মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা, প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (চতুৰ্বিংশ পর্ব)

৪ পঠিত ০ ... ৬ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে

14 (35)

 

রাশেদ খান পয়সারহাটে নেমে দেখে চারদিকে সুনসান, দোকানপাট বন্ধ। অসিত পাল এসে খবর দেয়, পয়সারহাটে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কায়। স্কুল মাঠে আব্বাস শাহ তার কাদিয়ানি-বিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। একই মাঠে কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সপ্তাহ পালনের ডাক দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতা কলিম চৌধুরী আর মুসলিম লীগ নেতা সলিম খান এলাকার নিরাপত্তার স্বার্থে গওহরডাঙ্গা গিয়ে এসডিও সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪৪ ধারা ঘোষণার ব্যবস্থা করেছেন।

নিউজপেপার স্টল থেকে মধুমতীর আলো তুলে নিয়ে রাশেদ দেখে বড় এক শিরোনাম, পাকিস্তানে কি কেবল মুসলমানেরাই থাকবে! অধ্যক্ষ আজিজুল হক ইনিয়ে-বিনিয়ে অভিমত কলাম লিখেছেন। রঞ্জু লিখেছে, ডানপন্থীর খপ্পরে পয়সারহাট। মতির কলাম চোখে পড়ে, লিবারেল স্পেসটুকু সংকুচিত হচ্ছে। জগন্ময় লিখেছে, ৪৭-এর আগেই ভালো ছিলাম।

রাশেদ ফিরেছে শুনে বাতেন ছুটে আসে। রাশেদ অসিত পাল আর বাতেনকে নিয়ে সার্কেল অফিসারের কাছে যায়। অফিসারকে বোঝায়, ১৪৪ ধারা তুলে নিলে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে তারা। আসল কথা হচ্ছে, জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হবে। দোকানপাট বন্ধ রাখলে আয়-উপার্জন বন্ধ থাকবে। সবাই তো আব্বাস শাহ, প্রণব মুখুজ্জে, অধ্যক্ষ আজিজুল হকের মতো বসে বসে খায় না। তাদের অখণ্ড অবসর বলেই বিমূর্ত বিষয়াদি নিয়ে তাওয়া গরম করছে। হিন্দু-মুসলমানের কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে ধনী-গরিবের আসল বিভাজন নিয়ে কথা বলার পরিবেশ রাখছে না দুটি পক্ষ।

অবশেষে গওহরডাঙ্গা থেকে নির্দেশ এলে পয়সারহাট থেকে ১৪৪ ধারা তুলে নেওয়া হয়। আওয়ামী যুব সংগঠনের ছেলেরা গিয়ে স্কুল মাঠে অবস্থান নেয়। রাশেদ যায় আব্বাস শাহের মাদ্রাসায়। আব্বাস শাহ ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না, এমন একটি ভাব নিয়ে হাসিমুখে স্বাগত জানায়। রাশেদ সরাসরি জানতে চায়, ইসলাম ধর্মের মালিকানাটা তাকে কে দিয়েছে? কে মুসলমান আর কে মুসলমান নয়, তা ঠিক করার কর্তৃত্ব সে কোথা থেকে পেয়েছে! মাদ্রাসা কবে থেকে হাশরের ময়দান হয়েছে! কেয়ামত কি হয়ে গেছে যে আব্বাস শাহ ঠিক করে দিচ্ছে, কে বেহেশতে যাবে আর কে দোজখে যাবে!

আব্বাস শাহ শান্তভাবে খেজুর ও শরবত পরিবেশন করে বলে, জনাব কি শুধু আমাকেই বকাঝকা করবেন, নাকি অপর পক্ষকেও কিছু বলবেন!

রাশেদ আব্বাস শাহের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবার কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে যায়। সেখানে গোল হয়ে বৈঠক করছে প্রণব মুখুজ্জে, আজিজুল হক, মুকুল শর্মা, কালিদাস, চিত্তরঞ্জন, মতি, রঞ্জু ও জগন্ময়। রাশেদকে দেখে তারা সবাই খানিকটা ঘাবড়ে যায়।

রাশেদ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, জমিদারি উচ্ছেদের পর পয়সারহাটের হিন্দু-মুসলমান সবাই কিছু জমিজমার মালিক হতে পেরেছে। এখন কৃষক-শ্রমিক-ক্ষুদ্র দোকানির খানিকটা সামর্থ্য হয়েছে ছেলেমেয়েকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর। এই পয়সারহাটেই দেখুন নতুন স্কুল, কলেজ, মিল, কারখানা হয়েছে। ব্রিটিশ আর জমিদারি শোষণে যে পূর্ববঙ্গ বিপর্যস্ত ছিল, সেটা যেন আবার পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবের জমিদার আর আমলাদের শোষণে বিপর্যস্ত না হয়, সেই লক্ষ্যে আমরা রাজনীতি করছি। অথচ আপনারা ৪৭-এর জমিদারি উচ্ছেদের বেদনা যেন ভুলতেই পারছেন না!

প্রণব মুখুজ্জে খুক খুক করে কেশে বলেন, ভুলে যেয়ো না রাশেদ, আমি তোমার শিক্ষক। আমাকে রাজনীতি শেখাতে এসো না। ঘুরেফিরে তোমরাও তো পুঁজিবাদী রাজনীতিই করো। আমরাই বরং সাম্যবাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছি।

--আপনাকে রাজনীতি শেখানোর স্পর্ধা আমার নেই, পণ্ডিতমশাই। আমি কেবল বাস্তবতাটা তুলে ধরেছি।

আজিজুল হক বলেন, সংখ্যালঘুদের বাস্তবতা সম্পর্কে কিছু বলুন দেখি, রাশেদ সাহেব!

--আপনারাই প্রতিদিন হিন্দুপাড়ায় গিয়ে ওদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে বলছেন, তোমরা সংখ্যালঘু, তোমরা দুর্বল। অধ্যক্ষ সাহেব, আপনি দেখাতে পারবেন, পয়সারহাটে হিন্দু-মুসলমান কৃষক-শ্রমিক-ক্ষুদ্র দোকানির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? আসল পার্থক্য তো ধনী-গরিবে। সেটা অগ্রাহ্য করে ধনীরা দাবা খেলে গরিবের ভাগ্য নিয়ে।

রঞ্জু, মতি, জগন্ময় এ ওর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে চেষ্টা করে। যেন নিজেরা কার্ল মার্কসের সাক্ষাৎ ভাগ্নে! ঢাকা মেডিকেল কলেজে বাম রাজনীতি করে আসা রাশেদকে তারা সমাজতন্ত্র শেখাবে। চুলটা একটু লম্বা রেখেছে, স্ট্যালিনের মতো গোঁফ রেখেছে, প্রণব মুখুজ্জের মতো কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পরেছে, মধুমতীর আলোতে কলাম লিখছে; আর অমনি তারা দিকগজ বুদ্ধিজীবী হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি শান্ত করতে মুকুল শর্মা বলে, রাশেদ ভাই, আপনি অনুমতি দিলে মধুমতীর আলোর জন্য আপনার ইন্টারভিউ নিতে চাই!

--মুকুলদা, আপনি আপনার সংবাদপত্র বৃক্ষটিকে যেভাবে পত্র-পল্লব-পাখির কূজনে মুখরিত করেছেন, সেভাবেই একে শতবর্ষী অশোকবৃক্ষ করে তুলুন। আপনাদের কথাকলির আসরে আমি বড্ড বেমানান। কারণ, আমি পণ্ডিতমশাইয়ের অভিধান অনেক আগে মুখস্থ করেছিলাম। এখন হাটে-মাঠে-ঘাটে স্বশিক্ষিত মানুষের অভিধানে জীবনের অর্থ খুঁজছি। আমার কোনো কথায় কেউ আঘাত পেলে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

রাশেদ খান উঠে গেলে প্রণব মুখুজ্জে গম্ভীরভাবে বলেন, আই অ্যাম প্রাউড অব মাই স্টুডেন্ট রাশেদ। দাবা খেলায় যোগ্য প্রতিপক্ষ পাওয়ার আনন্দে আমি উদ্বেল।

 

২৩ তম পর্বের লিংক

৪ পঠিত ০ ... ৬ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​