ধানমন্ডির বাড়িটায় আজ সকাল থেকে লোকজন আসছে। সাবেক সচিব, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুরোনো সহকর্মী। কেউ ফুল নিয়ে এসেছেন, কেউ স্মৃতি নিয়ে, কেউ এসেছেন সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে।
বাড়ির মালিক আশফাকুল হক তালুকদার মারা গেছেন ভোর পাঁচটা চল্লিশে। তার বয়স হয়েছিল পঁচাশি।
একসময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান—সিএসপির দাপুটে কর্মকর্তা। পাঞ্জাবের ঝিলাম জেলার ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের সচিব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার।
তাকে অনেকে শ্রদ্ধা করতেন। অনেকে ভয় পেতেন। আবার অনেকে ঘৃণাও করতেন। আশফাক সাহেবের অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। তার ধারণা ছিল, মানুষ তাকে পছন্দ করল কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি ঠিক কাজটি করলেন কি না, সেটাই আসল।
বাড়ির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন তার দীর্ঘদিনের পরিচারক আবুল মিয়া। চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে এই বাড়িতে আছেন। আশফাক সাহেবের জীবনের প্রায় সবকিছুর সাক্ষী। আবুলের চোখে পানি নেই। তার কান্না একটু দেরিতে আসে। সে শুধু বলল, ‘স্যার আর নাই।’ কথাটা এমনভাবে বলল, যেন সাহেব অফিসে গেছেন। ফিরতে একটু দেরি হবে।
১৯৪১ সালে ময়মনসিংহের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম আশফাকুল হক তালুকদারের। বাবা ছিলেন আইনজীবী। বাড়িতে ইংরেজি পত্রিকা আসত। ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ডিকেন্স, বার্নার্ড শ, রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্র পাশাপাশি থাকতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময়ই তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। ক্লাসে খুব বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু কথা বললে শিক্ষকরা শুনতেন। তার একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল—কোনো বিষয় একবার বুঝলে ভুলতেন না। ১৯৬৪ সালে সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। পরিবারের আনন্দ দেখে বাবা বলেছিলেন, ‘এবার আমাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল হলো।’
আশফাকের উত্তর ছিল, ‘বংশের মুখ উজ্জ্বল করার দায়িত্ব আমার একার না, আব্বা। নিজের কাজটা আমি ভালোভাবে করতে চাই।’
বাবা সেদিন আহত হয়েছিলেন। ছেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনোদিন খুব সহজ হয়নি।
পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ শেষে পূর্ব পাকিস্তানে কয়েকটি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। পরে বদলি হয়ে গেলেন পাঞ্জাবের ঝিলাম জেলায়। ডেপুটি কমিশনার হিসেবে। একজন বাঙালি কর্মকর্তা, পাঞ্জাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বে। প্রথম দিকে স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে একটু সন্দেহের চোখে দেখতেন। একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘স্যার, আপনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছেন?’
আশফাক বলেছিলেন, ‘না। আমি ঢাকা থেকে এসেছি। পূর্ব পাকিস্তান একটা প্রশাসনিক পরিচয়। ঢাকা আমার বাড়ি।’
লোকটি আর কথা বাড়ায়নি।
ঝিলামে আশফাকের প্রশাসনিক দক্ষতা দ্রুত পরিচিতি পেল। সেচ প্রকল্প, ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় বিরোধ, আইনশৃঙ্খলা—সবকিছুতেই তার নজর ছিল। সকাল আটটায় অফিসে ঢুকতেন। ফাইল পড়তেন মন দিয়ে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আর পেছনে তাকাতেন না। তার কালো ডায়েরিতে প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত লেখা থাকত। প্রথম পাতায় নিজের হাতে লিখেছিলেন:
Administration is about decisions, not excuses.
প্রশাসন অজুহাতের জায়গা নয়, সিদ্ধান্তের জায়গা।
ঝিলামের মানুষ তাকে ভয় পেত। একবার এক স্থানীয় প্রভাবশালী জমির মালিক তার কাছে তদবির করতে এসে বলেছিলেন, ‘ডেপুটি কমিশনার সাহেব, আমার পরিবার এই অঞ্চলে বহু বছর ধরে সম্মানিত।’
আশফাক ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলেছিলেন, ‘আপনার পরিবারের ইতিহাস দিয়ে জমির মালিকানা প্রমাণ হয় না।’
লোকটি আর দ্বিতীয়বার আসেনি।
আশফাকের কাছে আইন ছিল আইন। আত্মীয়, বন্ধু, প্রভাবশালী—কেউ বিশেষ সুবিধা পেত না। কিন্তু তার এই কঠোরতার মধ্যে এক ধরনের অহংকারও ছিল। তিনি মনে করতেন, অন্যরা ভুল করে, তিনি করেন না। তিনি অন্যদের চেয়ে উত্তম।
ঝিলামে তার সঙ্গে স্ত্রী নাজমা বেগমও থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা মেয়ে। শান্ত, রুচিশীল, সুন্দরী। স্বামীর চাকরি নিয়ে গর্ব ছিল, কিন্তু স্বামীর স্বভাব নিয়ে অভিযোগও কম ছিল না। আশফাক বাড়িতে ফিরতেন দেরি করে। অতিথিদের সামনে স্ত্রীর কথা কেটে দিতেন। নাজমা কিছু বললে বলতেন, ‘তুমি আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার করো।’
নাজমা একবার বলেছিলেন, ‘তোমার কাছে মানুষের অনুভূতির কোনো দাম নেই?’
আশফাক উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দাম আছে। তবে সব অনুভূতির মূল্য এক না।’
নাজমা আর কথা বলেননি।
১৯৭০ সালের শীত। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময় ঘনিয়ে এসেছে। প্রথম সন্তান ছেলে, রায়হান। এবার মেয়ে হবে বলে নাজমার ধারণা। প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দিল। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করলেন। শেষ পর্যন্ত নাজমাকে বাঁচানো গেল না। কিন্তু শিশুটি বেঁচে গেল।
খবর পেয়ে আশফাক হাসপাতালে এলেন। ধূসর স্যুট পরা। হাতে সিগারেট। ডাক্তার বললেন, ‘আমরা দুঃখিত। আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো যায়নি।’
আশফাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাচ্চা সুস্থ আছে?’
‘জি।’
‘ভালো।’
এরপর তিনি করিডরের একটি চেয়ারে বসে পড়লেন। মেয়ের নাম রাখলেন নওরীন।
সেদিন রাতে তিনি কাঁদেননি। পরদিন স্ত্রীর ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সই করেছেন, সন্তানের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। হাসপাতালের এক নার্স পরে বলেছিলেন, এমন ঠান্ডা মাথার মানুষ তিনি জীবনে দেখেননি।
আবুল মিয়া অবশ্য অন্য কথা জানে। বহু বছর পর এক রাতে আশফাক সাহেবের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে সে দেখেছিল, সাহেব নাজমা বেগমের একটা পুরোনো শাড়ি হাতে নিয়ে বসে আছেন। ঘরের আলো নেভানো। আশফাক সাহেব তাকে দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি যাও।’ আবুল চলে গিয়েছিল।
নাজমার মৃত্যুর পর আশফাক আর বিয়ে করেননি। আত্মীয়স্বজন অনেক বোঝালেন। সন্তানদের কথা বললেন। সংসার সামলানোর কথা বললেন। তিনি রাজি হলেন না। তার যুক্তি ছিল, ‘একজন মানুষকে হারানোর পর আরেকজনকে দিয়ে সেই জায়গা পূরণ করা যায় না।’
কথাটা শুনতে সুন্দর। কিন্তু একজন বিপত্নীক পুরুষের নিঃসঙ্গতা শুধু স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তৈরি হয় না। রাতে বাড়ি ফিরে কথা বলার মানুষ থাকে না। অসুখ হলে ওষুধ এগিয়ে দেওয়ার কেউ থাকে না। সন্তানের কৈশোরের জটিলতা, মেয়ের প্রথম পিরিয়ড, ছেলের প্রথম প্রেম, স্কুলের অভিমান—এসব বিষয়ে বাবারা সব সময় যথেষ্ট হন না। আত্মীয়রা প্রথম দিকে পাশে থাকে, পরে নিজেদের সংসারে ফিরে যায়।
আশফাকও একসময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। তবে তিনি নিঃসঙ্গতা স্বীকার করতে পছন্দ করতেন না। সন্ধ্যায় তার বিদেশি স্কচের গ্লাসে বরফ থাকত দুটি। পরিমিত পান করতেন, দুই পেগ প্রতি রাতে। কখনো একা, কখনো অতিথির সঙ্গে। কিন্তু এই নিয়মের হেরফের হতো না।
তার জীবনে নারীও এসেছেন। কেউ পুরোনো বন্ধু, কেউ শিল্পী, কেউ সহকর্মী, কেউ বিদেশি কূটনৈতিক অফিসের স্টাফ। সম্পর্কগুলো নিয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতেন না। তার ধারণা ছিল, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের হিসাব অন্য কাউকে দিতে হয় না।
সমস্যা হলো, তার সন্তানদের সামনে একদিন এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার উত্তর আশফাকের কাছেও ছিল না।
নাজমার মৃত্যুর প্রায় দশ বছর পর আশফাকের জীবনে এলেন তার নিজের ফুপাতো বোন শায়লা। শায়লা তখন বিবাহিত। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। পুরোনো পারিবারিক স্মৃতি, নাজমার কথা, আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর—এসব নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হলো। তারপর সম্পর্কটা অন্য দিকে গেল। শায়লার সঙ্গে আশফাকের অবৈধ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
একদিন রায়হান হঠাৎ বাড়িতে এসে এমন একটি পরিস্থিতি দেখে ফেলল, যার ব্যাখ্যা দেওয়ার ভাষা আশফাকের কাছে ছিল না। রায়হান বাবাকে বলেছিল, ‘তুমি বিয়ে করোনি। বলেছিলে মায়ের জায়গা কাউকে দেবে না। তাহলে এটা কী?’
আশফাক বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তোমার এত প্রশ্ন কেন?’
‘কারণ তুমি আমাদের মিথ্যা বলেছ।’
‘আমি তোমাদের কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।’
সেদিন নওরীনও বাড়িতে দেরিতে ফিরেছিল। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘মা মারা যাওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম তুমি আমাদের জন্য বিয়ে করোনি। এখন বুঝছি, বিয়ে না করার পেছনে অন্য কারণও ছিল।’
আশফাক রেগে গিয়েছিলেন।
‘তোমরা বড় হয়েছ। আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নীতিবাক্য শোনাবে না।’
কয়েক মাস পর শায়লার সঙ্গে সম্পর্কেও সমস্যা তৈরি হলো। আশফাক বুঝতে পারলেন, সম্পর্কটি তার সামাজিক অবস্থান ও পারিবারিক সম্মানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। একসময় তিনি শায়লাকে জীবন থেকে সরিয়ে দিলেন। ফোন ধরা বন্ধ, দেখা করা বন্ধ। পারিবারিক অনুষ্ঠানেও এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন।
শায়লা একবার ফোনে বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ, আশফাক।’
আশফাক বলেছিলেন, ‘এইসব ইমোশনাল নাটক আমার পছন্দ নয়।’
বলে ফোন রেখে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাটাই রায়হান ও নওরীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে স্থায়ী দেয়াল তুলে দিল। সন্তানদের আপত্তি শুধু বাবার প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ছিল না। আপত্তি ছিল তার দ্বিচারিতা নিয়ে। তিনি বিয়ে করবেন না, কারণ মৃত স্ত্রীকে সম্মান করেন—এমন একটা ধারণা সন্তানদের মনে তৈরি করেছিলেন। অথচ নিজের সুবিধামতো সম্পর্ক গড়েছেন, আবার ধরা পড়ে গেলে নারীটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন।
রায়হান একদিন বলেছিল, ‘বাবা, তুমি মায়ের স্মৃতির চেয়ে নিজের সম্মানকে বেশি ভালোবেসেছ।’
আশফাক কোনো উত্তর দেননি। সেদিন রাতে তার স্কচের গ্লাসে পানীয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রশাসনিক চাকরি ছেড়ে আশফাক বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসনে যোগ দিলেন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দায়িত্ব পালন করে ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে এলেন। উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব।
তার ফাইলের নোট ছিল বিখ্যাত। তিন পৃষ্ঠার বিশ্লেষণও লিখতে পারতেন, আবার কখনো একটি লাইনেই কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতেন। একবার এক কর্মকর্তা একটি দুর্বল প্রস্তাব নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলেন। আশফাক ফাইলের ওপর লিখলেন:
The proposal is unacceptable. The officer should know why.
কর্মকর্তাটি তিন দিন ঘুমাতে পারেননি।
আশফাক দুর্নীতি অপছন্দ করতেন। কিন্তু মানুষের দুর্বলতাকে ক্ষমা করতেন না। অধস্তনরা তাকে ভয় পেতেন। কেউ কেউ শ্রদ্ধা করতেন। তার সম্পর্কে সচিবালয়ে একটা কথা চালু ছিল—আশফাক সাহেবের ঘরে ঢোকার আগে ফাইলের সব পাতা পড়ে যেতে হয়। কারণ তিনি এমন প্রশ্ন করবেন, যার উত্তর দিতে না পারলে পরের দিন নিজের মুখ দেখানো কঠিন হয়ে যায়।
একজন সহকর্মী তাকে বলেছিলেন, ‘আশফাক, আপনার সঙ্গে কাজ করা খুব কঠিন।’
তিনি বলেছিলেন, ‘চাকরিতে এসেছেন কাজ করতে, শান্তি পেতে নয়।’
কেউ কেউ তাকে পছন্দ করতেন না। পেছনে অহংকারী বলতেন। কেউ বলতেন, লোকটা প্রতিভাবান, কিন্তু হৃদয় বলে কিছু নেই। আবার সেই লোকেরাই তার সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসার সাহস পেতেন না।
আশফাক জানতেন মানুষ তাকে ভয় পায়। এতে তার আপত্তি ছিল না। বরং তিনি মনে করতেন, প্রশাসনে অতিরিক্ত জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করাটাই বিপজ্জনক।
ছেলে রায়হান এখন লন্ডনে। স্পেশালিস্ট ডাক্তার। ওর স্ত্রীও বাঙালি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ চিকিৎসক। ওদের দুই সন্তান। বাবার সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কিন্তু সম্পর্কটা অনেকটাই ফরমাল। বাবার অসুখের খবর পেয়ে বহুবার বলেছে, ‘লন্ডনে চলে আসেন। এখানে চিকিৎসা ভালো হবে।’
আশফাকের উত্তর, ‘আমি ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাব না।’
‘আপনি একা থাকেন।’
‘আবুল আছে না?’
‘আবুল তো ডাক্তার না।’
‘তুমিও তো আমার ডাক্তার নও। তুমি লন্ডনের ডাক্তার।’
রায়হান ফোনের ওপাশে চুপ করে থাকত।
মেয়ে নওরীন থাকে কানাডায়। স্থানীয় কাউন্সিলের মেয়র। সামনে ফেডারেল নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে ওর। বাবার মতোই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, তবে বাবার চেয়ে অনেক বেশি আবেগী। নওরীন বছরে একবার দেশে আসত। বাবাকে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। আশফাক বলতেন, ‘তুমি তোমার নির্বাচন সামলাও। আমার বয়সে এসে নতুন দেশ দেখার দরকার নেই।’
নওরীন বলত, ‘তুমি কখনো কাউকে নিজের কাছে আসতে দাওনি, বাবা।’
আশফাক বলতেন, ‘সবাইকে কাছে রাখলে কাজ করা যায় না।’
‘সবকিছু কাজ না, বাবা।’
‘তোমার মা থাকলে বুঝতে।’
এই কথাটার পর নওরীন আর তর্ক করত না।
আশফাকের একটা পুরোনো অভ্যাস ছিল। নওরীন ফোন করলে কথা শেষ হওয়ার আগে বলতেন, ‘তোমার মায়ের ছবিটা দেখেছ আজ?’
নওরীন বলত, ‘দেখেছি।’
‘ভালো।’
তারপর ফোন রেখে দিতেন। মেয়েটি বুঝতে পারত না, বাবা আসলে মায়ের কথা বলছেন, নাকি নিজের।
শেষ কয়েক বছর আশফাকের শরীর ভেঙে পড়েছিল। হাঁটতে কষ্ট হতো। কিডনির সমস্যা ছিল, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা ছিল। চিকিৎসকেরা নিয়মিত পরীক্ষা করতে বলতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার শরীরের ওপর আমারই বেশি অধিকার।’
আবুল মিয়া ছাড়া বাড়িতে তেমন কেউ ছিল না। একদিন আবুল জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, আপা আর সাহেব কবে আসবে?’
আশফাক বলেছিলেন, ‘যখন তাদের সময় হবে।’
‘আপনার তো তাদের জন্য মন খারাপ করে।’
‘তুমি আবার আমার মন পড়তে শিখেছ?’
আবুল মাথা নিচু করেছিল। তারপর আশফাক নিজেই বলেছিলেন, ‘রায়হানকে ফোন করো। ওর ছেলেটার জন্মদিনে একটা উপহার পাঠাতে হবে।’
আবুল জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী পাঠাবেন?’
‘একটা ভালো ঘড়ি। ওর বাবার মতো সময় নষ্ট না করুক।’
কথাটা বলে তিনি হেসেছিলেন। এমন হাসি তার মুখে খুব কম দেখা যেত।
একদিন গভীর রাতে আবুল ঘরে ঢুকে দেখেছিল, সাহেব নাজমা বেগমের ছবির সামনে বসে আছেন।
‘স্যার, ঘুমাবেন না?’
আশফাক ছবির দিকে তাকিয়েই বলেছিলেন, ‘আবুল, মানুষ মারা গেলে তার সঙ্গে ঝগড়া করা যায় না কেন?’
আবুল প্রশ্নটা বুঝতে পারেনি।
‘জি?’
‘কিছু না। যাও।’
আবুল চলে এসেছিল। পরদিন সাহেবের আচরণে কোনো পরিবর্তন ছিল না।
আজ ভোরে তিনি মারা গেলেন। ঘুমের মধ্যেই। আবুল প্রথমে ভেবেছিল সাহেব ঘুমাচ্ছেন। পরে ডাক্তার ডেকে আনল। সকাল আটটার দিকে লন্ডনে ফোন করা হলো। লন্ডনে তখন গভীর রাত।
রায়হান ফোন ধরল।
‘আবুল, বাবা কেমন আছেন?’
আবুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘স্যার আর নাই।’
ওপাশে নীরবতা। তারপর রায়হান বলল, ‘আমি আসতে পারব না। হাসপাতালের ডিউটি আছে। বাচ্চাদেরও পরীক্ষা আছে। তোমরা দাফন করে ফেলো।’
আবুল বলল, ‘জি।’
ফোন কেটে গেল।
কিছুক্ষণ পর কানাডা থেকে নওরীনের ফোন এলো।
‘আবুল, বাবা মারা গেছেন?’
‘জি আপা।’
‘আমি আসতেছি। ফার্স্ট ফ্লাইটে।’
পরদিন বিকেলের দিকে নওরীন এসে পৌঁছাল। লাশ ফ্রিজার ভ্যানে রাখা ছিল। পরদিন আনা হলো তার বেডরুমে। বাবার ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে দাঁড়াল নওরীন। আশফাকের মুখ শান্ত। মনে হচ্ছে একটু পরেই চোখ খুলে বলবেন, ‘এত দেরি করলে কেন?’
নওরীন বাবার হাত ধরল।
‘বাবা, আমি এসেছি।’
কোনো উত্তর নেই। সে কাঁদতে শুরু করল।
‘তুমি আমাকে একবারও বললে না, বাবা, তোমার আমাকে দরকার। একবারও না।’
আবুল দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হলো, এই বাড়িতে এত বছর ধরে যে মানুষটা সবাইকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, আজ তার জন্যই সবাই এত দূরে।
আসর নামাজের পর জানাজা হলো। পুরোনো সহকর্মীরা এলেন। সাবেক মন্ত্রী, সচিব, সামরিক কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন বললেন, ‘আশফাকের মতো মেধাবী অফিসার আর দেখিনি।’ আরেকজন বললেন, ‘কঠিন মানুষ ছিলেন। তবে কাজের লোক।’ একজন পুরোনো বন্ধু নিচু গলায় বললেন, ‘নিজের জীবনটা একটু অন্যভাবে চালালে ভালো হতো।’ কথাটা কেউ শুনল না।
কবরের পাশে নওরীন দাঁড়িয়ে ছিল। যখন বাবাকে কবরে নামানো হলো, সে নিজেকে সামলাতে পারল না। মাটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
‘বাবা, তুমি এত অভিমান নিয়ে চলে গেলে? আমি তো তোমার মেয়ে। তোমার সঙ্গে আমার কত কথা বাকি ছিল!’
কেউ তাকে ধরে তুলতে গেল। সে উঠল না।
রায়হান তখনও লন্ডনে। তার পাঠানো একটি মেসেজ আবুলের ফোনে এসেছে:
Please take care of everything. I am sorry.
আবুল মেসেজটি নওরীনকে দেখায়নি।
কবরের মাটি দেওয়া শেষ হলে সবাই ধীরে ধীরে চলে গেল। নওরীন তখনো বসে।
‘আবুল, বাবা কি আমার কথা বলতেন?’
আবুল একটু ভেবে বলল, ‘বলতেন আপা।’
‘কী বলতেন?’
‘আপনার মেয়র হওয়ার খবর পেয়ে খুব খুশি হইছিলেন। কাউরে বুঝতে দেন নাই।’
নওরীন চোখ মুছল।
‘আর কিছু?’
আবুল বলল, ‘একদিন আপনার একটা বক্তৃতা টেলিভিশনে দেখছিলেন। শেষ হওয়ার পর আমাকে বললেন, মেয়েটা আমার চেয়ে ভালো কথা বলতে পারে। এমপি হয়েও যাইতে পারে।’
নওরীন আবার কেঁদে উঠল।
‘আর মা? মায়ের কথা বলতেন?’
আবুল একটু চুপ করে রইল।
‘বলতেন আপা। তবে খুব কম।’
‘কী বলতেন?’
‘একদিন বলছিলেন, নাজমা থাকলে এই মেয়েটারে এত দূরে যেতে দিত না।’
নওরীন এবার মুখ ঢেকে কাঁদল।
বাড়িতে ফিরে আবুল সাহেবের ঘর গোছাতে গেল। টেবিলের ওপর কালো ডায়েরিটা পড়ে আছে। শেষ পাতায় কয়েকটি লাইন লেখা:
Children are not our property. They are our unfinished stories.
সন্তান আমাদের সম্পত্তি নয়। তারা আমাদের অসমাপ্ত গল্প।
আবুল ইংরেজি খুব ভালো বোঝে না। তবু কথাটার অর্থ আন্দাজ করতে পারল। সে ডায়েরি বন্ধ করে রাখল।
তারপর জানালার পাশে দাঁড়াল। ধানমন্ডির আকাশে সন্ধ্যা নামছে। দূরে গাড়ির হর্ন। পাশের বাড়িতে টেলিভিশন চলছে।
এই বাড়িতে আজ থেকে আর কেউ সন্ধ্যায় স্কচের গ্লাসে বরফের টুকরো গুনবে না। কেউ বলবে না, চায়ে চিনি কম হয়েছে। কেউ আবুলকে ডেকে বলবে না, ‘কালো ডায়েরিটা দাও।’
আশফাকুল হক তালুকদার জীবনে অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিছু সঠিক, কিছু ভুল। অনেক মানুষের ভাগ্য বদলেছেন। কয়েকজনকে কষ্ট দিয়েছেন। স্ত্রীকে হারিয়ে আর বিয়ে করেননি, কিন্তু নিঃসঙ্গতা সামলাতে গিয়ে এমন কিছু করেছেন, যা তার সন্তানদের কাছে তাকে ছোট করে দিয়েছে।
তিনি ছিলেন মেধাবী কর্মকর্তা, কঠিন বাবা, একগুঁয়ে স্বামী। মানুষ তাকে ভয় পেত। কেউ কেউ সেই ভয়কে শ্রদ্ধা বলে চালিয়ে দিত। আবার অনেকে আড়ালে ঘৃণা করত। তিনি সব জানতেন। তবু নিজের স্বভাব বদলাননি।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অন্যের সমস্যা বিশ্লেষণ করেছেন। নিজের সমস্যাগুলোর দিকে তাকানোর সময় পাননি, অথবা চাননি।
আবুল মিয়া রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানাল। চিনি দিল না। সাহেব চিনি ছাড়া চা খেতেন না। তবু আজ চিনি দিতে ইচ্ছে হলো না। কাপটা এনে টেবিলে রাখল। তারপর আস্তে বলল,
‘স্যার, চা ঠান্ডা হইয়া যাইতেছে।’
কোনো উত্তর এল না।
রাতের দিকে নওরীন বাবার ঘরে ঢুকল। আলমারির ওপর মায়ের ছবিটা নামিয়ে বিছানায় বসল। ছবিতে নাজমা হাসছেন। নওরীন ছবির কাচে হাত বুলিয়ে বলল, ‘মা, তুমি থাকলে বাবা এমন হতো?’
কেউ উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ পর সে বাবার বালিশে মুখ রাখল। সেখানে পুরোনো আফটারশেভের গন্ধ। খুব পরিচিত একটা গন্ধ। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার আগে বাবা এই গন্ধ মেখে তার কপালে হাত রাখতেন। সেই হাত অনেক বছর তার মাথায় পড়েনি।
বাইরে আবুল মিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে দেখল, নওরীন বাবার বালিশ আঁকড়ে ধরে কাঁদছে।
আশফাক সাহেব জীবনে অনেক কিছু জিতেছেন। সিএসপি হয়েছেন, পাঞ্জাবের জেলা শাসন করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সচিব হয়েছেন, অসংখ্য মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করেছেন। তার মেধা নিয়ে কারও প্রশ্ন ছিল না। তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে ছিল বিস্তর ভয়।
আশফাকুল হক তালুকদার সারা জীবন মানুষকে শাসন করেছেন। শুধু একবার যদি মেয়েকে কাছে টেনে বলতেন, ‘নওরীন, আমি খুব একা হয়ে গেছি’—তাহলে হয়তো তার শেষ বয়সটা এত নিঃসঙ্গ হতো না।
কিন্তু কিছু কথা মানুষ সারাজীবন বলতে পারে না। বিশেষ করে যারা সারা জীবন নিজেদের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখে।
ধানমন্ডির বাড়িতে সেদিন রাতে একটি ঘড়ি চলছিল। টিক টিক টিক। আবুল মিয়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঘড়িটা বন্ধ করে দিল।
সাহেবের আর সময়ের দরকার নেই।



পাঠকের মন্তব্য