মানুষ জাতটা বেশ অদ্ভুত। এরা বিমানে ওঠার আগে তিনবার সুরক্ষার নিয়মকানুন শোনে, আবার পকেটে এমন একটা মোড়ক নিয়ে ঘোরে যার ওপর পরিষ্কার অক্ষরে লেখা—এই বস্তুটি জীবন শেষ করে দিতে পারে। মৃত্যু জিনিসটা বেশ ভারী, কিন্তু সেই ভারী সত্যটাকে প্যাকেটের গায়ে সাঁটিয়ে দিয়েও যে তামাক ব্যবসা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দিব্যি টিকে আছে, তার পেছনের ইতিহাসটা বেশ চতুর।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল না। ভদ্রসমাজের মানুষ তখন চুরুট কিংবা পাইপ ফুঁকতেন, আর সিগারেটকে মনে করা হতো ছোকরাদের বাউন্ডুলেপনার অনুষঙ্গ। সব হিসাব ওলটপালট করে দিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পরিখার কাদা-জলে আটকে থাকা সৈনিকদের মানসিক স্বস্তি দিতে বিনামূল্যে বিলি করা হলো সিগারেট। বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ধোঁয়ার ছোট ছোট টান সৈন্যদের কাছে হয়ে উঠল বেঁচে থাকার সাময়িক আশ্রয়। যুদ্ধ শেষে যখন তারা বাড়ি ফিরলেন, ততদিনে এই আপাত-নির্দোষ কাঠিটা সমাজের রক্তে মিশে গেছে। এরপর হলিউডের চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকারা ঠোঁটের কোণে ধোঁয়া উড়িয়ে একে বানিয়ে তুললেন আভিজাত্য আর স্টাইলের প্রতীক। ১৯৪৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই ধোঁয়ার মোহে আটকে যান।
কিন্তু ফুসফুস বিজ্ঞাপনের ভাষা কিংবা সেলুলয়েডের গ্ল্যামার বোঝে না। ১৯৫০-এর দশক থেকে যখন হৃদরোগ আর ক্যান্সারের পারদ দ্রুত ওপরের দিকে উঠছিল, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান আঙুল তুলল এই সাদা কাঠির দিকে। অবশেষে ১৯৬৪ সালে মার্কিন সার্জন জেনারেল লুথার টেরি হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ বিশ্লেষণ করে একটি ঐতিহাসিক রিপোর্ট প্রকাশ করলেন। তাতে পরিষ্কার ভাষায় জানানো হলো—সিগারেটের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সার ও অকালমৃত্যুর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে।
তামাক কোম্পানিগুলোর সাজানো বাগান কেঁপে উঠল। শুরু হলো ওয়াশিংটনের অলিন্দে বিশাল লবিং আর প্রচারকৌশল। তবুও সরকারের ওপর জনস্বাস্থ্যের চাপ ঠেকানো গেল না। ১৯৬৫ সালে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হলো Federal Cigarette Labeling and Advertising Act। ১৯৬৬ সাল থেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে বাধ্যবাধকতা এলো একটা বাক্য লেখার: Caution: Cigarette smoking may be hazardous to your health।
কোম্পানিগুলো শুরুতে আইন রুখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেও, তারা দ্রুত বুঝে গেল—এই সতর্কবার্তা আসলে তাদের জন্য এক বিশাল আইনি ঢাল। ভবিষ্যতে কোনো ক্যান্সার রোগী যদি আদালতে গিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করে, তবে কোম্পানিগুলো সহজেই বলতে পারবে, আমরা তো আগেই সতর্ক করেছিলাম, ভোক্তা জেনে-বুঝেই এই ঝুঁকি নিয়েছেন।
কালক্রমে লেখা থেকে ছবির যুগে পদার্পণ ঘটল। ২০০১ সালে কানাডা প্রথম প্যাকেটের গায়ে পচে যাওয়া দাঁত ও কালো হয়ে যাওয়া ফুসফুসের বীভৎস ছবি ছাপানো শুরু করে। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার () নির্দেশে বিশ্বজুড়ে গ্রাফিক ওয়ার্নিং বা ছবিসহ সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালের আইন সংশোধন করে ২০১৬ সাল থেকে প্যাকেটের ওপরের ৫০ শতাংশ অংশে গ্রাফিক সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়। তামাক কোম্পানিগুলো প্রথমে চতুরতার সাথে ছবিগুলো প্যাকেটের নিচের অংশে ছেপেছিল যেন হাত দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু আদালতের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত তা ওপরের অংশেই নিয়ে আসতে হয়।
আইন হলো, সতর্কবার্তা জোরদার হলো, প্যাকেটের ছবি আরও বীভৎস হলো—কিন্তু আশ্চর্য বিষয়, তামাকের সাম্রাজ্য কিন্তু ভেঙে পড়ল না। প্রতিদিন সকালে কোটি কোটি মানুষ সেই একই প্যাকেটের দিকে তাকিয়েই পকেট থেকে টাকা বের করতে থাকল। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সচেতন মানব মস্তিষ্ক কেন এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে চলেছে, সেই উত্তর লুকিয়ে আছে পরের পর্বে।
২
সতর্কবাণী চালু হওয়ার পর তামাক কোম্পানিগুলোর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাজারের সমীকরণ অত সরল ছিল না। মোড়কের গায়ে ক্যান্সার বা মৃত্যুর ছবি দেখে নতুন বা সচেতন কিছু মানুষ অবশ্যই পিছিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তামাকের ব্যবসা তাতে মুখ থুবড়ে পড়েনি। বিশ্বজুড়ে কড়া আইন, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা এবং প্যাকেটে বীভৎস ছবি আসার পরেও ধূমপানের চাহিদা পুরোপুরি না কমার পেছনে ছিল তামাক প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত চতুর কিছু ব্যবসায়িক কৌশল।
প্রথমত, সিগারেট কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়; এটি একটি উচ্চমাত্রার শারীরিক ও মানসিক আসক্তিকর দ্রব্য। তামাক কোম্পানিগুলো খুব ভালো করেই জানত যে, তাদের মূল ক্রেতারা একবার নিকোটিনের ফাঁদে পা দিলে সামান্য কাগজে লেখা ভয় দেখিয়ে তাদের আটকে রাখা অসম্ভব। সতর্কবার্তা যত বড়ই হোক না কেন, আসক্ত শরীরের কাছে তার গুরুত্ব কম। দ্বিতীয়ত, সতর্কবার্তার ধাক্কা সামলাতে তারা তাদের মার্কেটিং কৌশলে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। সরাসরি বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে গেলে তারা কৌশলে 'লাইট', 'মিল্ড' কিংবা 'ফিল্টার' যুক্ত সিগারেটের ধারণাকে বাজারে জনপ্রিয় করে তোলে। ভোক্তাদের বোঝানো হতে থাকে যে, এসব সংস্করণে ক্ষতির পরিমাণ কম—যা ছিল মূলত এক ধরণের ছদ্ম-সুরক্ষার মানসিক আশ্বাস।
এছাড়া কোম্পানিগুলো তাদের মনোযোগ স্থানান্তরিত করতে শুরু করে। উন্নত দেশগুলোতে যখন কড়াকড়ি ও কর বহুগুণ বেড়ে গেল, তখন তারা উন্নয়নশীল ও এশীয়-আফ্রিকান দেশগুলোর বিশাল বাজারকে লক্ষ্য বানাল। সেখানে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন তখনও ঢিলেঢালা ছিল। পাশাপাশি, সরকারের কর নীতি ও মূল্যের হেরফের ঘটিয়ে তারা সব শ্রেণির ক্রেতার জন্য বাজারের দরজা খোলা রাখল। সস্তা ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড—সব স্তরেই সরবরাহ বজায় রাখা হলো যাতে অর্থনীতি বা আইনি চাপ ব্যবসায় বড় ধস নামাতে না পারে।
তামাক শিল্প খুব চতুরতার সাথে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সতর্কবার্তার প্রভাবকে যতটা সম্ভব স্তমিত করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। অনেক দেশে সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি মামলা লড়ে সতর্কবার্তার আকার ছোট রাখা বা প্যাকেটের নিচে ছাপানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। এমনকি প্যাকেটে বীভৎস ছবি দেওয়ার পর তারা সুন্দর সিগারেটের কেস, লাইটার বা আকর্ষণীয় আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের ব্যবহার জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছে, যাতে মূল প্যাকেটের ভয়টা মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। অর্থাৎ, আইন মেনে চলার নাটক বজায় রেখেও কীভাবে ব্যবসার মুনাফা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়, তামাক কোম্পানিগুলো সেই শিল্পে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিল।
তবে শুধু কর্পোরেট চালবাজি দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে দিনের পর দিন এই বিষ গিলে খাওয়ানো সম্ভব ছিল না। তামাক শিল্পের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে মানব মস্তিষ্কের জটিল মনস্তত্ত্ব ও রাসায়নিক দুর্বলতা। প্যাকেটের গায়ের মৃত্যু পরোয়ানা দেখেও কেন মানুষের হাত পকেটের দিকেই যায়, সেই জটিল সাইকোলজির রসায়ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে শেষ পর্বে।
৩
সতর্কবার্তা কাজ না করার সবচেয়ে বড় রহস্যটা লুকিয়ে আছে মানুষের মাথার খুলির ভেতরে। যুক্তিবাদী মানুষ জেনেশুনে বিষ খায় না—এই ভুল ধারণাই আমাদের মূল সমস্যা। মানব মস্তিষ্ক যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আবেগ, আসক্তি আর আত্মরক্ষামূলক অজুহাত দিয়েও চালিত হয়। তাই প্যাকেটের গায়ে কালচে ফুসফুস বা পচে যাওয়া দাঁতের ছবি দেখার পরেও যখন একজন ধূমপায়ী পকেট থেকে লাইটার বের করেন, তখন তাঁর মনের গভীরে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষা ব্যবস্থা একসাথে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রথম ধাক্কাটা দেয় নিকোটিন নিজে। সিগারেট টানার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের এক রাসায়নিক তরঙ্গ খেলে যায়, যা মানুষকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও আনন্দ দেয়। মানুষের মস্তিষ্ক তৈরিই হয়েছে তাৎক্ষণিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় টেম্পোরাল ডিসকাউন্টিং । অর্থাৎ, আজকের চার মিনিটের মানসিক স্বস্তি বা ডোপামিন রিলিজ মনের কাছে এতই বাস্তব মনে হয় যে, বিশ বছর পরের ক্যান্সার বা মৃত্যুর হুমকিটা সেই মুহূর্তে অতি দূরবর্তী ও অবাস্তব এক রূপকথা বলে মনে হয়।
এরপরই আসে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স বা মনের দ্বন্দ্ব কাটানোর খেলা। যখন মানুষ দেখে তার আচরণ (ধূমপান করা) আর তার জ্ঞান (ধূমপান ক্ষতিকর) পরস্পরের বিরোধী, তখন মনে এক তীব্র অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। মানুষ তার এই অস্বস্তি দূর করতে নিজের আচরণ না বদলে বানিয়ে নেয় অবচেতন কিছু অজুহাত—আমি তো কম খাই, আমার নানা নব্বই বছর বেঁচে ছিলেন রোজ এক প্যাকেট ফুঁকেও, কিংবা চারপাশের দূষণে এমনিতেই মরব, সিগারেটে কী আর হবে!" এই আত্মপ্রবঞ্চনা তাকে প্যাকেটের ভয় থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
প্রতিদিন একই ভয়াবহ ছবি দেখতে দেখতে মস্তিষ্কে ঘটে যায় 'হ্যাবিচুয়েশন' বা অভ্যস্ততা। প্রথম দিন যে ছবিটা দেখে বুক কেঁপে উঠেছিল, দশম দিনে এসে সেই ছবিটা শুধুই একটা প্রিন্ট করা নকশা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। অনেকে আবার মনস্তাত্ত্বিক এড়িয়ে চলার পথ বা 'এভোয়ডেন্স' বেছে নেন—প্যাকেটটা উল্টো করে টেবিলে রাখা, একটা সুন্দর কভারে প্যাকেট ঢেকে ফেলা কিংবা লাইটার দিয়ে ছবির অংশটা আড়াল করার চেষ্টা করেন। আবার কিছু মানুষের ভেতরে কাজ করে 'রিঅ্যাক্টেন্স' বা এক ধরনের অবাধ্যতা; সরকার বা সমাজ যখনই অতিরিক্ত আদেশ দিতে শুরু করে, তখন মানুষ স্বাধীনতা প্রমাণের তাড়নায় উল্টো সেই নিষিদ্ধ কাজটিই আরও আঁকড়ে ধরে।
সবশেষে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেলফ-ইফিকেসি বা ছাড়ার আত্মবিশ্বাসের অভাব। অধিকাংশ ধূমপায়ীই জানেন যে এটি ক্ষতিকর এবং তাঁরা ছাড়তে চান। কিন্তু প্যাকেটের গায়ের ভয় দেখানোর ছবি তাদের ভেতরে অতিরিক্ত উদ্বেগ তৈরি করে। এই উদ্বেগ কমানোর কোনো সহজ উপায় হাতের কাছে না পেয়ে, তারা সেই উদ্বিগ্নতা বা স্ট্রেস কাটাতেই আবার উল্টো একটা সিগারেট ধরিয়ে বসেন—ভয় থেকেই আবার ভয়ের উপাদানের দিকে ছুটে যাওয়া এক আশ্চর্য ও বিষাদময় চক্র।
সুতরাং, সিগারেটের ওপর সতর্কীকরণ একটা তথ্য বটে, কিন্তু অভ্যাসের দেওয়াল ভাঙার জন্য তা যথেষ্ট নয়। মানুষকে একটা ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে সরিয়ে আনতে হলে শুধু ভয়ের গল্প শোনানো যথেষ্ট নয়; তার জায়গায় চাই শক্তিশালী বিকল্প, সঠিক মানসিক চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা এবং কার্যকর দাম নিয়ন্ত্রণের মতো সমন্বিত প্রয়াস। বিজ্ঞানের তথ্য মানুষকে জানানো সম্ভব, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ এড়িয়ে সেই তথ্যকে জীবনে প্রয়োগ করার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের চিন্তাভাবনার ওপরই নির্ভর করে।



পাঠকের মন্তব্য