আমি ভাই নব্বইয়ের দশকের বাচ্চা-কাচ্চা। সেই আমল হইতাছে এনালগ আমল। ডিজিটাল ফান বলতে ছিল বিটিভি আর রেডিও। অপশনেরও কোনো অপশন ছিল না। তাই সেইকালের পোলাপাইনদের মাইন্ডসেটও এনালগ টাইপ ছিল।
বই পড়া, আড্ডা দেওয়া, রাস্তায় রাস্তায় খেলা, শুক্রবারে সিনেমা দেখা… জীবন বলতে ছিল এইগুলোই।
যারা আরও বেশি এনালগ, মানে ঘরমুখী ছিল, তাদের জন্য মাস্ট ছিল বই। আহা হা, এখান থেকে সেখান থেকে বই টুকিয়ে নিয়ে এসে তার মধ্যে নাক-মুখ ডুবিয়ে পড়ে থাকা… এর যে এক্সাইটমেন্ট, তার বোধহয় কোনো তুলনা নাই।
বই নিয়ে নানারকম হাস্যকর অভ্যাসও ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য সেগুলো খুবই সিরিয়াস ছিল। আমার ধারণা, যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, তাদের মধ্যে এই অভ্যাসগুলো কম-বেশি থাকেই।
আসুন, দেখে ফেলি সেইসব অভ্যাসগুলো—
১.
আমাদের হাতে নিজের বই সেসময় খুবই কম হতো। তো আমরা করতাম কী—সারাক্ষণ গোয়েন্দাদের মতো ছোঁকছোঁক করতাম! আশেপাশে কোথায়, কার কাছে, কী বই আছে—সব আমাদের রাডারে ধরা পড়ত।
কারও বাসায় বেড়াতে গেছি—গিয়ে দেখি তাদের বইয়ের বিশাল আলমারি। পুরোটা সময় বইয়ের আলমারির আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। দেখতাম কোনগুলো আমার পড়া আর কোনগুলো পড়তে চাই।
তারপর চলে আসার আগমুহূর্তে খুব কাচুমাচু করে বলতাম, আন্টি, এটা নিয়ে যাই? পড়া হলেই ফিরিয়ে দেব!
ভদ্রতা বড্ড লাভজনক ব্যাপার এই সময়। মুখের ওপর ‘না’ বলতে না পেরে দিয়ে দিতেন।
এমনও হয়েছে, একবারে দশ-বারোটা বই এনেছি। ফিরিয়ে দিয়ে আবার বাকিগুলোও এনেছি।
চলছে গাড়ি, যাত্রাবাড়ী!
২.
আবার কত্ত ভদ্রভাবে বলছি যে ফিরিয়ে দিয়েছি বইগুলো! আমার মতো যারা আছেন, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো—যা এনেছেন, স-ব ফিরিয়ে দিয়েছেন?
শুধু আমাদের না! নামজাদা সব লেখক-সাহিত্যিকদেরও এই দোষ ছিল!
একবার মার্ক টোয়েন তার এক প্রতিবেশীর কাছে একটি বই ধার চাইতে গেলেন। প্রতিবেশী বিশাল কিপটা। তিনি জানালেন,
তুমি অবশ্যই আমার বই পড়তে পারো, তবে তোমাকে আমার লাইব্রেরিতে বসেই পড়তে হবে। কারণ আমি নিয়ম করেছি, আমার কোনো বই এই ঘরের বাইরে যাবে না।
টোয়েন শান্তভাবে বাড়ি ফিরে এলেন।
কিছুদিন পর প্রতিবেশী বাবু মার্ক টোয়েনের বাড়ি আসলেন। তার দরকার ঘাস কাটার যন্ত্রটি! টোয়েন এবার হাসিমুখে বললেন,
অবশ্যই! আমি খুশি হয়ে তোমাকে আমার লনমোয়ার ধার দেব। কিন্তু শর্ত আছে একটা! তোমাকে এটা আমার বাগানে বসেই ব্যবহার করতে হবে। কারণ আমারও একটা নিয়ম আছে। আমার লনমোয়ার কখনো আমার আঙিনা ছেড়ে বাইরে যাবে না!
কী? কেমন?
৩.
ভাই, আমার না ‘বিবলিওসমিয়া’ রোগ আছে! শুনেই ভয় লাগল? রোগটি ছোঁয়াচে ঠিকই, কিন্তু শুধু বইপোকাদের মধ্যে।
নতুন বা পুরোনো যে বই-ই হোক না কেন, বইয়ের পাতায় নাক ডুবিয়ে গন্ধ শোঁকা! কারও নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পছন্দ, তো কারও পুরোনো!
এটাই বিবলিওসমিয়া!
৪.
জাপানি একটা শব্দ আছে—সুন্দোকু! বইপ্রেমীদের অদ্ভুত আরেকটি রোগ!
ঘরে দশ-বিশটা বই ধুলোয় সাহারা মরুভূমি! সেগুলোর দিকে তাকানোও হয়নি। আর আরও বই কিনে এনে এনে স্তুপ বানাচ্ছেন!
মানে বই পড়া হোক বা না হোক, এনে এনে জমাতে হবে। এটাই সুন্দোকু!
শব্দ জাপানের হলে কী হবে—কাজটা সবাই করে। রাম, শ্যাম, যদু-মধুর মতো লর্ড বায়রন, জর্জ অরওয়েল, ডারউইন—এনাদেরও এই রোগ ছিল!
৫.
কোনো একটা বই পড়ছি! ভীষণ ভালো লাগছে। এক ঘণ্টা ধরে ‘আরেকটু পড়েই রেখে দেব, দেব’ করছি। রাত বাজে তিনটা!
হঠাৎ দেখি আব্বা!
কানটা ধরে ঠাস করে একটা চড় মেরে বইটা নিয়ে গেলেন। লাইট বন্ধ হয়ে গেল!
এভাবেই বইপড়া বন্ধ হতো!
আপনাদেরও এই অভিজ্ঞতা আছে নাকি?
৬.
নতুন বই কিনেছি। পড়া শেষ করেছি। ছোট ভাই বইটা পড়বে বলে নিয়েছে। কিছুক্ষণ পর গিয়ে দেখি, বইয়ের কোনা ভাঁজ করে বুকমার্ক দিয়েছে।
ঠাটিয়ে এক চড় মেরে বই নিয়ে চলে এসেছি!
কোনা মুড়ে বুকমার্ক দিস! গর্দভ কোথাকার!
বইয়ের কোনা কোথায়, আমার কলিজাতেই ভাঁজ দিয়েছে!
৭.
আবার ধরেন, ভদ্র রিডার। কোনা ভাঁজ করে না। বুকমার্ক দেয়। আছেও তার অনেক বুকমার্ক।
কিন্তু পড়ার মাঝে হুট করে উঠতে হলে তারা বুকমার্ক খোঁজে না!
বাসের টিকিট, ভিজিটিং কার্ড, টাকার নোট, চিপসের প্যাকেট, এমনকি মাথার ক্লিপ দিয়ে পাতা মার্ক করে রাখে!
দেখেছেন নাকি এমন?
৮.
কোনো বই থেকে মুভি বানানো হয়েছে। বইটা খুবই পছন্দের আমার। মুভিটা গিয়ে দেখলাম। কক্ষনোই পছন্দ হবে না!
থিয়েটার থেকে বের হয়েই বিচারকের মতো নাক উঁচু করে বলতে হবে,
হুঁ, কিন্তু বইটা অনেক ভালো ছিল! অনেক ডিটেইল বাদ দিয়েছে।
ইটস আ মাস্ট!
আজ বইপ্রেমীদের দিন!
বইপড়া একটা নেশা। একমাত্র ভালো নেশা।
যাদের নেশাটি নেই, ধরে ফেলুন!
আর যাদের আছে, তারা এই অভ্যাসগুলো সহই নেশা করুন!



পাঠকের মন্তব্য