লন্ডনের রাতগুলো বড় অদ্ভুত হয়। বিশেষ করে যখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, আর রাস্তাগুলো ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ভিজে থাকে। সেই রকমই এক নিঝুম রাতে, বাঙালি-অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের একটা ছোট্ট, স্যাঁতসেঁতে স্টুডিও রুমে আলো জ্বলছিল। টেবিলভর্তি তার, মিক্সিং কনসোল, আর কম্পিউটারের মনিটরে জ্বলজ্বল করছে অডিও ওয়েভ। হাবীব নামের সেই তরুণ তখন এক ঘোরলাগা মানুষ। পড়াশোনা করছেন অডিও ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে, মাথায় পশ্চিমা পপ আর হিপহপের বিট। কিন্তু অবাধ্য মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছে বাংলাদেশে, বাবার (ফেরদৌস ওয়াহিদ) সেই পপ মিউজিকের সোনালি দিনগুলোতে। হাবীবের মনে হলো, পশ্চিমা দুনিয়ার এই সিন্থেসাইজার আর ড্রাম মেশিনের যদি একটা আত্মা থাকত, তবে সেই আত্মাটা হতো বাংলার কোনো বাউল সাধকের।
তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলেন। কম্পিউটার স্ক্রিনে একটা লুপ তৈরি করলেন—যেটার রিদম একেবারেই ওয়েস্টার্ন ক্লাব মিউজিকের মতো, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একতারার এক অদ্ভুত দোলা। সুর রেডি, কম্পোজিশন রেডি, কিন্তু মূল জাদুটাই বাকি। একটা জ্যান্ত কণ্ঠ চাই। ঠিক তখনই একদিন স্টুডিওর দরজায় এসে দাঁড়ালেন কায়া। দিনের বেলা যিনি লন্ডনের ব্যস্ত রেস্তোরাঁয় হাড়ি-পাতিল আর খরিদ্দার সামলান, যার জীবনের সঙ্গে গানের কোনো পেশাদারি সম্পর্কই নেই। হাবীব তাঁকে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। হেডফোনটা কানে নিতেই কায়ার চোখদুটো কেমন যেন বদলে গেল। লন্ডনের শীত উধাও হয়ে গেল, ঘরের ভেতর যেন বয়ে এলো সুরমা আর কুশিয়ারা নদীর চরের চৈত্রসংক্রান্তির হাওয়া। কায়া বুক ভরে শ্বাস নিয়ে গেয়ে উঠলেন, ময়ূর বেশেতে সাজুইন রাধিকা...। কণ্ঠের সেই সিলেটি মাটির টান আর হাবীবের সাউন্ড ইন্টারফেসের ওয়েস্টার্ন কম্বিনেশন। ব্যস, ইতিহাস ওখানেই লেখা হয়ে গিয়েছিল।
২০০৩ সালের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় মাথাদের গা শিউরে ওঠে। ‘একতার মিউজিক’ থেকে যখন ক্যাসেটটা বাজারে এলো, তখন কোনো প্রমোশন ছিল না, কোনো রাজকীয় ব্যানার ছিল না। কিন্তু কী এক জাদুবলে এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকার নিউমার্কেট থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান, সব জায়গায় শুধু ওই একটাই শব্দ বাজতে লাগল: ফুলে পাইলা ভ্রমরা। যে তরুণরা এতকাল লোকগান শুনলে ভাবত, ধুর, এসব তো বুড়োদের গান, তারা হঠাৎ আবিষ্কার করল, গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে ফুল ভলিউমে এই গান না বাজালে তাদের ‘কুলনেস’ প্রকাশ পায় না। এটি কেবল একটা গান ছিল না, এটি ছিল দুই প্রজন্মের মেলবন্ধন। ড্রয়িংরুমে বসে বাবা আর ছেলে একসঙ্গে মাথা দোলাচ্ছেন, এমন দৃশ্য বাংলাদেশে খুব কমই দেখা গেছে।
সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো এই গানের ভেতরের আধ্যাত্মিক রহস্য। আরকুম শাহ যখন গানটা লিখেছিলেন, তিনি কিন্তু কোনো পার্থিব প্রেমের গল্প বলেননি। বাউল তত্ত্বে রাধা হলো মানুষের দেহ বা আত্মা, আর কৃষ্ণ হলো সেই পরমাত্মা বা ঈশ্বর। পরমাত্মা যখন আত্মার কুঞ্জে এসে ধরা দেন, তখনই ভেতরের বাসরঘরটা উজালা বা আলোকিত হয়ে ওঠে। হাবীবের সেই ইলেকট্রনিক বিটের পেছনে আসলে লুকিয়ে ছিল এক শতাব্দী-পুরোনো এক আধ্যাত্মিক হাহাকার। মানুষ হয়তো না বুঝেই নেচেছে, কিন্তু সুরের ভেতরের সেই ঈশ্বরীয় আনন্দ ঠিকই সবার মন ছুঁয়ে গেছে।
সময় তো আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। দেখতে দেখতে বাইশ-তেইশটা বছর পার হয়ে গেল। ক্যাসেটের ফিতা ছিঁড়ে যাওয়ার দিন শেষ হলো, সিডির গায়ে স্ক্র্যাচ পড়ার যুগও চলে গেল। পৃথিবী এখন ডিজিটাল স্ট্রিমিং এর যুগে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আজও যদি কোনো কনসার্টে হাবীব স্টেজে উঠে কিবোর্ডে ওই পরিচিত রিফটা তোলেন, পুরো স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। একবিংশ শতাব্দীর ল্যাপটপ জেনারেশনও ঠিক একই উন্মাদনা নিয়ে গায়, কৃষ্ণ দিলায় রাধার গলে, বাসর হইল উজালা...।
কায়া হয়তো এখনো লন্ডনের কোনো এক কোণায় নিজের মতো করে জীবন কাটাচ্ছেন, হাবীবের মিউজিক স্টুডিওর সাউন্ড ইকুইপমেন্টগুলো হয়তো বদলে গিয়ে আরও অনেক আধুনিক হয়েছে, কিন্তু তাঁদের সেই বৃষ্টিভেজা লন্ডনের রাতের ম্যাজিকটা আজও বাংলার আকাশে-বাতাসে ঠিক আগের মতোই ভাসছে।



পাঠকের মন্তব্য