মফস্বল শহরের দুপুরগুলো বড় অদ্ভুত হয়। চারদিক খাঁ খাঁ করে, পিচঢালা রাস্তা থেকে গরম বাতাস ওড়ে। ঠিক এমনই এক অলস দুপুরে, আজ থেকে বছর এগারো আগে, এক অতি সাধারণ সুরকার, যার নাম নাড়ুগোপাল চক্রবর্তী, খাতা-কলম নিয়ে বসলেন। তিনি কোনো জটিল দর্শনের বই লেখেননি, রূপবতী কোনো রাজকন্যার গল্পও ফাঁদেননি। তিনি চোখ বন্ধ করে শুধু একটা দৃশ্য কল্পনা করলেন।
একটা কালো রঙের হিরো সাইকেল ধুলো উড়িয়ে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে যাচ্ছে। সামনে একটা লোহার শক্ত রড, যেটাতে বসলে হাড়গোড় ব্যথা হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ এক রূপবতী তরুণী সেখানে বড্ড নিশ্চিন্তে বসে আছে। তরুণীর ওড়নাটা চাকার স্পোকে লেগে যাওয়ার মতো ওড়ো ওড়ো করছে, আর যুবকটি আনন্দের চোটে সমানে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছে।
তিনি কাগজটায় লিখলেন, তোকে রডে বসিয়ে বেল বাজাবো, তুই হেলান দিবি আমার কোলে...।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি অত্যন্ত চটুল, গ্রামীণ এক প্রেমের গান। কিন্তু জগৎসংসারের সব সহজ কথার আড়ালেই তো লুকিয়ে থাকে এক গভীর রহস্য। একটু মন দিয়ে ভাবলেই বোঝা যায়, গানটির এই শরীরী শব্দের ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে এক পরম আধ্যাত্মিক দেহতত্ত্ব। আমাদের এই নশ্বর শরীরটাই তো এক জং-ধরা কালো সাইকেল। আর সামনের ওই লোহার শক্ত রড? ওটি হলো এই পৃথিবীর মায়া এবং মানুষের আদিম মেরুদণ্ড, যা সমস্ত কামনা-বাসনাকে এক সুতোয় ধরে রাখে। যখনই সাইকেলের বেলটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে ওঠে, তখন অবচেতন মন চট করে জেগে ওঠে। মানুষ চমকে উঠে ভাবে, এই শব্দ তো সাইকেলের নয়, এ তো জীবনেরই ঘণ্টাধ্বনি!
গ্রাম্য ভাষার এই সহজ লিরিকটার মধ্যে কোনো জটিল কবিত্ব ছিল না। খুব সরাসরি বলা হলো, মেয়েরা ভালোবাসলে পুরুষের বুকে একটু হেলান দিতে চায়, একটু নিরাপত্তা খোঁজে। আর পুরুষ চায় সেই ভরসার মানুষটাকে সঙ্গে নিয়ে চেইন-পড়া এই সংসারের রাস্তায় প্যাডেল মারতে মারতে অনন্তকালের দিকে চলে যেতে। ২০১৫ সালের দিকে যখন এই গানটি প্রথম রেকর্ড করা হলো, তখন কেউ ভাবেনি, এই অতি সাধারণ দৃশ্যটা একদিন লক্ষ মানুষের মনের ভেতর একটা অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করবে। গ্রামীণ মেলা, জিলাপির দোকান আর ধুলোবালির রাস্তা পেরিয়ে এই সুর যে একদিন অলৌকিক এক যাত্রার শুরু করবে, তা সেই দুপুরে গানটি লেখার সময় স্রষ্টা নিজেও হয়তো আঁচ করতে পারেননি।
২
জগতে কিছু মানুষ আসেন, যাদের গলাটা ঈশ্বর নিজে অন্য কোনো উপাদান দিয়ে তৈরি করে দেন। প্রথম যিনি গানটি বেঁধেছিলেন, তাঁর সেই রূপবতী সাইকেলটা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ মেলার এক কোণায়, জিলাপি আর নিমকির দোকানের ধুলোবালির মধ্যে পড়ে ছিল। সাধারণ মানুষ গানটি শুনত, একটু হাসত, ব্যস, ওই পর্যন্তই। কিন্তু একদিন এক উদাসীন বাউল সাধক তাঁর জটপাকানো চুল আর কাঁধের ঝোলা নিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতের একতারাটায় একটা মৃদু টোকা দিলেন। ব্যস, চারপাশের বাতাস যেন এক লহমায় ভারী হয়ে উঠল।
তিনি যখন তাঁর সেই অতিপ্রাকৃতিক, উদাত্ত গলায় টান দিলেন, আয় সজনি, চড়বি আমার হিরো সাইকেলে।
তখন সেই সুর যেন মাটির দেয়াল ভেদ করে আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। মানুষের অবচেতন মন বড়ই বিচিত্র। সে সবসময় এমন কিছু খোঁজে, যা তাকে এক নিমেষে খুব চেনা কোনো শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আধুনিক মানুষেরা হলে হয়তো এই গানের তুমুল জনপ্রিয়তার পেছনে অনেক জটিল মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি দাঁড় করাতেন। তারা বলতেন, যান্ত্রিক জীবনের ভণ্ডামি আর জটিলতার মাঝে এই গানটি মানুষকে এক অদ্ভুত মুক্তি দেয়।
ইউটিউব নামের এক জাদুকরী বাক্সের মাধ্যমে গানটি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। যে আধুনিক তরুণ-তরুণীরা শহরের দামি রেস্তোরাঁয় বসে কফি খায়, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে ঘোরে, তারাও হঠাৎ কেমন যেন উদাস হয়ে এই গান শুনতে লাগল। স্ক্রিনের পিক্সেল ভেদ করে গানটি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে গিয়ে লাগল। তারা চোখ বন্ধ করে আবিষ্কার করল, তারা আসলে ওই সাইকেলের রডে বসা সহজ, নিস্তরঙ্গ জীবনটাই চেয়েছিল। যেখানে প্রেম মানে কোনো দামি উপহারের আদান-প্রদান ছিল না, প্রেম মানে ছিল বিকেলে প্রেমিকার ওড়না বাঁচিয়ে সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে হাওয়া খেতে যাওয়া।
পরবর্তীতে আরও অনেকেই গানটি নতুন করে গেয়েছেন, মেলা আর উৎসবের মঞ্চ মাতিয়েছেন। কিন্তু একতারার সেই জাদুকর গানটিকে যে অপার্থিব এবং মায়াবী উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা সত্যিই এক বিস্ময়। দিনশেষে গানটি আমাদের কানে কানে বলে দিয়ে যায়, মানুষের জীবনটা বড্ড ছোট আর গোলমেলে। তার চেয়ে চলো, সমস্ত জটিলতা ভুলে একটা সাইকেলের রডে বসে অন্তত কয়েকটা বেল বাজিয়ে আসি।



পাঠকের মন্তব্য