রাশেদ খান স্টেশন রোডে তাদের কয়েকটি দোকানঘরে বাতেন, আক্কাছ, মখলেছ ও মফিজের জন্য ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেয়। বই ও স্টেশনারির দোকান, মনোহারি সামগ্রীর দোকান, মুদি দোকান, রড-সিমেন্টের দোকান নিয়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায় মন দেয়। ফলে চাঁদাবাজি না করে উল্টো দোকানের উপার্জন থেকে পার্টির জন্য চাঁদা দিতে শুরু করে তারা। অসিত পালের মিষ্টির দোকানের পাশেই বাতেনদের দোকান হওয়ায় আড্ডার একটা চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয় সেখানে। অসিত পাল সারাদিন রেডিওতে গান শোনে। আব্বাসউদ্দীনের পল্লিগীতি থেকে শুরু করে বাংলা-হিন্দি-উর্দু গান বাজে বিভিন্ন রেডিও চ্যানেলে। মাঝে মাঝে খবর শুনতে দাঁড়িয়ে পড়ে অনেকে।
রাশেদ খান তার পার্টির ছেলেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়ায় পয়সারহাট বাজারের অন্যান্য দোকানিরা একটু শান্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ পায়। ফলে তারা নিজেরাই পার্টিকে চাঁদা দিতে শুরু করে।
কৃষ্টি সংসদে বিকেলবেলা সুলতানা ও কল্পনা স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংগীত ও নাট্যচর্চার ব্যবস্থা করে। শ্যামাপদর সম্পাদনায় যুগের বার্তা প্রকাশিত হতে শুরু করে। দধীচি কাব্য আন্দোলনের সদস্যরা ব্যবসা-বাণিজ্যে থিতু হওয়ায় নিয়মিত সাহিত্য ও কলাম রচনা করে যুগের বার্তাকে দ্রুতই বেশ জনপ্রিয় করে ফেলে।
কলিম চৌধুরী যুগের বার্তা পড়তে পড়তে বলেন, পত্রিকা আমার বাড়ির আঙিনা থেকে প্রকাশিত হলেও পয়সারহাটের অনুন্নয়ন নিয়ে দেখছি, এরা আমার বিরুদ্ধেও লেখে।
সলিম খান হাসতে হাসতে বলেন, প্রশ্ন নয়, শুধু প্রশংসা করলে তো আর সেইটা পত্রিকা হয় না, চৌধুরী।
পয়সারহাটে একটা ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়ায় মধুমতীর আলোর সম্পাদক মুকুল শর্মা একটু ঘাবড়ে যায়। অধ্যক্ষ আজিজুল হককে জিজ্ঞেস করে, কী করা যায়, স্যার! প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা এসে পড়ায় পাঠক আজকাল মধুমতীর আলো কম পড়ছে।
আজিজুল হক বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষ্টি সংসদ, যুগের বার্তা পত্রিকা নিয়ে যেভাবে গুছিয়ে বসেছে ওরা, পুরোনো দাতব্য চিকিৎসালয় সংস্কার করে রাশেদ খান সেখানে রোগী দেখছে, বিনা পয়সায় ওষুধ দিচ্ছে, শ্যামাপদ ও কল্পনা যেভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির লক্ষ্যে কাজ করছে, তাতে ওদেরকে তো আর ডানপন্থী বলে তকমা দিয়ে খারিজ করে দেওয়া যাচ্ছে না। আমাদের এখন মোল্লা আব্বাস আর তার মাদ্রাসা নিয়ে স্টোরি করতে হবে। আব্বাস প্রতিদিন কী কী ভুলভাল কথা বলে, মাদ্রাসা কীভাবে ইসলামাইজেশন করছে, এইসব বিষয় নিয়ে এখন আমাদের ব্যস্ত হতে হবে। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সপ্তাহ পালন করতে হবে মিছিলে, গানে, পথনাটকে, মোমবাতি প্রজ্বালনে ও ক্রোড়পত্র প্রকাশে।
মোল্লা আব্বাস মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর মাঝে মাঝে তার ছাত্রদের নিয়ে মৌন মিছিল করে। মুকুল শর্মা ওই মিছিলের বেশ কয়েকটা ছবি দেখায় অধ্যক্ষ আজিজুল হককে। অধ্যক্ষ ছবি দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ক্যাপশন হবে, ধেয়ে আসছে বখতিয়ার খিলজি ও তার সপ্তদশ অশ্বারোহী। রনজু, জগন্ময় আর মতিকে লাগিয়ে দিন; তারা উপহাস ও বিদ্রুপের স্বরে কলাম লিখুক। মোল্লা আব্বাসকে ইসলামের প্রধান প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র করে ফেলে দিনমান তাকে ও ইসলামকে নিয়ে হাসাহাসি করলে সেই হাসাহাসিটাই প্রগতিশীলতার প্রধান উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মুকুল শর্মা মৃদু হেসে বলে, পাকা বুদ্ধিতে আপনি তো স্যার প্রণব মুখার্জিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।
হন্তদন্ত হয়ে চারণ কবি রজব আলী এসে খবর দেয়, শেখ মুজিব নাকি রাশেদ খানকে ঢাকায় ডেকেছেন, তাকে নিয়ে করাচি যাবেন।
অধ্যক্ষ আজিজুল হক বলেন, কেউ পশ্চিম পাকিস্তানে যাবে শুনলে আমার হড়হড় করে বমি করে দিতে ইচ্ছা করে।
মুকুল শর্মা প্রস্তাব দেয়, স্যার, আপনি একটা কলাম লিখুন। কীভাবে পূর্ববঙ্গের নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অংশ হয়ে পড়ছে। তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের অধিকারের কথা বলবে কে! প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর ব্যর্থতার একশো একটি দিকও তুলে ধরতে পারেন, স্যার।
রাশেদ খান মুজিবের সমভিব্যাহারে করাচিতে যাচ্ছে শুনে মোল্লা আব্বাস এই সময়টাতে আবার কাদিয়ানি-বিরোধী সমাবেশের প্রস্তুতি নেয়। মোল্লা আব্বাসের সমাবেশের খবর শুনে অধ্যক্ষ আজিজুল হক সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সপ্তাহ পালনের প্রস্তুতি নিতে বলেন কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রকে।
যুবসংগঠনের নেতা বাতেন ঘোষণা দেয়, চুলকানি সেইটা আব্বাসের হোক আর মধুমতীর আলোর হোক, রাশেদ ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে পয়সারহাটের শান্তি-সম্প্রীতির বিরুদ্ধে যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।



পাঠকের মন্তব্য