বাংলা ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম মিষ্টি ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কালের পরিক্রমায় বাংলা ভাষা আজ অনেকটাই বিকৃত। নানা দেশ, নানা জাতি ও নানা ঢংয়ের ভাষা বাংলার সাথে প্রতিনিয়ত মিশে যেমন বাংলাকে সমৃদ্ধ করছে, সেই সাথে বাংলাকে করেছে বিকৃত। বাংলা ভাষার বিকৃত রোধ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যে কালজয়ী যুক্তির সম্মুখীন হতে হয় তা হলো- যে অন্য ভাষা মিশে বাংলা সমৃদ্ধ হচ্ছে বলা হলে একই সঙ্গে বিকৃত রোধ নিয়েও কথা বলার দরকার কি? একেবারেই অকাট্য আর কি সুন্দর যুক্তি, তাই না? একই সাথে কোনো কাজে খারাপ-ভালো দুটোই হলে খারাপকেও ভালো ধরে নেওয়া ছাড়া শুধু শুধু নেতিবাচক দিক পড়ে থাকার কোনো মানে নেই! আসুন জানি কিভাবে বাংলা ভাষার বিকৃত রোধ করার যুক্তি আরো ভালোভাবে দাঁড় করানো যায়।
১. বাংলাকে পুরোপুরি ধার করা ভাষা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। যেহেতু এক ভাষা পরিবারের অনেকগুলো ভাষার মিশ্রণে বাংলার উদ্ভাবন তাই সহজেই এ কথা বলা যায়। ভাষা পরিবার বা সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান রাখা জরুরি না।
২. কেউ বাংলিশে কথা বলায় বেশি পটু হলে তাকে কুল ডুড মনে করে তার মতো বাংলিশ পদ্ধতি আয়ত্ত করার প্রবল চেষ্টা করা। ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা যেন তারা সব ক্ষেত্রে ভিআইপি মর্যাদা পায়।
৩. শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে বা লিখতে পারাকে অপ্রয়োজনীয় আর দুর্বলতা মনে করে নিজ জ্ঞানকেই সুষ্ঠ মনে করে নিজের সংকীর্ণতায় দৃঢ় থাকা। পাশাপাশি শুদ্ধ বাংলার জ্ঞান থাকা ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ রাখাটা জরুরি।
৪. ই এবং য় এর পার্থক্য না জানা এবং কেউ কিছু বলতে আসলে প্রতিউত্তরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলা যে দুটোই এক বিষয়। সত্যি কথা বলতে কি আমি খায়, সে যাই, আমরা যায়- এসব দেখতে বা শুনতে একটুও দৃষ্টিকটু লাগে না।
৫. সাহিত্য চর্চা, বই পড়া ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকে যতসম্ভব বিরত থাকা কারণ এতে জ্ঞান বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলা সম্পর্কে জ্ঞান রাখলে বাংলাকে বিকৃত করার পক্ষে অজুহাত দেওয়া লোকের সংখ্যা কম পড়তে শুরু করবে যা অজুহাত দেওয়া শ্রেণির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
৬. বানাম বুল করাকে আধুনিকতা এবং ‘আরে ওই হলো’ বলে চালিয়ে দেওয়া। কেউ শুদ্ধ করে দিতে চাইলে বা পরামর্শ দিলে বেশি করে গালি প্রয়োগ করে তাকি দ্রুত থামিয়ে দেওয়া।
৭. নতুন করে বাংলা শব্দ তৈরি করার কোনো চেষ্টা না করা। কোনো নতুন শব্দের প্রয়োজন পড়লে সবসময় আমাদের লক্ষ্য হবে বিদেশি শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার। যেমন হ্যালোর মতো অতীব জরুরি শব্দগুলোর এখনো কোনো উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দ বের হয়নি। তাছাড়া ইংলিশের বদলে অন্য বিদেশি ভাষার প্রতি ঝোঁক থাকলে যেমন কোরিয়ান ‘আন্নিয়ংহাসেও’ আমদানি করা যায়।
৮. জোর করে বাংলার মধ্যে অন্য শব্দ ঢুকানোর চেষ্টা করলে বাংলা ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে যারা প্রতিবাদ করতে আসবে তাদেরকেই উল্টো রাস্তা দেখিয়ে দেওয়া। যারা এমনটা বলে তাদের আগে স্বাভাবিকভাবে বাংলা ভাষায় মিশে যাওয়া ইংরেজি, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ইত্যাদি শব্দ বদলাতে বলা।
৯. বাংলা ভাষাকে ঘিরে সকল আবেগ-উন্মাদনা শুধু ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। বিশেষ করে শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে হলে আরো ভালো হয়। এতে সারা বছর বাংলা ভাষার ব্যবহার আর অপপ্রয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তা করা লাগবে না।
১০. সবশেষে বাংলা ভাষাকেই জীবন থেকে দূর করে অন্য কোনো ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করা। এতে সবদিকই বজায় থাকার সম্ভাবনা থাকে। না থাকবে বাংলা ভাষা, না থাকবে এতো অজুহাত তৈরির যন্ত্রণা।


