লাটুবাবু বলে একজন ভারি ভালোমানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর বৌটি এমনি দজ্জাল যে, কোনো একটা বাড়িতে তাঁরা তিন মাসের বেশি টিকতে পারতেন না। তারই মধ্যে হয় পাশের বাড়ির লোকদের সঙ্গে, নয় বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করে, নয়তো বাড়ির নানা খুঁত নিয়ে লাটুবাবুর ওপর রাগারাগি করে, শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে হতো। এদিকে ভদ্রলোকের পক্ষে মাসে দুশো টাকার বেশি বাড়িভাড়া দেওয়া মুশকিল। শেষকালে এমন দাঁড়াল যে ওই ভাড়ার মধ্যে কলকাতা শহরে কিংবা শহরতলীতে আর একটিও বাড়ি বাকি না থাকার মতো হল। এই সময় গিন্নি আবার অশান্তি করে বাড়ি ছাড়বার জন্য তাঁকে জ্বালিয়ে যেতে লাগলেন।
এর মধ্যে একদিন বাড়ি ফেরার পথে এক দালালের সঙ্গে দেখা। সে বলল নাকি বেহালার ওদিকে একটা চমৎকার বাড়ি আছে, ভারি সুবিধার দরে পাওয়া যেতে পারে। কী ব্যাপার? না, ও-বাড়িতে কেউ যদি একটানা সাত দিন থাকে, বাড়িওয়ালা তাকে বিনি পয়সায় ছয় মাস থাকতে তো দেবেনই, তার পরেও খুব কম ভাড়াতেই থাকতে দেবেন।
লাটুবাবু বললেন, “চলুন মালিকের বাড়ি গিয়ে কথাটা পাকা করে আসি। আপনাকে কিছু দিতে হবে নাকি?” দালাল জিভ কেটে বলল, “না না, আমাকে যা দেওয়ার মালিকই দেবেন। তা বাড়িটা একবার দেখবেন না?” লাটুবাবু ঘাড় নাড়লেন, “কিছু দরকার নেই। সব বাড়িতেই আমার এক হাল হয়।”
মালিকের বাড়ি গিয়ে লেখাপড়া করে দিয়ে, চাবি পকেটে ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলে পর দালাল কেমন একটু উসখুস করতে লাগল।
“আবার কী হল?”
দালাল বলল, “দেখুন, তাড়াহুড়োয় আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি বলে বিবেক দংশন করছে।”
লাটুবাবু বললেন, “কী কথা?”
“ইয়ে—মানে রোজ রাতে যে এ বাড়িতে আসে, সে একটা গলায়-দড়ি দেওয়া—মানুষ নয়।”
লাটুবাবু ঢোক গিলে বললেন, “তাতে কী হয়েছে? আমার তো নাইট ডিউটি। গিন্নিই সামলাবেন।”
পরদিন সকালে টেম্পো করে জিনিসপত্র নিয়ে দালালের সঙ্গে ওঁরা বেহালা গেলেন। দালাল পৌঁছে দিয়েই বিদায় নিল। গিন্নি বাড়ি দেখে মহা খুশি। বলেন কী না, “ওগো, এমন সুন্দর বাড়িতে আমি জীবনে থাকিনি। আর বাড়ি বদল নয়, এখানেই জীবন কাটিয়ে দেব।”
তারপর দুজনে মিলে হাতে হাতে ঘরদোর গুছিয়ে ফেললেন। রাতে কর্তার নাইট ডিউটি; গিন্নি তাড়াতাড়ি তাঁকে রেঁধে খাইয়ে, ব্যাগে রাতের টিফিন ভরে রওনা করিয়ে দিলেন।
পরদিন সকালে লাটুবাবু ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরলেন। কে জানে, বাড়ি ফিরে কী সর্বনাশ দেখবেন! কড়া নাড়তেই হাসিমুখে গিন্নি দরজা খুলে দিলেন।
“এসো, এসো, তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসো। আমি ডবল ডিমের মামলেট ভাজছি।”
খেতে খেতে লাটুবাবু এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কই, না তো, অস্বাভাবিক কিছু তো চোখে পড়ছে না—সবই তো যেমন হওয়া উচিত তেমনই। গিন্নির বাবা ছিলেন বিখ্যাত কুস্তিগীর, তাঁর নিজের আখড়া ছিল, সেখানে ছেলেরা মুগুর ভাঁজত। তাঁর একটা বড় আদরের কাঁঠাল কাঠের মুগুরও ছিল। গিন্নি সেটিকে একটা বেশ দর্শনীয় স্থানে সাজিয়ে রেখেছেন।
এমন সময় গিন্নিরও সেদিকে চোখ পড়াতে তিনি বললেন, “হ্যাঁ, ভালো কথা, বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম—কাল রাতে এক ব্যাটা চোর এসেছিল, বুঝলে? রান্নাঘরে বাসনের বাক্স থেকে বাসন বের করে সাজাচ্ছি, দেখি এক ব্যাটা গুটি গুটি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পকেট থেকে খানিকটা দড়ি ঝুলছে। সব দরজা-জানলা বন্ধ, কোথা দিয়ে যে সেঁধিয়েছে বুঝলাম না। তা সে তো ওপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু আমিও বিষ্টু গোঁসাইয়ের মেয়ে—আমিও কিছু কম যাই না। বাসনের বাক্স থেকে মুগুরটা নিয়ে চুপি চুপি পেছন থেকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি তার ঘাড়ে! কী সব মেখে-টেখে এসেছিল, কেমন হাত থেকে পেছলে যাচ্ছিল। আমিও ছাড়বার বাঁদী নই। মুগুর দিয়ে আগা-পাশতলা এমন পেটনাই দিলাম যে বোধহয় ব্যাটাচ্ছেলের নাকটাই ভেঙে গিয়েছিল। শেষে নাকি সুর করে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে লাগল, ‘যাচ্ছি, যাচ্ছি, যাচ্ছি—ওঁ বাবা গো! ছাড়ান দিন! ছাড়ান দিন! এই আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনো এ বাড়িতে আসব না!’ তারপর সুড়ুত করে কেমন করে যে সটকে পড়ল, তাও ভেবে পেলাম না। অনেক খুঁজেও আর দেখতে পেলাম না। দরজা-জানলা তো যেমন বন্ধ, তেমনই বন্ধ—”
এদ্দূর শুনে আঁক-আঁক শব্দ করে লাটুবাবু হাত-পা এলিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। মুখে অনেক জলের ঝাপটা দিতে তবে সুস্থ হলেন।
ব্যাপারটার শেষটা কিন্তু ভালো। ওঁরা ওই বাড়িতে প্রথমে সাত দিন, তারপর ছয় মাস বিনি ভাড়ায় থাকার পর, খুব কম ভাড়ায় আরও ছয় মাস থেকে এখন সস্তা দরে বাড়িখানা কিনে সেখানে দিব্যি বসবাস করছেন। এক দিকে ধানক্ষেত, অন্য দিকে বিস্কুট কারখানার নিরেট দেওয়াল—পাড়াপড়শির বালাই নেই।



পাঠকের মন্তব্য