যে কারণে আমার আর সিগারেট খাওয়া হলো না

৭৫১ পঠিত ... ১৮:১৫, মে ২৪, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

প্যাকেটে সিগারেট আছে বারোটা কি তেরোটা। এদিকে আমরা লোক পাঁচজন! হুমায়ূন আজাদ নাকি রাস্তায়। যে কোনো সময় এসে পড়বেন! এ কী বিপদ!

হুমায়ূন আহমেদ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলেন কিনা কে জানে। বললেন, শোনো, আমি কিন্তু ম্যাজিশিয়ান! প্যাকেট দাও… সিগারেট বাড়িয়ে দিচ্ছি!

ব্যালকনির পাশে ছোট্ট মোড়া নিয়ে বসেছেন কাজীদা। নজরুল নন… আমাদের কাজী আনোয়ার হোসেন! হুমায়ূন আহমেদের কথা শুনে একটু যেন হাসলেন। তাকালেন বিপরীত দিকে। ‍ওদিকে শহীদুল জহির সেই যে ঘরের কোণাটা নিয়ে বসে আছেন, কোনো রা নেই। কাজীদা বললেন, জহির, কিছু বলেন হুমায়ূনকে?

জহির তাকালেন বটে, কিন্তু কী নিয়ে কথা হচ্ছে তিনি জানেন না বলেই মনে হলো।
মানে হলো, এই ঘরের আলাপে তিনি নাই। হুমায়ূন বললেন, কী হলো দাও…

আমি প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম। হুমায়ূন প্যাকেটটা একবার নাড়া দিলেন। তারপর বললেন, চশমা ছাড়া তো কিছু ভালো দেখি না… জহির, বলতে পারেন আছে কয়টা এর ভেতরে?

শহীদুল জহির প্যাকেটটা নিলেন। অনেকক্ষণ প্যাকেটটার ভেতরে তাকিয়ে থাকলেন।

অনেকক্ষণ মানে অনেকক্ষণ। একটা সময় আমরা পর্যন্ত ভুলে গেলাম আসলে কেন তিনি প্যাকেটটা নিয়ে আছেন।

এক সময়, খুবই মৃদুকণ্ঠে বললেন, জলে আবর্তনের মতো আমাদের এই প্যাকেটটা নিয়ে হাত-বেহাত করার মধ্যে কেমন যেন একটা অনিশ্চয়তা আছে। কখনো এই হাতে কখনো ওই হাতে। ঘুরতে ঘুরতে কখনো বা মনে হচ্ছে কিছুই ঘুরছে না আসলে হাতে হাতে, কিছুই না। শুধুই একটা হাত থেকে অন্য হাত ঘুরে যাচ্ছে… আর সেই ঘোরার মধ্যে একটানা একটা ঘুঘুর ডাক কেউ কি শুনতে পাচ্ছে? বুঝতে পারছে কোথাও একটা জলের ভাঙন ঘটে যাচ্ছে সন্তর্পনে? আর সেই ভাঙনের উৎস খুঁজতে যেই না আমরা উঁকি দিচ্ছি প্যাকেটের ভেতর… আমরা দেখছি দশ কি এগারটা সিগারেট…

আমি বলে উঠলাম, দশটা না এগারটা?

’হয়তো দশটা… হয়তো এগারটা…’

’আরে আমি তো দেখলাম তেরটা মতো…’

’কিছুই নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই আসলে…! কিন্তু উঁকির ভেতর দেখা যায় মাত্র দশটা না এগারটা সিগারেটই একটা আবর্তের মধ্যে নিজেদের ভাঙনের গল্প বলতে বলতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে যে আসলে একটা বিপন্ন…’

হুমায়ূন আহমেদ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। দেখি দাও তো প্যাকেটটা…

প্যাকেট নিয়েই হুমায়ূন কাজী আনোয়ার হোসেনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন—গুনে দেখেন তো… কয়টা আছে! সংখ্যা না জানলে তো ম্যাজিক করতে পারছি না!

প্যাকেট হাতে নিয়ে আনোয়ার হোসেনও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কাঁচাপাকা ভ্রু কুঁচকে এল।

আমি বললাম, কী হলো?

কাজী আনোয়ার হোসেন প্যাকেটটা একবার ঝাঁকিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, রানাকেও এমন বিপদে একবার পড়তে হয়েছিল। পাপুয়া নিউগিনিতে। মিনতাসা নামের ছোট্ট গ্রামটা হঠাৎ যে কীভাবে নরক গুলজার হয়ে উঠল তা সেদিন রানাও বুঝতে পারে নি। ছুটি কাটাতে গিয়েছিল রানা। সঙ্গে ছিল নাতাশা। পাপুয়া নিউগিনিরই মেয়ে। প্রচুর সিগারেট খেত। কিন্তু রানা ততদিনে সিগারেটের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছে। নাতাশাকে কয়েকবার বলেওছে সেই কথা! নাতাশা একদিন যেন চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দিলো রানার দিকে। বলল, প্যাকেটে কয়টা সিগারেট আছে বলতে পারলে ছেড়ে দিবো, কথা দিচ্ছি! এ আর এমন কঠিন কী কাজ… ভেবে রানা গুনতে শুরু করেছিল। কিন্তু প্যাকেটে চোখ দিতেই ঝাপসা সব। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের তুখোড় স্পাই রানা… টানে কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না। আই সাইট নিয়ে গর্ব আছে তার। সোহেল বলে, চিলের চোখ! এখনো রেঞ্জের ভেতর পেলে প্রতিপক্ষের দুই ভ্রুর মাঝখানে ওয়ালথার পিপিকের বুলেট ঢুকিয়ে দিতে পারে নিখুঁত নিশানায়। অথচ প্যাকেটের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে না! গা গুলাচ্ছে রানার। মনে পড়ল সকালে একটা নতুন একটা ড্রিংস খাইয়েছিল নাতাশা। স্থানীয় ভেষজ দিয়ে বানানো। টক টক স্বাদের। মাথাটা ঘোরাচ্ছে রানার। দৃষ্টি আরো ঝাপসা হয়ে আসছে তার। তখনই একটা কণ্ঠ শুনতে পেল সে। অনেক দিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটা কণ্ঠ—রানা, কেমন আছো?

হুমায়ূন ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললেন। বললেন, থাক। আমাকে দেন আমিই ম্যাজিক করছি। সংখ্যা জানার দরকার নেই!

প্যাকেটটা আবার নিয়ে ভেতরে তাকালেন হুমায়ূন। ভ্রুটা কুঁচকে এল তার। বললেন, সিগারেট তো দেখি চারটা পাঁচটা আছে!

আমি বললাম, মানে কী? সিগারেট বারো তেরোটা ছিল… কমে যাচ্ছে কীভাবে?

হুমায়ূন হাসলেন। বললেন, এটাই তো ম্যাজিক! কেউ খাচ্ছে না কিন্তু কমে যাচ্ছে! সিগারেট নেই… কিন্তু তার মায়া আছে। এই মায়ার কথা আমি আমার অসংখ্যা লেখায় উল্লেখ করেছি!

হঠাৎই একটা কণ্ঠ—অসংখ্য লেখায় একই মায়া উল্লেখ করেছেন নাকি মায়া ভিন্ন ভিন্ন ছিল?

আমরা তাকাতেই দেখলাম দরজায় হুমায়ুন আজাদ দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাউজার আর জ্যাকেট পরা। চুল নিপাট ভাঁজে আচড়ানো।

হুমায়ূন আহমেদ আবার একটা শ্বাস ফেললেন। হুমায়ুন আজাদ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, সিগারেট নেই হয়ে যাওয়া কোনো ম্যাজিক না। সিগারেট যদি ফিরে আসে তাহলে সেটা ম্যাজিক হলেও হতে পারে। তবে ম্যাজিক জিনিসটাই হচ্ছে ফাঁকি। জাতীয় জীবনে চালাকির আশ্রয় নেয়াই ম্যাজিক। সেই ম্যাজিকই এখন হুমায়ূন করেছেন। তিনি প্রত্যেককে সিগারেট দেয়ার আগে প্যাকেট থেকে সিগারেট সরিয়েছেন। এখন প্রথমে কম সিগারেট দেখাচ্ছেন প্যাকেটের, এরপর আগের সিগারেট প্যাকেটে লুকিয়ে ভরে দেবেন। তারপর প্যাকেট দেখিয়ে বলবেন… এই যে করলাম জাদু! আর আপনারা তব্দা খেয়ে সেই জিনিস দেখে হাততালি দেবেন। বাঙালির সংস্কৃতিই হলো নিম্নরুচির জিনিস দেখে হাততালি দেয়া। আর অতিশোয়ক্তি করা। এই সামান্য ফাঁকিবাজি দেখে আপনারা বলবেন তিনি জাদুকর। শুধু জাদুকর বলে আপনারা থামবেন না। বলবেন তিনি মহান জাদুকর! অথচ তিনি যা করেছেন তার প্রবাদ বাঙলাতেই আছে— প্রবাদটা হলো কইয়ের তেলে কই ভাজা! আফসোস, বাঙলা না পড়েই অনেকে এখন বাঙলা করতে আসেন। তাদের মনে রাখা উচিত বাঙলাতন্ত্রে আমলাতন্ত্র খাটে না।

শহীদুল জহির একটু কেশে উঠলেন। বললেন, যে রাতে পূর্ণিমা ছিল আজই আসলে সে রাত! আমাকে তাই একটু ডলু নদীর কাছে যেতে হবে। আসি!

আজাদ বললেন, বাঙলায় যে শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে তাই না, আছে অনুবাদকে ব্যক্তিগত জিনিস বলে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতাও।

আমি বললাম, এটা কি ‘নারী’বাদী কোনো কথা?

আজাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। কিছু একটা বলতেও যাচ্ছিলেন এমন সময় কাজী আনোয়ার হোসেন উঠে দাঁড়ালেন। উঠতে উঠতে বললেন, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার একটা অফিসে যাওয়া লাগবে আজ! আসি!

আমার সাজানো আড্ডা ভেঙে যাচ্ছে বলে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। হুমায়ূন আহমেদ হঠাৎ বললেন, হীরক, কথায় কথায় এত বিচলিত হবেন না। হিমুর বাবা তার ডায়েরিতে কী লিখেছেন মনে নেই?

‘কী লিখেছেন?’

‘হিমুর বাবা লিখেছেন—মানুষ কারণে-অকারণে বিচলিত হয়। কিন্তু হিমু, তোমাকে হইতে হইবে সাইলেন্ট থাকা ভাইব্রেশনহীন ফোনের মতো। কল আসিবে ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ হইবে না, কোনো নড়াচড়াও হইবে না! বিচলিত মানুষ ভাবিতে পারে না। মানব সৃষ্টির এক বৃহৎ কারণ এই যে তারা যেন ভাবিতে পারে!’

‘আচ্ছা। তা আমরা এখন কী ভাবব?’

দুই হুমায়ূন এবার এক সাথে হেসে উঠলেন।
আজাদ বললেন, বারো হোক কি তেরো সিগারেট তো আছেই… দুটো ভাগও ভেগেছে… যাই ভাবি না কেন ভাবনাটা ভালো হবে!

আহমেদ বললেন, বড়ই মায়ার কথা! আসেন…ভাবি...

দুজনে ভাবনার জন্য দুটো সিগারেট বের করলেন। ফস করে ধরালেন। আমারই প্যাকেটের সিগারেট অথচ আমাকে দুজনের কেউই অফার করলেন না।

তারা হয়তো ধরেই নিয়েছেন, আমার ভাবার যোগ্যতা নেই।

৭৫১ পঠিত ... ১৮:১৫, মে ২৪, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top