আমার প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব

৮১০ পঠিত ... ১৬:২৯, জুন ১২, ২০২১

shakib-priyo-cricketer

আমার প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব; বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডারের দৃষ্টিনন্দন ক্রিকেটের ভক্ত না হয়ে উপায় আছে কী; তার ক্রিকেটের ভাষার শক্তিই তার ফ্যান ক্লাব তৈরী করেছে। ক্রিকেটারদের যত বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ে; তত তারা পরিশীলিত হন। কারণ 'আইকন' হিসেবে তারা যেহেতু বিপুল-সংখ্যক তারুণ্যের জীবন ও আচরণকে প্রভাবিত করেন; তাই তাদের দায়িত্বের জায়গাটা বাড়তে থাকে।

সাকিবের ক্ষেত্রে ঘটনাটা ঘটেছে উলটোরথে; সাকিবের যত বয়স বেড়েছে; ততই দুর্বিনীত হয়ে পড়েছেন উনি। আমাদের বাংলাদেশ মহল্লায় ও দক্ষিণ এশিয়াতে মানুষের একটু প্রতিষ্ঠা এলেই; একটা সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট এসে পড়ে। অষ্টাদশ শতকের সামন্ত প্রভুদের যেমন এটিচ্যুড ছিলো; তিনি 'নাচো' বললেই জনপদ নাচবে; তিনি 'কাঁদো' বললে সবাই ভেউ ভেউ করে কাঁদবে; তিনি 'খামোশ' বললেই সবাই চুপ করে যাবে। আর তাদের সহমত ভাইয়েরা এই প্রতিটি আচরণের জাস্টিফিকেশান দেবে।

এরকম কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাম্প্রতিকতম সামস্ত- মানুষ সাকিব। তিনি গতকাল করোনাকালে আয়োজিত এক ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে 'ক্ষেইপা' উঠলেন; উইকেটগুলো হাত দিয়ে উপড়ে ফেললেন; পদদলিত করলেন উইকেটগুলোকে। কী মনে করে একটা উইকেট পুঁতে দিয়ে রাইগা-মাইগা ছুইটা গেলেন সাজঘরের দিকে। সেইখানে আরেক সিনিয়ার এক ক্রিকেটারকে পোচন্ড রাগ দেখিয়ে 'কুস্তি' লড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে; অন্য খেলোয়াড়রা তাকে জাপটে ধরে; সিনক্রিয়েট থেকে তাকে বিরত রাখতে চেষ্টা করলেন। পরে এইসব অ-খেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য 'ক্ষমা' চেয়ে এও জানিয়ে দিলেন, সব কিছু মিটমাট হয়ে গেছে। আমরা 'এই রেগে উঠি; এই কুস্তি লড়তে চাই; আবার জাপটাইয়া ধইরা মিটমাট করি ছোটখাট পঞ্চায়েতের আসরে। এক্সট্রিম বাই-পোলার ডিজ-অর্ডারের লক্ষণকে আমরা আমাদের কৃষ্টি বলে মেনে নিয়েছি যেন।

কিছুদিন আগে ক্রিকেট জুয়াড়ির সঙ্গে ফোনে অক্ষরালাপের দায়ে দুই বছরের শাস্তি ভোগ করে ফেরা সাকিব গতকালের 'উইকেট রাগ সংগীতের উচ্চাঙ্গ নৃত্য' দেখিয়ে আরো যেন স্পষ্ট করে দিলেন যেন; তিনি শাস্তির জন্য ভীষণ যোগ্য ছিলেন।

সাকিবের এই সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট হচ্ছে; তিনি যেহেতু প্রতিভাবান; তাই তার যে কোন আচরণই মুখ বুঁজে মেনে নিতে হবে। এই গ্রামে যে গরু দুধ দেয়; তার লাথি তো খেতেই হবে। তরুণ প্রজন্ম খুবই অনুকরণ প্রিয়; তারা নায়কোচিত আচরণ মানেই 'সাকিব'-এর উদ্ধত আচরণকে বুঝে থাকে।

খেলোয়াড় দুইরকম হয়ে থাকে; হয় 'পেলে'-র মত প্রাতিষ্ঠানিক মানুষ; নয় 'ম্যারাডোনা'-র মতো প্রতিষ্ঠানবিরোধী মহামানুষ। হয় ক্রিকেটার শোয়েব এক্সপ্রেসের মতো শৃংখলাহীনতায় 'খসে' পড়া তারা; নয়তো ইমরান খানের মতো অনায়াসে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করা মানুষ। হয় সৌরভ গাঙ্গুলির মতো প্রতিষ্ঠানের স্নিগ্ধ মানুষ; নয়তো শচীন টেন্ডুলকারের মতো উদাস-দার্শনিক এক ভালোবাসার মানুষ।

সাকিবকে প্রতিষ্ঠানের বৃষ্টিভেজা সাঁঝে খিঁচুড়ির দাওয়াতে সপরিবারে 'আদরের ছেলে'-র ফটোসেশানে দেখা গেছে; ভোটসমনিয়ার নির্বাচনে প্রার্থী হবার আগ্রহী হতে দেখা গেছে। ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নের চেয়ে ৩০০টি জাতীয় ভি আইপি কাপের একটি কাপে চা-চু খাওয়ার স্বপ্নে আলোড়িত হতে দেখা গেছে। এক সাঁঝে রেষ্টুরেন্টে কী বিশাল অংকের বিল দেন; সেই এফলুয়েন্সের গল্পে অষ্টাদশ শতকের সামন্ত-আনন্দের জাল বুনেছেন। ক্রিকেট গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ে; এটাও প্রমাণ করে দিয়েছেন; গত এক দশকের একসেস টু টেকাটুকা (এটুটু) দর্শনের নৌকায় থিতু হয়েছেন তিনি। নবরত্নসভায় অনেক দেশের কিছু ক্রিকেটারকে দেখা যায়; কিন্তু সাকিব সেখানে বিদূষক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন 'মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি 'নুকা'! নুকা'র লোক'। ক্ষমতা-কাঠামোর লোক হিসেবে 'রাণীর আশীর্বাদ আর স্নেহে'র অগ্রদূত হিসেবে; 'সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট; বা প্রাধিকারের বোধ জনিত অতি আত্মবিশ্বাসে 'পরিমিত অহম'-এর মাত্রা ছাড়িয়ে অপরিমিত অহংকারের প্রকাশ করে চলেছেন; প্রতিটি পাবলিক এপিয়ারেন্সে।

আবাহনী বনাম মোহামেডান ম্যাচে তার আচরণ আবার প্রতিষ্ঠান বিরোধী। অনেকে আগ বাড়িয়ে এই অখেলোয়াড়সুলভ আচরণকে 'ক্রিকেটের ইনসাফের জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের লেবাস বলে ফুঁসে উঠেছেন। ক্রিকেট দুর্নীতির অভিযোগে সাজা পেয়ে আসা মানুষটি এখন ক্রিকেট দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইনকিলাব করছেন; কী পরাবাস্তব এই পৃথিবী!

পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পিকটি নট হয়ে; দুর্নীতি মন্দিরের 'রাজপুত্র'-দের ইনগ্রুপদের নিও এলিট ক্লাবে নাম লিখিয়ে; যে তিনি অগণতান্ত্রিক দুর্নীতি বসন্তের সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত; তাকে ক্রিকেট দুর্নীতির বিরুদ্ধে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে দেখলে; এটা এলিটফোর্সের হারকিউলিসের কাছে ন্যায় প্রার্থনার যে কলরব; তারই ক্রিকেট ন্যায় প্রার্থনার এক্সটেনশান বলে মনে হয়। সাকিব যেন দুর্নীতির আম্পায়ারকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে বেরিয়ে উইকেট উপড়ে ক্রসফায়ার করে; বিরাট ন্যায়বিচারের এভারেস্ট স্পর্শ করেছেন!

এই তো হয়; ধীরে ধীরে 'প্রতিবাদ', 'বিদ্রোহ', 'বিপ্লব', 'ন্যায়বিচার' এগুলোও ভীষণ সিলেক্টিভ বা সুবিধাজনক শব্দ হয়েছে আজকাল। ক্রিকেট ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হওয়া; নতুন কোন ঘটনা নয়। আফ্রিকীয় বংশোদ্ভুত একজন খেলোয়াড় আর দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভুত সাকিব; মাত্র এই দুজন ক্রিকেটার ক্রিকেট ম্যাচে এরকম আচরণ করলেন আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হওয়ায়। উগান্ডার ইদি-আমিনের দেহভঙ্গিতে যে ট্রাইবাল এঙ্গার দেখা যেতো; তা আফ্রিকার ঐ ক্রিকেটারের দেহভঙ্গিতে পরিলক্ষিত হয়েছিলো। ক্রিকেট স্বৈরাচারের দেহভাষাও বলা যায় একে। শাসকের ডোন্টকেয়ার ভাবটি ক্রিকেট কিং-এর আচরণে এসে যাওয়াটি নতুন কিছু নয়। আবাহনীর পক্ষে খেলার সময় ঠিক এমনি আম্পায়ারের ফেভারের বেনিফিশিয়ারি হয়েছেন। গতকাল মোহামেডানের পক্ষে খেলার সময়; আবাহনীর একই আম্পারিও ফেভার পাওয়ার ঘটনায় 'বিপ্লব' করেছেন। আম্পায়ার 'সহমত ভাই' হলে ঠিক আছে; আম্পায়ার 'ভিন্নমত ভাই' হলেই রেগে মেগে উইকেট উপড়াতে হবে!

তাই বলে ক্রিকেট শৃংখলার পরিপন্থী আচরণকে 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপ্লব' বলে জাস্টিফিকেশানের কুতর্কের দোকান খোলাটি; ছেলেমানুষি আর ইউফোরিয়ায় ভরা যুক্তিহীন একটি প্রবণতা। ব্যর্থ আচরণকে গ্লোরিফাই করলেও তা ব্যর্থ আচরণই হয়।

নিহিলিস্ট ম্যারাডোনা হতে গেলে বা ফুটবলের বিপ্লবী ঈশ্বর হতে গেলে; তাকে আপাদমস্তক প্রতিষ্ঠান বিরোধী হতে হয়। উচ্ছৃখল কবি বোদলেয়ার হতে গেলে; আমৃত্যু উচ্ছৃংখল আচরণের মাঝ দিয়েই রেখে যেতে হয় ক্লাসিক কবিতা; ক্ষ্যাপাটে মিকেল এঞ্জেলো হতে গেলে; জীবনচর্চায় সতত সেই রাগের সৃজনশীল সংগীত থাকতে হয়। মাতাল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বেহিসেবী হতে গেলে; আমৃত্যু সে বেহিসাবের চর্চা করে যেতে হয়। প্রতিষ্ঠান বিরোধী সঞ্জীব চৌধুরী হতে গেলে; প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় আত্মাহুতি দিতে হয়, 'আমি তোমাকেই বলে দেবো কী যে একা দীর্ঘরাত; আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে; ছুয়ে কান্নার রঙ; ছুয়ে জোছনার ছায়া।'

প্রয়োজনবোধে প্রতিষ্ঠানের আঁচলের নীচে মাথা পেতে দিয়ে রাজক্রিকেটারের আনন্দেও আছি; 'ন্যায়দণ্ডকে রাজদণ্ডে রূপান্তরের' জুয়াঘরের টিকেট পাওয়ার লাইনেও দাঁড়িয়ে আছি; আবার দুর্নীতির গন্ধমাদন পর্বত এড়িয়ে ক্রিকেট মাঠের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপ্লবের মুষিক প্রসব করবো; কী বিচিত্র এই দেশ জাস্টিফিকেশান সেলুকাস! ধর্মেও আছি; জিরাফেও আছি; আপোষেও আছি; বিপ্লবেও আছি; এ যে অতীন্দ্রিয় পিং পং বল।

৮১০ পঠিত ... ১৬:২৯, জুন ১২, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top