রাশেদ খান শেখ মুজিবের সঙ্গে করাচি বিমানবন্দরে নেমে দেখেন, হাজার হাজার লোক মুজিবকে স্বাগত জানাতে এসেছে। মুজিব হেসে বলেন, মওলানা ভাসানী এলে লোকে লোকারণ্য হয় বিমানবন্দর। মওলানা এখানে কিংমেকার বলে পরিচিত। এস্টাবলিশমেন্টের লোকও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। আমাকে সিভিল সোসাইটি পছন্দ করলেও এস্টাবলিশমেন্ট সোহরাওয়ার্দির শিষ্য বলে এক-আধটু এড়িয়ে চলে।
শেখ মুজিবের জন্য গভর্নর হাউসে থাকার ব্যবস্থা থাকলেও তিনি তার পছন্দের হোটেল মেট্রোপলে থাকতে পছন্দ করেন। ফলে সেখানেই থাকার বন্দোবস্ত। পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা ফয়েজ কাজি সবকিছু দেখাশোনা করছেন। রাশেদ তাঁর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিলেও মুজিবের বিশ্রাম নেই। একের পর এক দর্শনার্থী আসছে তাঁর কাছে।
রাশেদ বেশ বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেন, কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, সাংবাদিকদের ঢল নেমেছে সেখানে। বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অনেক নেতা এসেছেন দেখা করতে।
বেলুচিস্তানের নেতা বাজেঞ্জো বলেন, মুজিব ভাই, আর্মি টেকওভারের সমূহ সম্ভাবনা দেখছি।
সিভিল সার্ভিসের সদস্য হয়েও মালিক গুলাম জিলানি এসেছেন মতবিনিময় করতে। জিলানি বলেন, মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্ট বেঙ্গলি ইন্টেলেকচুয়ালিটিকে ভয় পায়। শেরেবাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দিকে ডিল করে তারা বুঝে গেছে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব।
বাজেঞ্জো মন্তব্য করেন, আমি নিজেও জমিদার। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মতো ল্যান্ড রিফর্ম যদি পশ্চিম পাকিস্তানে হয়, আমার তাতে সায় আছে।
মুজিব মন্তব্য করেন, পশ্চিম পাকিস্তানের আশরাফিয়া পূর্ব পাকিস্তানের আশরাফিয়াদের পদ-পদবি দিয়ে পাবলিককে দেখাতে চেয়েছে, এই দেখো বাঙালি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী! জনবিচ্ছিন্ন এসব লোককে দিয়ে কি জনপ্রতিনিধিত্ব হয় নাকি!
শেখ মুজিবের কিছু তরুণ ভক্ত ছিল। ওয়ারেস মীর, ইফতেখার। ওয়ারেসের বাবা কবি আর ইফতেখারের বাবা আফগান কার্পেটের মালিক। রাশেদ খানের সঙ্গে তাদের আড্ডা জমে যায়। মুজিব তাদের ডেকে নেন বড়দের আড্ডায়। তাদের কাছ থেকে যুগের হাওয়াটা বুঝতে চেষ্টা করেন। ম্যারাথন আড্ডার মাঝে মাঝেই খাবার পরিবেশিত হচ্ছিল।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের একজন নেতা একটু আক্ষেপ করে বলেন, মওলানা সাহেব আলাদা হয়ে যাওয়ায় আমাদের ঐক্যের ক্ষতি হয়েছে।
রাশেদ খান বলেন, আমার এলাকায় যখন মওলানা সাহেব এসেছিলেন, লিডারই তো নির্দেশ দিয়েছিলেন উনার জনসভা আয়োজন করতে। ফলে আত্মিক যোগাযোগ একই রকম আছে। আমাদের সবার লক্ষ্যই তো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। '৫৪-তে নির্বাচনী ফলাফল উপেক্ষা করে মনপছন্দ লোকেদের প্রধানমন্ত্রীর মিউজিক্যাল চেয়ারে বসিয়ে তো লাভ হয়নি। তাই আমরা চাই, জনগণের রায়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক।
মিউজিক্যাল চেয়ার শব্দবন্ধ শুনে কক্ষজুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়। এমন সময় মুজিবের বন্ধু এজাজ সিদ্দিকি এসে বলেন, সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে।
দুজন একটা গাড়িতে চড়ে পিএম হাউসে পৌঁছে দেখেন, বাগানে বসে চা পান করছেন সোহরাওয়ার্দি। হাত দিয়ে দুজনকে বসতে ইশারা করেন। বলেন, আমার আশা ও আশাভঙ্গের দিনগুলো সমাগত। প্যালেস কন্সপিরেসি একটা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেছে। রাষ্ট্রক্ষমতাটা আর্মি নিজের হাতেই রাখতে চায়। ফলে ওদের তো আমার মতো পলিটিশিয়ান দরকার নেই; দরকার পুতুল। আমাকে দিয়ে তো পুতুল নাচ হবে না, মুজিব।
--লিডার, আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছি।
--শোনো, এখন কমন ট্রেন্ড হচ্ছে পাকিস্তানে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তাকে ইন্ডিয়ার এজেন্ট বলে তকমা দেওয়া; আর ইন্ডিয়ায় কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তাকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে তকমা দেওয়া। এসব মাড স্লিংগিং করে দুই দেশেই কিছু লোক করে-কম্মে খাবে আরকি! সুতরাং আমরা চলব নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে; আমরা গণতন্ত্র দিয়েই এই অ্যান্টি-পিপল এস্টাবলিশমেন্টের জঞ্জালটা সরাব।
--আমাদের সংগঠন এখন অনেক বড়। পশ্চিম পাকিস্তানেও প্রত্যেকটা প্রদেশে আমাদের বন্ধু সংগঠন আছে। সিচুয়েশন যাই হোক, আমরা ফেস করব।
সোহরাওয়ার্দি এজাজকে বলেন, তোমার আব্বা ফোন করেছিল, বলল তোমার মাথায় যেন পলিটিকসের পোকা না ঢুকাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কই, পিএম হাউসে তো এলে না একবারও! সে উত্তর করল, তোমার আশার দিনে ভিড় করে লাভ কী; আশাভঙ্গের দিনে বরং আমার বাসায় এসো। লোকটা সেই এলাহাবাদ হাইকোর্টে প্র্যাকটিসের সময় থেকেই এমন। সে আর নেহেরু এক এলাকায় থাকত। এখনো বেশ বন্ধুত্ব আছে তাদের।
এজাজ মুজিবের দিকে তাকায়। দুজনে মুচকি মুচকি হাসে। সোহরাওয়ার্দি ডিনার করে যেতে বললে মুজিব বিনয়ের সঙ্গে বলেন, অল্প সময়ের জন্য এসেছি, লিডার। যতটা পারি জনসংযোগ করে যাই।
হোটেল মেট্রোপলে ফিরতেই ফয়েজ কাজি এসে জানান, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ মস্কো থেকে ফোন করেছিলেন। আবার করবেন বলেছেন।
মুজিব হেসে বলেন, আমার ফোনে তো আড়ি পাতা থাকে।
--পাশের রুমে, রাশেদ যেখানে আছে, ওখানে ফোন করবেন উনি।
সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতেই রাশেদ এসে খবর দেয়, কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ফোন করেছেন।
মুজিব ফোন ধরতেই ফয়েজ বলেন, আমার বাগানে এলে সখা, অথচ আমি নির্বাসনে!
মুজিব হেসে বলেন, কবি হয়েও ক্যু করতে গেলে, বসন্তের কোকিলেরা ছেড়ে দেবে বুঝি!
--এমন বসন্তের কোকিলরূপী ঈগল আসছে ধেয়ে।
--আমরা সেটাই দেখছি অবাক নয়নে চেয়ে।
--চিহ্ন দিও, চিহ্ন দিও মোরে, এসে পড়ব নিঃশব্দে সিংহদুয়ারে।
--লং লিভ রেভল্যুশন!
--লং লিভ রেভল্যুশন!



পাঠকের মন্তব্য