দ্বিতীয় পর্ব
নতুন বাংলাদেশ মানে এমন এক বাংলাদেশ; যেখানে যে কোনো বিষয়ে আলোচনা হবে; পরস্পর পরস্পরের প্রতি অপমানসূচক কোনো শব্দ না বলে। সভ্য নাগরিক সমাজ সেটাই; যেখানে কেউ কাউকে তুচ্ছ করে কোনো কথা বলে না।
আমাদের সমাজে ইসলামপন্থীদের ছাগু, জঙ্গি, রাজাকার, আল বটর, পাকিপন্থী ইত্যাদি গালি দেওয়া হয়। আর হিন্দুত্ববাদীদের চাড্ডি, মালাউন, বাল বটর, রেন্ডিয়ার দালাল ইত্যাদি গালি দেওয়া হয়। একটু পড়ালেখা শিখে যারা সবুজ লুঙ্গি খুলে জিনস ও টি শার্ট পরতে শিখেছে; ইউভাল নোয়াহ হারারির বই পড়েছে, ইদানিং অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্মের অর্থ বুঝতে শিখছে; যাদের বাবার থুতনিতে দাড়ি আছে অথবা কপালে চন্দনচর্চিত, মা বোরখা পরে কিংবা কপালে সিঁদুর দিয়ে ধর্মীয় চিহ্ন বহন করে; তাদেরই অতি দ্রুত লিবেরেল সাজতে ধর্মপ্রাণ মানুষকে গালি দিয়ে সুপিরিয়র সাজতে হয়। কারো ডিএনএ–তে তিনটি প্রজন্মের রুমি–রবীন্দ্রনাথের চর্চা থাকলে; তার লিবেরেলিজম এভাবে প্রদর্শন করতে হয় না। ডিএনএ–তে স্পিরিচুয়ালিটির অনুশীলন কমপক্ষে তিন প্রজন্মের হলে, সেই মানুষটি কখনো কাউকে গালি দিতে পারে না। তিনটি প্রজন্মে ইংরেজি শিক্ষার অনুশীলন থাকলে, ঐ পরিবারের ছেলে কখনো এফ ওয়ার্ড পাবলিকলি ব্যবহার করবে না। নতুন ইংরেজি শিখলে গালিগুলো প্রথমে শেখে মানুষ।
এই যে ধর্মপ্রাণ মানুষদের পাকিস্তানপন্থী ও ভারতপন্থী বলে গালি দেওয়া হয়; অথচ বাংলাদেশ ছাড়া তাদের আর কোনো ঠিকানা নাই। এরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরায়। দেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী এরা। অথচ ধর্মপ্রাণ মানুষদের হাসিনার পনেরো বছরে গালি দিয়েছে যারা; তারাই হাসিনার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আর ধর্মপ্রাণ মানুষদের ভারতপন্থী বলে গালি দেয় যারা, তারা পশ্চিমের দেশে অভিবাসী হতে উন্মুখ। বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশে উড়ে যাবার রানওয়ে বা টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করে যারা; তারাই ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও হিন্দুদের পাকিস্তানপন্থী ও ভারতপন্থী বলে গালি দেয়। তার মানে যাদের নিজেদের নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে দুর্বলতা আছে; তারাই অন্যদের গালি দিয়ে দেশের মালিকানা দাবি করে।
দেশের মালিকানা দাবির আরেকটি কারণ আছে; ভূমিহীন লোকেরা দুর্নীতি ও দখলের মাধ্যমে জীবনে প্রথম ভূমির মালিকানা পেলে; তাদের ছেলেরা নিজেদের দেশের মালিক বলে মনে করে।
আবার ইসলামপন্থী ও হিন্দুত্ববাদীরা একে অপরকে গালি দিয়ে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে জানা দরকার, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভারত–পাকিস্তান খুব আদিম ট্রাইবাল এলাকা। এখানে বিদ্বেষ ও বিভাজন মানুষের ডিএনএ–র প্রধান উপাদান। ফলে পৃথিবীর যে কোনো ধর্ম এই অঞ্চলে এসে বিদ্বেষ ও বিভাজনপ্রবণ হয়ে যায়। আসল ঝামেলা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে; ধর্ম এখানে গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আদলে; যেখানে তুলনামূলক জীবন ও হিংসা–বিদ্বেষ প্রতিদিনের চর্চার বিষয়। এ অঞ্চলে বেশ কিছু মানুষ কল্পনায় নিজেকে আর্য মনে করে। কিন্তু আর্যগুণের কিছুমাত্র থাকলে জার্মানি বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মতো কল্যাণরাষ্ট্র হয়ে উঠত বাংলাদেশ–ভারত–পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার ধর্ম একটাই; তা হচ্ছে দুর্নীতি ও লোকঠকানো। ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম; এ অঞ্চলে পেশীশক্তি দেখিয়ে অন্যের বাড়ি ও জমি দখলের বাহন মাত্র। শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত মানুষকে ঠকিয়ে মসজিদ ও মন্দিরের চাঁদা তুলে বিলাসী জীবন লাভই এখানে ইসলামপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কাজ।
শুধু ধর্ম কেন, দেশপ্রেমও এইখানে জমি–বাড়ি–দেশদখল, দুর্নীতি–লুণ্ঠন–পাচারের বাহন। বেশি দূরে যাবার দরকার নেই; হাসিনার পনেরো বছর যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমের কথা বলেছে; তারাই দেশলুণ্ঠন করেছে। ব্রিটিশ সরকারের কোলাবরেটর, পাকিস্তান সরকারের কোলাবরেটর, স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের কোলাবরেটর হয়ে দেশ লুন্ঠন ও নব্য জমিদার সেজে বসাই এখানে দেশপ্রেমের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো; এখনো ডিএনএ প্রবাহে সেই একই নেশা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ দেশপ্রেম প্রদর্শিত হয় ভাষণে, ফেসবুক ত্রাসনে; তাতে ৫৪ বছর বয়েসী একটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনের শাসনের এ করুণ অবস্থা হবার কথা নয়; যদি প্রদর্শিত দেশপ্রেমের এক শতাংশও কারো থাকত।
বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিতরা ৫৪ বছরে লুণ্ঠন করে দেশটার বারোটা বাজিয়েছে। সেসব লুণ্ঠকের গৃহে বড় হয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের বড় বড় লেকচার আমরা কেন শুনব। এই যে এঁদো ডোবা ভরাট করে দুর্নীতির টাকায় তৈরি দালানে ওঠে বিরাট সব স্মার্ট লোকজন; তাদের ভেতরটা এত ফাঁপা যে; ধর্মপ্রাণ মানুষদের গালি দিয়ে সুপিরিয়র সাজতে হয়। আসলে গালির মধ্যে পারিবারিক পরিবেশের এক্স–রে রিপোর্ট থাকে। বাবা–মা কী ভাষায় কথা বলতেন, এটা ধরা পড়ে ফেসবুকে সন্তানদের ভাষায়। কাজেই গালাগালি করছেন মানেই; বংশ পরিচয়ের স্যাম্পল রেখে যাচ্ছেন। তখন যতই ওয়েস্টার্ন আউটফিট পরেন, ইংলিশ মুভি দেখে রিভিউ দেন, ভীষণ কালচারাল মামা ও খালা হয়ে ঘোরেন; আপনার গালির ভাষাতেই ফুটে ওঠে আপনি কোন কাননের ফুল।
(চলবে)



পাঠকের মন্তব্য