আমি অভিশাপ প্রথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!...
কবিতা শেষ করে নজরুল যখন থামলেন, তখন তিনি হাঁপাচ্ছেন। তার চোখের কোণে জলের ধারা—সেটা বৃষ্টির জল, নাকি অন্য কিছু, তা আলাদা করার উপায় ছিল না।
মাঠ জুড়ে তখন কোনো করতালি নেই, কোনো শ্লোগান নেই। কেবল এক গভীর আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে আছে পুরো ফেনী শহর।
কিন্তু বৃষ্টির তোড় বাড়তেই থাকল। দেখতে দেখতে ইসলামিয়া হাই স্কুলের মাঠের এক হাঁটু পানি জমে যাওয়ার উপক্রম। স্থানীয় নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কবিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
হবীবুল্লাহ বাহার এসে নজরুলের হাত ধরলেন, কাজীদা, আর না! এবার যেতে হবে। ট্রেন মিস হলে কিন্তু আজ আর চট্টগ্রাম ফেরা যাবে না।
নজরুল ভিজে একাকার হয়ে হাসলেন। পকেট থেকে ভিজে যাওয়া পানের বাটাটা বের করে দেখলেন—ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। তিনি খেয়ালী গলায় বললেন, বাহার, তোদের ফেনীর জল কিন্তু বড্ড বেপরোয়া! একদম আমার কবিতার মতো!
বৃষ্টির মধ্য দিয়েই নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হলো ফেনী স্টেশনের উদ্দেশ্যে।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যখন নোয়াখালী থেকে আসা ফিরতি ট্রেনের বাঁশি শোনা গেল, তখন গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টিতে রূপ নিয়েছে রূপালী আকাশ।
কাজী নজরুল ইসলাম ট্রেনের কামরায় উঠলেন। জানালার পাশে বসে তিনি হাত বাড়ালেন বাইরের প্রবীণ শিক্ষক ও তরুণদের দিকে।
হবীবুল্লাহ বাহার ভিজে যাওয়া মুখটা মুছে কবিকে বললেন, কাজীদা, ফেনীর মানুষ কিন্তু আপনাকে সহজে ভুলবে না।
নজরুল জানালার ওপারে তাকালেন। আবছা হয়ে আসা ফেনী শহরের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন—
মানুষ ভুললেও মাটি তো আর ভোলে না রে বাহার! এই মাটিতে আমি আজ যে বীজ বুনে গেলাম, কোনো একদিন এখান থেকেই বিপ্লবের চারা গজাবে। তুই দেখে নিস।
ট্রেন ঝিকঝিক করে চলতে শুরু করল। ১৯২৬ সালের ১ আগস্টের সেই মেঘলা বিকেলে নোয়াখালী জেলার ছোট্ট মহকুমা শহর ফেনী ছেড়ে কবি রওনা হলেন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। তারপর ৪ আগস্ট তিনি ফিরে যাবেন কলকাতায়, সেখান থেকে কৃষ্ণনগরে।
ফেনীতে নজরুলের সেই আসা ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। একটি মাত্র সভাই হয়েছিল তার জীবনে এই মাটিতে।
সময় পেরিয়ে গেছে শত বছর। মহকুমা শহর ফেনী আজ এক পূর্ণাঙ্গ জেলা, বদলে গেছে ইসলামিয়া হাই স্কুলের মাঠের চেহারাও। কিন্তু আজও শ্রাবণের মেঘলা দুপুরে ফেনীর বাতাসে যেন ভেসে বেড়ায় এক বাবরি চুলওয়ালা কবির গমগমে গলা—বল বীর, বল উন্নত মম শির!



পাঠকের মন্তব্য