মানুষের জীবনে কিছু কিছু জিনিস আছে, যাহার সঙ্গে তাহার জন্মগত শত্রুতা। আমার ক্ষেত্রে তাহা হইল ফুটবল।
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ পা দিয়ে হাঁটে। ফুটবল খেলোয়াড়রা পা দিয়ে এমন সব কাজ করে, যাহা হাত দিয়াও করা কঠিন। এই কারণেই সম্ভবত আমি কখনো ফুটবলের প্রতি পূর্ণ আস্থা স্থাপন করিতে পারি নাই।
আমার এক বন্ধু একদিন বলিল—
– চলুন, ফুটবল ম্যাচ দেখিতে যাই।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—
– সেখানে কি বসিবার ব্যবস্থা আছে?
সে বলিল, আছে।
– চা?
– হতে পারে।
– তাহলে ফুটবল থাকুক, আমরা চা খাই।
কিন্তু বন্ধু মহাশয় নাছোড়বান্দা। অবশেষে মাঠে যাইতে হইল।
মাঠে প্রবেশ করিয়াই দেখিলাম, হাজার হাজার লোক এমন উত্তেজিত যে মনে হইল আজই বুঝি রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর হইবে। আমি কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম—
– কী ব্যাপার?
একজন বলিল—
– আজ আমাদের দল জিতিবে!
আমি বলিলাম—
– তাহাতে কী হইবে?
লোকটি এমনভাবে আমার দিকে তাকাইল, যেন আমি সদ্য মঙ্গল গ্রহ হইতে অবতরণ করিয়াছি।
খেলা শুরু হইল। বাইশজন লোক একটি বলের পশ্চাতে দৌড়াইতেছে। আমার মনে হইল, বলটি নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ করিয়াছে, নতুবা এত লোক তাহার পিছু লইবে কেন?
যাহোক, খেলা চলিতে লাগিল। হঠাৎ একজন বল লইয়া এমন দ্রুত দৌড়াইল যে আমার পাশের ভদ্রলোক চেয়ার ছাড়িয়া লাফাইয়া উঠিলেন। তিনি “গো-ও-ও-ল!” বলিয়া চিৎকার করিলেন।
আমি উৎসুক হইয়া বলিলাম—
– হইয়াছে?
তিনি বিমর্ষভাবে বলিলেন—
– নাহ, অতি অল্পের জন্য মিস!
আমি আশ্চর্য হইলাম। বাংলাদেশে পরীক্ষায় ফেল হইলে আমি এত আফসোস করিতে দেখি নাই, যতখানি এই ভদ্রলোক মিস হওয়া উপলক্ষে করিতেছেন।
ফুটবলের আরেকটি অদ্ভুত দিক আছে। একজন খেলোয়াড় আরেকজনকে সামান্য স্পর্শ করিলেই তিনি এমনভাবে মাটিতে পড়িয়া যান, যেন তাঁহাকে অন্তত তিনখানা ট্রাম এবং দুইখানা হাতি একযোগে ধাক্কা দিয়াছে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরে দেখা যায়, তিনি আবার বীরদর্পে দৌড়াইতেছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান যদি এই রহস্য আবিষ্কার করিতে পারে, তবে হাসপাতালের অর্ধেক বেড খালি হইয়া যাইবে।
খেলা শেষ হইল। একদল লোক আনন্দে আত্মহারা, অন্যদল শোকে মুহ্যমান। আমি হিসাব করিয়া দেখিলাম, এই সমস্ত আবেগের কেন্দ্রবিন্দু একটি চামড়ার গোলক।
তখন মনে পড়িল, মানবসভ্যতার ইতিহাসও বোধহয় এমনই। কোথাও সিংহাসনের জন্য যুদ্ধ, কোথাও মতবাদের জন্য, কোথাও পতাকার জন্য। আর ফুটবল মাঠে সেই চিরন্তন মানবপ্রবৃত্তির এক নিরীহ সংস্করণ—সকলেই যুদ্ধ করিতেছে, কিন্তু অস্ত্রের পরিবর্তে একটি বল লইয়া।
ফলত, ফুটবল সম্পর্কে আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই যে, ইহা এমন এক খেলা যাহা আমি কখনো ভালো খেলিতে পারি নাই, ভালো বুঝিতেও পারি নাই, কিন্তু হাজার মানুষের উল্লাস দেখিবার জন্য মাঠে যাইতে আমার আপত্তি নাই।
কারণ বলটি গোল হোক বা না হোক, মানুষের আনন্দের দৃশ্য সর্বদাই গোলের চেয়েও বড়।



পাঠকের মন্তব্য