লেখকঃসাবিহা সুলতানা
সে ধীরে ধীরে হাঁটছে। যেন পৃথিবীর সব তাড়াহুড়ো তার কাছে নিষিদ্ধ। সে হেঁটেই যাচ্ছে। এ গলি,সে গলি,তস্য গলি। হাঁটার ফাঁকে সে বিশাল এক আয়োজনে পৌঁছে গেল। বইমেলা।অমর একুশে বইমেলা।সে ঢুকে পড়ল। গিয়েই দেখা যাক না কী হয়!
গেটের সামনে এক স্বেচ্ছাসেবক তাকে আটকাল। স্বেচ্ছাসেবক দেখল এক যুবক তার মাথা ভরা এলোমেলো চুল,গায়ে মাপের চেয়ে বড় হলুদ পাঞ্জাবি আর খালি পা।
:ভাই, আপনার জুতা কই?
সে শান্ত গলায় বলল,
:আমার জুতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো না। আমরা আলাদা থাকি।
স্বেচ্ছাসেবক একটু ভেবে বলল,
:তবুও জুতা ছাড়া ঢোকা ঠিক না।
সে বলল,
:আমি জুতা ছাড়া জন্মেছি। তখন কেউ কিছু বলেনি।
স্বেচ্ছাসেবক বলল,ভাইয়ের নাম কী?
সে বলল, নাম বললে তো ভাই চিনে ফেলবেন। আমি হিমু।
এবারে স্বেচ্ছাসেবক ছেলেটি হাসল, আচ্ছা। এই কাহিনি! যান ভাই ভিতরে যান। একটু সাবধান থাইকেন, পেরেক-ফেরেক থাকে, পায়ে না ঢোকে!
হিমু বলল,নারে ভাই, অভ্যাস আছে। কিন্তু বইমেলা এত ফাঁকা কেন? প্রতিবার তো মানুষের ভিড় এমন থাকে যে একজন যদি হাঁচি দেয়, পাঁচজন আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেলে।
ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,দেশ হইছে ভাই মগের মুল্লুক। কত তামাশাই যে হইতেছে দেশে। যান ভাই, নিজের চোখেই দেখেন।
হিমু ভেতরে ঢুকে পড়ল। :মেলা আছে, স্টল আছে, বই আছে…
লোকজন নেই।
খালি মাঠে বাতাস হাঁটছে। কয়েকটা স্টলে বিক্রেতারা বসে এমনভাবে হাই তুলছে, যেন তারা বই না, নিদ্রা বিক্রি করছে।
হঠাৎ এক মেয়ে দৌড়ে এসে বলল
:আপনি কি সত্যিই হিমু?
হিমু বলল,
:কখনও কখনও।
:মানে?
:সকালে আমি মানুষ থাকি। রাতে একটু হিমু হই।
মেয়েটা বলল,
:একটা সেলফি তুলতে পারি?
হিমু বলল, না। আমার গুরুর আদেশ অনুযায়ী আমি কোনো সুন্দরী তরুণীর সাথে সেলফি বন্ধনে আবদ্ধ হইব না। মেয়েটি মন খারাপ করে ফেলল। কিন্তু হিমু তাতে গুরুত্ব দিল না। মহাপুরুষদের এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারে গুরুত্ব দিলে চলে না।
সে বলল,বইমেলায় এবার মানুষ নেই কেন বলেন তো?
মেয়েটি বলল,সবাই নিজের ইচ্ছামতো চলতে চায়। তাই এই সমস্যা।
হিমু বলল,সার্বভৌম দেশ। ইচ্ছামতোই তো সবার চলার কথা।
মেয়েটি বলল,সবাই ইচ্ছামতো চলা মানেই ঐকমত্যের সম্ভাবনা কম। তাই এমন সমস্যা হতেই পারে।
এর সাথে আলোচনায় রাজনৈতিক কচকচানি চলে আসছে দেখে হিমু সামনে এগিয়ে গেল। সেখানে ফুচকাওয়ালা মানুষের অভাবে মাছির সাথেই মিতালি করছে মনে হয়। এরই মাঝে কোথা থেকে হাজির হয়ে গেল এক নব্য ইউটিউবার।
:ভাই ভাই! একটা ছোটো ইন্টারভিউ দিবেন?
হিমু বলল,
:ছোট ইন্টারভিউ মানে কী?
:মানে দুইটা প্রশ্ন।
:একটা করতে পারেন…
:কেন ভাই?
:কারণ আমার উত্তর সাধারণত বড় হয়।
ইউটিউবার বলল,
:সমস্যা নাই ভাই। দুইটাই করি। প্রথম প্রশ্ন- আপনার জীবনের লক্ষ্য কী?
হিমু একটু ভেবে বলল,
:আপাতত আজকে একটা ফুচকা খাওয়া। বলে সে দ্বিতীয় প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই ফুচকার খোঁজে গেল।
ফুচকার স্টলে গিয়ে সে বলল,
:ভাই, দশ টাকার ফুচকা দেন।
ফুচকাওয়ালা বিরক্ত মুখে বলল,
:দশ টাকার ফুচকা এখন ইতিহাস।একশোর নিচে প্লেট নাই!
হিমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
ফুচকা ওয়ালা বলল,
:কী ভাবতেছেন? দিব না কি দিব না?
হিমু বলল,
:ভাবছি, দেশের অর্থনীতি খুব দ্রুত উন্নতি করছে।
তার কাছে টাকা নেই,শুধু তাই না, তার পাঞ্জাবির পকেটই নেই। হাতে শুধু একটা দশ টাকার নোট। সে ফুচকাওয়ালাকে বলল, ভাই আপনি এক প্লেটে কয়টা ফুচকা দেন?
ফুচকাওয়ালার এইসব তাল-তামাশা ভালো লাগছিল না।সে বিরক্তস্বরে বলল,সাতটা।
হিমু হিসাব করে বলল,তাহলে একটার দাম পড়ে চৌদ্দ টাকা আটাশ পয়সা। আমার আছে দশ টাকা।আপনি আমাকে অর্ধেক ফুচকা দেন। দশ টাকায় আমি অর্ধেকের বেশিই পাই। সেইটা আমি আপনাকে ছাড় দিলাম। দেন অর্ধেক ফুচকা।
ফুচকাওয়ালা এবার রীতিমতো রেগে গেল।
-ভাই তামাশা কইরেন না তো।দুইডা ফুচকা এম্নে দিতাসি খাইয়া বিদায় হন। এম্নেই মানুষজন নাই, চিপাত আছি আর হ্যায় আইসে তামাশা করতে।
সে দুটি ফুচকা বানিয়ে হিমুর হাতে দিল। হিমু তার বিখ্যাত ভূবনভোলানো হাসি দিয়ে সে দুটি গলাধঃকরণ করে ফেলল। এখন মানে মানে এখান থেকে কেটে পড়াই শ্রেয়।
কিছুদূর এগিয়ে সে দেখল লেখক হুমায়ুন আহমেদের বই ভর্তি একটি স্টল। সে এগিয়ে গেল সেদিকে। স্টলের মালিককে জিজ্ঞেস করল, এই ভদ্রলোকের বই কী এখনও চলে নাকি?
লোকটা বেশ একটু খুশি হয়ে বলল, চলে মানে! এখনই বই-ই দুই চাইরডা যা বিক্রি হইছে ভাই! আপনি কি উনার পাগলা ফ্যান নাকি? হিমু হেসে বলল,না ভাই। এই লোককে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না! লোকটা বড় জ্বালিয়েছে আমাকে। আমার বাবার মতোই কত অদ্ভুত পরীক্ষা চালিয়েছে আমার ওপর। তবে বুঝি নাই তার এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার দরকারটা ছিল কী? আর কিছুদিন এই ধরনীতে থাকলে তামাশা দেখতে পারত…
এরপর আর হিমু বইমেলার কোনোদিকে গেল না। তার মনটা এখন আর ভালো লাগছে না। সরে যেতে হবে, খুব দ্রুত সরে যেতে হবে। মাজেদা খালাও ডেকেছিল, কী যেন স্পেশাল রান্না খাওয়াবে বলে। তবে সেখানেও আর যেতে ইচ্ছা হলো না! আরও কিছুক্ষণ দেরি করলে রুপাও চলে আসবে! পা চালিয়ে দ্রুত বইমেলা থেকে বের হয়ে চলে গেল সে। ময়ুরাক্ষী তীরে বসতে পারলে একটু ভালো লাগত…



পাঠকের মন্তব্য