একদিন বিড়ালের রাজত্বে

১৪ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে

গত কিছুদিন ধরে বাসা থেকে বের হলেই যেন মনে হচ্ছিল, কেউ একজন আমাকে কড়া নজরে রাখছে। আমি হেঁটে যতটুকু যাই, সে-ও নিখুঁত দূরত্বের প্রটোকল বজায় রেখে আমার পিছে পিছে আসে। ভাবলাম, 'র’ নাকি সিআইএ, লাগলটা কে আমার পিছে?

গত পরশুদিন সে হুট করেই একদম সিনেমাটিক স্টাইলে আমার সামনে এসে ব্রেক কষল। আমি থমকে গেলাম। বুকে তখন 'ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস' সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজছে।

কিন্তু যাকে নিয়ে ভয়, তার দেখি কোনো হেলদোল নেই। সে বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে, ঠিক যেমন একজন জমিদার তার কর ফাঁকি দেওয়া প্রজার দিকে তাকায়, সেভাবে তাকিয়ে খুব আয়েশি এবং একটু ডমিনেটিং স্বরে বলে উঠল,

: মিয়াও!

ভয়ে জমে যাওয়া আমি হেসেই ফেললাম। সামনে দাঁড়িয়ে কোনো বাঘা ডন নয়, বরং একটা পেটমোটা, নাদুস-নুদুস, কমলা আর ছাই রঙের ইয়া বড় এক ফুলো লেজওয়ালা বিড়াল! আমি জিজ্ঞেস করলাম,

: ব্যাপার কী? পিছু নিয়েছ কেন? তুমি কি পাড়ার বখাটে নাকি?

সে এবার একটু ডিপ্লোম্যাটিক স্টাইলে স্বর নরম করে বলল,

: মিয়াও।

এই ‘মিয়াও’-এর সাবটাইটেল অনেকটা এরকম,

: আরে এ দেখি কোন অসভ্য মানুষ! আমি বখাটে হতে যাব কেন? তোমাকে আমার ব্যক্তিগত অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে পছন্দ হয়েছে। এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে চলো। রাস্তা চেনো তো?

আমিও আর কী করি, হেসেই বললাম,

: ওকে বস, চল সাথে!

ব্যস! সেই থেকে সে আমার নিত্যসঙ্গী। বাইরে বেরোলেই সে জেমস বন্ডের মতো হাজির। মাঝে মাঝে বাসায় এসে সোফায় এমনভাবে পা তুলে বসে, যেন ট্যাক্স কালেকশনে এসেছে, তখন তাকে রাজকীয় আপ্যায়ন করতে হয়। তারপর আস্তে আস্তে সে ‘গেস্ট’ থেকে ‘ফেভিকল’ হয়ে গেল- মানে আমার বাসার স্থায়ী বাসিন্দা। দুষ্টুটার নাম দিয়েছি 'পিচ'।

পিচের কারণেই বিড়ালদের প্রতি আমার মনোযোগ ইদানীং মহাকাশ ছোঁয়া। কিন্তু ওরেব্বাস! খোঁজ নিয়ে তো আমার চোখ চড়কগাছ! ২৪ জুন নাকি ‘বিড়ালদের বিশ্বজয় করার দিন’!

বিড়ালপ্রেমীদের তৈরি এই চমৎকার ইন্টারনেট ট্রেন্ডের পেছনে কিন্তু এমন কিছু বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে, যা জানলে মনে হবে- আমরা আসলে একটা বিশাল আন্তর্জাতিক বিড়াল-সিন্ডিকেটের ভেতর বাস করছি!

চলুন, বিড়ালের চোখে দুনিয়াটার একটু এক্স-রে করা যাক:


আমরা ভাবি, মার্ক জাকারবার্গ আর ইউটিউব আসার পর বুঝি বিড়ালরা এত পপুলার হয়েছে। ভুল! আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরে এরা রীতিমতো ডিভাইন ভিআইপি ছিল। মিশরীয়রা বিড়ালকে 'বাস্তেত' দেবীর রূপ মনে করে পুজো করত।
ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখে গেছেন, সে যুগে কোনো পোষা বিড়াল মারা গেলে শোক প্রকাশের জন্য বাড়ির সব মানুষ নিজেদের চোখের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন! ভাবুন একবার! মিশরের 'ওজি' ম্যানিপুলেটরস তো এনারাই ছিলেন! মানে, মানবজাতিকে কীভাবে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের পায়ের নিচে রাখতে হয়, সেই ক্র্যাশ কোর্স তারা হাজার বছর আগেই কমপ্লিট করে এসেছে!


বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে দেখেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালরা কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় ভুলেও ‘মিউ’ শব্দটা ব্যবহার করে না! নিজেদের জোন ভাগ করা বা মারামারি করার জন্য তারা গন্ধ, বডি ল্যাংগুয়েজ আর ডাইরেক্ট হিসহিসানি বা গর্জন ব্যবহার করে।
তাহলে ‘মিউ’ দিয়ে তারা কি করে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আওয়াজটা বিড়ালরা আবিষ্কার করেছে শুধুমাত্র মানুষকে বোকা বানিয়ে কাজ হাসিল করার জন্য!

আরও ভয়ের কথা হলো, বিড়ালের মিউ-এর ফ্রিকোয়েন্সি আর একটা মানব শিশুর কান্নার ফ্রিকোয়েন্সি নাকি হুবহু এক! ফলে বিড়াল যখন মিউ মিউ করে, আমাদের ব্রেন ভাবে, আহা রে, বাচ্চাটার খিদে লেগেছে! আর সাথে সাথেই দৌড়ে গিয়ে ট্রিট বা মাছ, ভাত বা তার পছন্দের খাবার বাটি ভরে দিয়ে আসি। চিন্তা করুন, এটা কোনো আওয়াজ নয়, একটা থ্রিডি সাইকোলজিক্যাল স্ক্যাম!


ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম- যেখানেই স্ক্রোল করুন না কেন, বিড়ালের কিউট ভিডিও আপনার স্ক্রিন কামড়ে ধরে বসে আছে। ডেটা বলছে, ইউটিউবে বিড়াল সংক্রান্ত ভিডিওর সংখ্যা ২০ লাখ বা ২ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে এবং এগুলো মানুষ হাঁ করে ২৫ বিলিয়নের মানে ২,৫০০ কোটি বারেরও বেশি বার দেখেছে! প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে প্রায় নব্বই হাজারেরও বেশি বিড়ালের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করা হয়!

সবচেয়ে বড় কৌতুকটা শুনুন, নাসা যখন গভীর মহাকাশে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথম কোনো ভিডিও ট্রান্সমিশন টেস্ট করেছিল, তখন পৃথিবী থেকে প্রায় তিন কোটি কিলোমিটার দূরে থাকা এক স্পেস প্রোব থেকে পৃথিবীতে কিসের ভিডিও পাঠানো হয়েছিল জানেন? এলিয়েনদের কোনো বার্তা নয়, একটি বিড়ালের ১৫ সেকেন্ডের আলতু-ফালতু ভিডিও! তার মানে, মহাকাশ বিজ্ঞানেও এরা অলরেডি নিজেদের পতাকা উড়িয়েছে! গিয়ে দেখেন, এলিয়েনরাও এখন হয়তো ওদিকে বসে মিউ মিউ করছে!


তবে বিজ্ঞানীদের একটা থিওরি আমাদের একটু সান্ত্বনা দেয়। তারা দেখেছেন, কাজের ফাঁকে বিড়ালের ভিডিও দেখলে মানুষের ক্লান্তি, স্ট্রেস, রাগ আর ডিপ্রেশন এক নিমেষে গায়েব হয়ে যায়। উল্টো কাজের প্রতি মনোযোগ আর পজিটিভ এনার্জি বাড়ে। তার মানে দাঁড়াল, অফিসে বা ডেস্কে বসে বসের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাট ভিডিও দেখা আসলে কোনো ফাঁকিবাজি নয়, ওটা হলো এক ধরণের ‘ডিজিটাল থেরাপি’!

সব মিলিয়ে কাহিনিসংক্ষেপ এটাই দাঁড়ায়- তুলতুলে এই কিউটনেসের ডিব্বারা কোনো যুদ্ধ, অস্ত্র বা রক্তপাত ছাড়াই পুরো পৃথিবী জয় করে ফেলেছে। শুধু তাদের ওই অদ্ভুত, অহংকারী আর রাজকীয় এটিটিউড দিয়ে। আমরা ভাবি আমরা ওদেরকে পালি, আসলে ওরাই আমাদের দাস বানিয়ে রেখেছে!
তাই আজ ২৪ জুন, 'ক্যাট ওয়ার্ল্ড ডমিনেশন ডে'- তে আপনার ঘরে থাকা ওই তুলতুলে, গোঁফওয়ালা একনায়কের সামনে নতজানু হন। তাকে কিছু এক্সট্রা ক্যাটফুড বা ট্রিটের ট্যাক্স দিয়ে মাথা চুলকে দিন এবং বলুন,

মহামান্য বিড়াল বাহাদুর, আপনার এই রাজত্ব চিরজীবী হোক! আমরা আমৃত্যু আপনার দাসত্ব করতে রাজি আছি, শুধু দয়া করে মাঝরাতে আমাদের মুখের ওপর লাফিয়ে পড়বেন না!

১৪ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top