বিসিএস শোবিজ ও কৃতি ছেলেমেয়েদের সাকসেস স্টোরির মাজেজা

১৮৯৫ পঠিত ... ১৭:৪৬, জুলাই ০২, ২০২০

বিসিএস শোবিজে প্রবেশ পরীক্ষার ফলাফল বের হলে; আমাদের যে কৃতি ভাইবোনগুলি বিসিএস শোবিজে চান্স পেলেন; বারো রকম পোর্টালে তাদের খবর আসে; বাদাম বিক্রেতার ছেলেটি আজ সুপারকপ, টিউশনি করে যে ছেলেটি মাজিস্ট্রেট হবার স্বপ্ন দেখেছিলো; হার না মানা সুরাইয়া দেখিয়ে দিলো। এই সব গল্পের সেলিং পয়েন্ট হচ্ছে দারিদ্র্য; সুরাইয়ার দারিদ্র্যটা এই খবরের প্রাণ। মোটিভেশনাল স্পিচ-এর গোড়ার কথা হচ্ছে; আপনি আগে পান্তা খেতেন; এখন পাস্তা খাচ্ছেন। আগে আপনার পকেটে এক ডিজিটও ছিলো না; এখন সিক্স ডিজিট।

যদিও পশ্চিমের দেশগুলোতে ১৮ বছর বয়স হবার পর ছেলেমেয়েরা নিউজ পেপার বিলি থেকে রেষ্টুরেন্টে ডিশ-ওয়াশিং, অনিয়ন কাটিং ইত্যাদি করে জীবন নির্বাহ করে। কিন্তু আমাদের দেশে চাকরি পাবার আগে পর্যন্ত ধাড়ি ছেলে-মেয়েকে আদরের প্যারাম্বুলেটরে করে ঘোরা অভিভাবকের অভ্যাস; তাই যাদের অভিভাবক টাকার অভাবে প্যারাম্বুলেটর কিনতে পারেন না; তাদের ছেলে মেয়ে একটু টিউশানি করে জীবন নির্বাহ করলেই ঐটাই বড্ড ভারি হয়ে যায়; তারপর সাকসেস স্টোরি ও আত্মজীবনীর পাঞ্চলাইন হয়ে দাঁড়ায়।

সাদাকালো ছবিতে শাবানার জীবন সংগ্রাম আর ফ্যাঁত ফ্যাঁত করে কান্দনের ব্যাপারটা বক্স-অফিস হিট করার পর থেকেই মিডিয়া এরকম করুণ সাকসেস স্টোরি খোঁজে। বারোরকম পোর্টালে জোনাকি, সিনথিয়া, ইউসুফ, জাকিরের বিসিএস বিজয়; আর তার আগে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই; খবর পড়ে অভিভাবকেরা উত্তেজিত হয়ে ইউটিউবার ছেলে কিংবা টিকটক মেয়ের ঘরে ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ে বলে, তগো পিছে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢাইলা কী লাভ হইলো! চাইয়া দেখ বিসিএস শোবিজ; অনাহারে-অর্ধাহারে গাইড মুখস্ত কইরা কীরকম ফাটাইয়া দিছে দ্যাখ গিয়া। আইজ থিকা পকেট মানি বন্ধ; নিজের ইন্টারনেট বিল নিজে দিয়া ঐসব টিকটক ফাতরামি করো গিয়া।

বিসিএস শোবিজের ফলাফলের সাঁঝটি ও তার পরদিন বাচ্চাদের কান ঝালাপালা হয়ে যায়; বিসিএস-এ ফাটাইয়া দেয়া যুবাদের গল্পে। ঝুমা খালা তার মেয়েটিকে ডেকে বলে, নীলক্ষেতে চল; বিসিএস গাইড কিইনা দিমু। কীসের সব এনথ্রোপলজি পড়িস। এইডার মানে কীরে!

বুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার পররাষ্ট্র শোবিজে চান্স পাওয়ায়; ব্যাক্কল ছোট মামা জিজ্ঞেস করে, অই তুই পাঁচ বছর ধইরা যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লি; পররাষ্ট্র সার্ভিসে এই ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার ব্যবহার কী! খালি খালি বুয়েটের একটা সিট ধইরা রাখলি; আরেকটা পোলা ইঞ্জিনিয়ার হইতে পারতো। তুই বি.কম কইরা বিসিএস দিলে ক্ষতি কী ছিলো!

পররাষ্ট্র শোবিজে চান্স পাওয়া ছেলেরা দুবার রাষ্ট্রদূত হয়; একবার বিসিএস ফলাফলের পর; আরেকবার যখন সে রাষ্ট্রদূত হয়। সুতরাং ভাগ্নেটির মধ্যে অলরেডি রাষ্ট্রদূত ভাব এসে গেছে। সে অস্বাভাবিক গম্ভীরভাবে বলে, মামা তুই তোকারি করবেন না; এখন থেকে একটু সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলবেন। আমি ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসের লোক।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার প্রশাসন শো'বিজে চান্স পাওয়ায়; ফেসবুকে প্রশ্ন ওঠে; ডাক্তারি বিদ্যাটা প্রশাসনে কী কাজে লাগে মশাই!

ফেসবুকের 'সাতে পাঁচে থাকিনা' দাদা বলেন, প্রশাসন মানে ক্ষমতাসীন দলের সোনার ছেলেদের সামলানো। সোনার ছেলেরা হেলমেট আর হাতুড়ি নিয়ে উন্নয়নের 'জন হেনরি' হয়ে অন্য ছেলেদের পিটিয়ে বেড়ায়; সেই পরিস্থিতি সামলাতে প্রশাসনের যে লোক নিয়োজিত; সে ডাক্তার হওয়া বাঞ্চনীয়।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলে কেন প্রশাসন শোবিজে? এ প্রশ্নের উত্তরে জাস্টিফিকেশানের ধারাপাত ভাই বলেন, আজকাল কথায় কথায় কৃষকের ধান কেটে দিতে হয় প্রশাসনের লোককে গিয়ে। তার কৃষিবিদ্যা থাকা জরুরি।

এমবিএ করা ছেলে কেন পুলিশ শোবিজে? এমন প্রশ্নের উত্তরে জিডিপি দই মারা এক নেপোলিয়ান বলেন, শুনেছি পুলিশে অনেক স্পিড মানি লেনদেন হয়। সংগৃহীত জিজিয়া কর ভাগ করে স্তরে স্তরে খামে খামে পাঠানোর যে সুবিশাল ব্যবসা-ব্যবস্থাপনা; সেটা এমবিএ ছাড়া কে সামলাবে বলুন!

এক বোকার স্বর্গে বসবাস করা লোক প্রশ্ন তোলে, পুলিশ-প্রশাসনে এতো ইঞ্জিনিয়ার কেন!

'ও মানুষ তোমার দুইটা চোখ দেখবা, দুইটা কান শুনবা, কিন্তু একটা মুখ তো একটু কম কথা কবা' ভাইয়া বলেন, নির্বাচন প্রকৌশল হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণ; ভোটের ইনসমনিয়া হোক; কিংবা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন হ্যাকিং হোক; পুরোটাই প্রকৌশল শাস্ত্রের ফজিলত। কাজেই একটা মুখতো; একটু কম কথা কবা।

এমন সময় যে কোন বচসায় সুষ্মিত হাসিতে হাততালি দেয়া আপা প্রস্তাব দেন, বিসিএস শোবিজের নতুন ছেলে-মেয়েগুলোকে এভাবে ডিসকারেজ করা ঠিক নয়; আসুন আমরা এই করোনাকালে আম্মু ও নানীকে নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে ওদের অনুপ্রাণিত করি।

বাজারে বিসিএস শোবিজের কদর দেখে; এক ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের মনে কাশফুলের নরম ছোয়া লাগে; উনি তার ফেসবুকে অটোবায়োগ্রাফি লেখেন, কিছুই না পড়ে কোন প্রিপারেশান ছাড়া বিসিএস দিয়েছিলাম; আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে পরীক্ষা দিয়েছি; আমার আবার 'কাশফুলের নরম ছোয়া' টাইপের বিজ্ঞাপনের কপি লিখতে ভালো লাগে; তাই টুকটাক কপিরাইটারের কাজ করে ভালো কাটছিলো একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। কিন্তু চকিতে খবর পেলাম আমি বিসিএস শোবিজের প্রশাসনে চান্স পেয়েছি। আজ যারা শোবিজে চান্স পেলে তোমরা আমার অভিনন্দন গ্রহণ করো। শুধু একটা কথা মনে রেখো; এমন করে ফেসবুকে সরকারি পেজ চালাবে যেন, জনগণের মুখ ঢেকে যায় উন্নয়নের বিজ্ঞাপনে।

১৮৯৫ পঠিত ... ১৭:৪৬, জুলাই ০২, ২০২০

আরও

 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top