শোনেন, দুনিয়ার সব কিছুই হঠাৎ। জন্মটা হঠাৎ, মৃত্যুটা হঠাৎ। মাঝখানে এই যে গান গাইতে মনে চওয়া, এটাও চরম একটা হঠাৎ। আরাফাত মহসিন যখন স্টুডিওর চার দেয়ালের ভেতর হেডফোন কানে দিয়া রিজভীরে বলতেছে, শুরু কর, তখন রিজভী কিন্তু গায় নাই। রিজভী তখন যাপন করছে। এই যে শুরুতে বলল না—হঠাৎ কইরি একটা গান গাতি মনে কচ্ছে, এইটা কোনো লিরিক্স না মিয়া, এইটা হইলো একটা জ্যান্ত মানুষের ক্যাজুয়াল স্বীকারোক্তি।
গোলাপীর কথা মনে পড়া মানে কী? গোলাপী কি স্রেফ একটা রঙ? নাকি কারো গালের টোল? গোলাপী হইলো একটা মায়া। সেই মায়ার ওপর দাঁড়ায়ে যখন রিজভী বলে, শরিফুদ্দিন ভাইর কথাও মনে পড়ি গেল, তখন সেইটা আর গান থাকে না; সেইটা হইলো একটা জেনারেশনের সেলাম। শরিফুদ্দিন ভাই যখন ২০০০ সালের দিকে ক্যাসেট প্লেয়ার কাপাইতেন, তখন প্রেম ছিল সস্তা দরের সয়াবিন তেলের মতো খাঁটি। এখনকার মতো ডিজিটাল ভেজাল ছিল না। রিজভী আর আরাফাত সেই পুরনো তেলের বোতলে নতুন ছিপি লাগাইছে মাত্র।
আর এই যে বলতেছে, ভুল হয়ে গেলে মাফ করি দিয়েন, এইটা হইলো বিনয়। মডার্ন মিউজিকের কম্প্রেসড সাউন্ডের ভেতরে এই গ্রাম্য বিনয়টুকু গুঁজে দেওয়াটাই আসল কারিগরি। কেন দিল? কারণ গানটা ছিল, 18 অল টাইন দৌড়ের উপর টেলিফিল্মের। ১৮ বছর বয়সে মানুষের পা মাটিতে থাকে না, মন থাকে দৌড়ের ওপর। সেই দৌড়াইতে থাকা পোলাপানদের যখন আপনি হুট করে থামায়া দিয়ে বলবেন, শোনেন, একটা ভুলভ্রান্তি ওয়ালা গান শুরু করলাম, তখন তারা থমকায়ে দাঁড়াবেই।
আসল খেলাটা হইলো কানেকশনে। শরিফুদ্দিন ভাইয়ের সেই সিগনেচার সুর যখন সিন্থেসাইজার আর ইলেকট্রিক বিটের ওপর আছাড় খায়, তখন ওল্ড স্কুল আর নিউ স্কুলের মাঝখানে একটা ব্রিজ তৈরি হয়। ওই ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে দেখা যায়, লাল গোলাপী আসলে কোনো ব্যক্তি না, লাল গোলাপী হইলো আমাদের হারায়া যাওয়া সেই সব বিকেল, যখন একটা সিডি প্লেয়ার মানেই ছিল পুরো রাজত্ব।
২
মানুষ যখন বলে তুমি বন্ধু হইলে আমার নাইতো কিছু বাকি চাওয়ার, এইটা হইলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ইলিউশন, বুঝলেন? মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নাই, অথচ গানটার ভেতরে শরিফুদ্দিন ভাই কী অবলীলায় একটা সুখের সংসারের খসড়া বানায়া ফেললেন। সুরের ভেতরে এমন একটা ভরসা ছিল যে, ঢাকার জ্যামে জরাজীর্ণ বাসে ঝুলে থাকা কোনো এক মফস্বলি যুবকও ভাবত, একটা লাল গোলাপী পাইলে আসলেই বোধহয় জীবনটা সেট!
আরাফাত মহসিন যখন এই অরিজিনাল ফোক-পপ ট্র্যাকটাকে নিয়া স্টুডিওতে বসলেন, তিনি আসলে একটা টাইম মেশিন বানাইছেন। অনিক ফয়সালের সেই সহজ সুরটাকে আধুনিক ড্রামস আর সিন্থের বেইজের ওপর এমনভাবে আছাড় দেওয়া হইলো, যাতে ওই য অল টাইম দৌড়ের ওপর থাকা জেনারেশন, যারা জিপিএ ফাইভ, প্রেম আর ক্যারিয়ারের পেছনে অবিরাম চিল্লাইয়া দৌড়াচ্ছে—তারা যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। এই গানটা হইলো একটা ব্রেক পেডাল।
রিজভী যখন গাইল তোমারে পাইলে সখী... এসো এসো বুকে রাখবো তোরে, তখন ওই আধুনিক সাউন্ডের পেছনেও শরিফুদ্দিন ভাইয়ের সেই মফস্বলি বাউলিয়ানা আত্মাটা ঠিকই উঁকি দিচ্ছিল। এইটাই হইলো আসল খেলা। নতুন প্রজন্ম ভাবল তারা একটা কুল, ট্রেন্ডি গান শুনতেছে; আর আমাদের মতো পুরনো পাপীরা চোখ বন্ধ কইরা তরঙ্গা ইলেকট্রো সেন্টারের সেই ক্যাসেটের ফিতাটার গন্ধ পাইল। এক টিকিটে দুই সিনেমা!
আসলে ও বন্ধু লাল গোলাপি কোনো গান না, এইটা একটা যূথবদ্ধ দীর্ঘশ্বাস। যখন গানের একদম শেষে গিয়ে মিউজিকটা থামে, তখন শ্রোতার মনে হয় সে এতক্ষণ কোনো স্টুডিও ট্র্যাক শুনে নাই, সে আসলে কোনো এক গলির মোড়ের চা দোকানে বসে তার এক ভাঙা-চোরা বন্ধুর অকপট আড্ডা শুনছিল। মন তো কয় শুরু করতে আবার ভয় ভয় করে, এই ভয়টাই তো জীবন, মিয়া। আর এই ভয়ের ওপর দাঁড়ায়াই যখন বিটটা ড্রপ করে, তখন মনে হয়, ধুর ব্যাটা জীবন তো একটাই—চলো, আবার দৌড়ের ওপর থাকা যাক!



পাঠকের মন্তব্য