শেষ কদিন ধরে মনে হচ্ছে, আমি আসলে আমার কাজ না, আমার অফিসকেই খুব ভালোবাসি। অফিস থেকে বের হতেই ইচ্ছা করে না। বাসায় থাকলেও অফিসে যাওয়ার জন্য মন হাঁসফাঁস করতে থাকে।
বিষয়টা নিয়ে প্রথমে আমি নিজেও চিন্তিত হয়েছিলাম। কারণ চাকরির প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর চেয়ে ইউনিক ঘটনা কর্পোরেট জগতে খুব বেশি নেই। তাই নিজের ভেতরে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। আমি কি অবশেষে দায়িত্বশীল হয়ে গেছি? আমি কি কাজকে ভালোবেসে ফেলেছি? নাকি LinkedIn এর মোটিভেশনাল পোস্টগুলো অজান্তেই মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে?
কিন্তু যতই ভাবি, ততই রহস্য ঘনীভূত হয়। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য যে যুদ্ধটা করতে হয়, সেটা তো কম কিছু না। লোকাল বাসে এমনভাবে মানুষ ওঠে যেন শেষ নৌকাটা ছেড়ে যাচ্ছে। মেট্রোর ভেতরে এমন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যা অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও কোনোদিন হয় না। তারপরও আশ্চর্যজনকভাবে আমি প্রতিদিন অফিসে যাই। শুধু যাই না, আগ্রহ নিয়ে যাই।
এই জায়গাতেই সন্দেহটা শুরু হয়েছে। কারণ বাইরে এখন এমন গরম পড়েছে যে আবহাওয়া অফিসের বুলেটিন আর মাইক্রোওয়েভের ইউজার ম্যানুয়ালের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর খুললেই শুনি দাবদাহ। আরেকটু স্ক্রল করলেই এল নিনো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব আবহাওয়াজনিত সমস্যা ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই তাদের বার্ষিক সম্মেলন করছে।
রাস্তায় বের হলে সূর্যকে আর নক্ষত্র মনে হয় না। মনে হয় সে একজন অতিউৎসাহী প্রজেক্ট ম্যানেজার, যে সকাল ৯টা থেকেই সবাইকে দৌড়ের উপর রাখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় অফিসে পৌঁছানোর পর কেমন একটা অনুভূতি হয়।
ঠিক স্বস্তি বলব না। ঠিক শান্তিও না। অনেকটা এরকম যে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর নাবিক যেমন দূরে ভূমি দেখতে পায়। অথবা মরুভূমিতে পথ হারানো মানুষ যেমন হঠাৎ একটা ওএসিস দেখতে পায়। অবশ্য আমি অফিসকে ওএসিস বলছি না। এতটা আবেগপ্রবণ এখনও হইনি। তবে এটুকু বলতে পারি, বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকার সময় চশমার কাঁচে যে সামান্য পরিবর্তনটা টের পাই, সেটার মধ্যে একটা কবিতা আছে।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, অফিসে এসি আছে বলেই আমি অফিসপ্রেমে আক্রান্ত হয়েছি। অমন কিছু কিন্তু মোটেও না। আমি মানুষের মতো মানুষ। আমার আবেগ, অনুভূতি, মূল্যবোধ সবই আছে। আমি কোনোদিনই এমন ছিলাম না যে ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রার পৃথিবী থেকে হঠাৎ ২৪ ডিগ্রির এক রহস্যময় জগতে ঢুকে নিজের নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ফেলব। অফিসকে আমি ভালোবাসি সম্পূর্ণ অন্য কারণে। যদিও সেই কারণগুলো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে অফিসের কাঁচের দরজাটা পেরোনোর ঠিক পরপরই।
আগে ছুটি হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে থেকেই ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে রাখতাম। এখন কম্পিউটার শাটডাউন দিতে দিতে মনে হয়, ও বুঝি মৃদু স্বরে গাইছে, কিছুক্ষণ আরও রহিতে না হয় কাছে...
তারপরও আমি বসে থাকি না। কারণ সহকর্মীরা সন্দেহ করতে পারে। তাই ধীরে ধীরে উঠি। ওয়াশরুমে যাই। পানি খাই। লিফটের জন্য অপেক্ষা করি। আবার মনে পড়ে একটা মেইল চেক করা হয়নি। ফিরে যাই। মেইলটা অবশ্য জরুরি না। ফিরে যাওয়াটাই জরুরি। বাসায় ফিরে ফ্যানের নিচে বসে মাঝে মাঝে অফিসের কথা মনে পড়ে। কাজের কথা না। মিটিংয়ের কথা না। এক্সেল শিটের কথা তো একদমই না।
শুধু মনে পড়ে, কী সুন্দর একটা পরিবেশে ছিলাম সারাদিন, কোন হইচই ছিলো না। কী চমৎকারভাবে সবকিছু স্থির ছিল। কী অসাধারণভাবে কেউ ঘামছিল না। আমার এক সহকর্মী বলছিল, "ভাই, আমার মনে হয় অফিস আমাদের দ্বিতীয় পরিবার। আমি তার সঙ্গে তর্ক করিনি। কারণ পরিবারের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
কিন্তু এমন একটা জায়গার প্রতি মায়া জন্মানো খুব অস্বাভাবিক না, যেখানে এল নিনো, দাবদাহ, তাপপ্রবাহ, সূর্যের প্রতিশোধস্পৃহা সবকিছু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।



পাঠকের মন্তব্য